সুরটা দাও, সুর, যন্ত্রটা বেঁধে নিই।
তিন সপ্তক এসরাজ বাঁধার কাণ্ডকারখানা আমার দেখা আছে। এর চেয়ে ভীতিপ্রদ ব্যাপার আর কিছু নেই। শ্রোতাদের ধৈর্যের পরীক্ষা। তারে টুসকি মেরে মেরে, কানে মোচড় দিয়ে দিয়ে প্রতিটি পরদাকে সুরে ভেড়াতে হবে। মাতুল উসখুস করছেন। আঙুল মাঝে মাঝে টেপা সুরের বাইরে গিয়ে খেলে আসছে। গানের মুখ লিক করে বেরিয়ে পড়ছে। পিতা অমনি উঁহু করে ছটফটে মাতুলকে বশে আনছেন।
এইভাবে চললে রাত দুটোর আগে গানে আসা যাবে না। তরফের কান সহজে ঘুরতে চাইছে না। মটমট শব্দ করে সুরে পা দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করছে। পিতা ঘোরাচ্ছেন আর বলছেন, গেল গেল।
মাতুল শেষকালে সাহস করে বললেন, আমার ভীষণ গান পেয়েছে। আর চেপে রাখতে পারছি না।
পিতা বললেন, আর একটু ধৈর্য ধরো, আর একটু, প্লিজ। এক মেটে বেঁধে ছেড়ে দিচ্ছি।
এসরাজ কাঁধে উঠল। মাতুল ইমনে আলাপ ধরলেন। নিখাদ থেকে কোমল ঋষভ হয়ে যখন সুরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন মনে হচ্ছে যেন অচেনা রাস্তা খুলে যাচ্ছে। কড়ি মধ্যম ছুঁয়ে যখন ওপরে উঠছেন সুর যেন আকাশের ব্রহ্মতালু স্পর্শ করছে। রাগিণীর বিরহী রূপ সুরের দু’-চার চলনেই স্পষ্ট। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি নীল শাড়ি পরা কনক। বাকি সব অবলুপ্ত। রাজকাপুরের ছবির ধোঁয়া ভেদ করে নার্গিস যেন বেরিয়ে আসছে। মৈঘৈম্মেদুরম্বরং বনভুবঃ শ্যামাস্তমালদ্মৈর্নক্তং ত্বমেব তদিমং রাধে গৃহংপ্রাপয়।
মাতুলকে পিতার এসরাজ জবরদস্ত অনুসরণ করেছে। দু’জনেই দু’জনকে বাহবা দিচ্ছেন। প্রতাপ রায়ের আঙুল তবলার ওপর ছটফট করছে। এখনও গানের মুখ আসেনি। বোল ফোঁটাতে পারছেন না। ঝট করে গানের মুখ এসে গেল। একেবারে সাচ্চা গজল,
সব কহাঁ কুছ লালা বগুল সেঁ নুমায়াঁ হো গয়ী।
খাক মেঁ ক্যা সুরতেঁ হোগি কি পিনহাঁ হো গয়ী।
সব তো পাওয়া হল না। কিছু ফুল, কিছু পুষ্পবল্লরী, এতে আর কতটুকু প্রকাশ। মাটির যে আসল সৌন্দর্য সে তো সব লুকিয়েই রইল। সব কহাঁ কুছ লালা বগুল মে।
মাতুল-গর্বে বুক দশহাত হয়ে উঠছে। কী গাওয়াই গাইছেন। দুমড়ে মুচড়ে নিংড়ে হৃদয়ের আবেগ উজাড় করে দিচ্ছেন। এসব মানুষের কী দরকার কাউকে পরোয়া করে চলার? দুই বোন পাশাপাশি বসেছে। কনকের রাতের রান্না মাথায় উঠেছে। মেসোমশাই মাঝে মাঝে আহা আহা করে উঠছেন। মেসোর আহা শুনে মাতামহ হুহু করে এক ধরনের হাসি হাসছেন, যার অর্থ দেখো, ছেলে আমার কোন কোটির মানুষ! ঈশ্বরকোটির জীব।
হো গয়ী বলে মাতুল দুরূহ একটা কাজ সবে শেষ করেছেন এমন সময় সিঁড়িতে হুড়মুড় করে একটা শব্দ হল, সঙ্গে সঙ্গে গলা শোনা গেল, সিলিপ করে পড়ে গেলুম যে রে বাপ। গাইয়ে, বাজিয়ে, তবলচি কেউ না শুনতে পান, আমার কানে এসেছে। অচেনা গলা। আসর ছেড়ে ওঠার আগেই তিনি দরজার সামনে চলে এসেছেন। জবা এসেছে? জবা?
আরে, এ যে সেই জবাদের বাড়ির ধেড়ে বাবুটি। মনে হয় জবার স্টেপ ফাদার। আমাদের নিজস্ব গোয়েন্দা বিভাগ, যার হেড সুখেন, এখনও পরিচয় বের করতে পারেনি। চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢুকে তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, জবা এসেছে? জবা?
মাতুল গান বন্ধ করলেন, হারমোনিয়মে সুরের শেষ টানটি মেলায়নি। তবলার শেষ চাটি মাঝ-বাতাসে পাখির মতো উড়ছে। এসরাজ নিখাদে এসে ন্যাজ গুটিয়েছে। পিতা এসরাজটিকে কোলের ছেলের মতো সাবধানে কার্পেটে শুইয়ে রেখে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, কে এই অসুর? কী চাইছেন?
মুখে সেই কদাকার কাঁঠাল-কোয়া হাসি। ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, জবা আছে? জবা?
মাতামহ পালটা প্রশ্ন করলেন, কেন? রক্ষেকালী পুজো আছে নাকি আজ? এই রাতে জবাফুল পাবেন কোথায়? পিতা এসরাজ তুলে নিতে নিতে বললেন, চোখের জলে পুজো করুন, চোখের জলে পুজো বেস্ট পুজো। ভদ্রলোক কিছুই বুঝতে না পেরে আর একটু পরিষ্কার করে বললেন, সেই দুপুর থেকে জবাকে পাওয়া যাচ্ছে না, এত রাত হল, সে কি এখানে এসেছে?
পিতার এসরাজ আবার স্কন্ধচ্যুত হল। শূন্যে ছড়ি ঘুরিয়ে অর্কেস্ট্রার কনডাক্টরের মতো ভঙ্গি করে প্রশ্ন করলেন, ইনি কী চাইছেন বলো তো?
প্রতাপ রায় বাঁয়ায় গফা গফা আওয়াজ করে প্রশ্ন করলেন, কে জবা?
ভদ্রলোক বললেন, সেই জবা যাকে ওই ছেলেটি মাঝে মাঝে ছাত থেকে ফুল ছুঁড়ে দেয়।
অ্যায় মরেছে। ব্যাটা হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিলে। এইবার কোথাকার জল কোথায় গড়ায় দেখো। কপালে আজ এই লেখা ছিল ঈশ্বর। পিতার হাত থেকে ছড়ি খসে পড়ল, কী বললেন? আমার ছেলে জবাকে চন্দ্রমল্লিকা ছুঁড়ে মারে? আপনি এতদিন আমাকে বলেননি কেন? ঘুমোচ্ছিলেন, থানায় ডায়েরি করেননি কেন?
মেসোমশাই বললেন, উঁহু, ডায়েরির স্টেজে এখনও আসেনি। যতক্ষণ না শ্লীলতাহানি হচ্ছে, ইনডিসেন্ট জেসচার হচ্ছে ততক্ষণ পানিশেবল অফেন্স হচ্ছে না। এ কেস ফেল করবে। যত বড় বাঘা ব্যারিস্টারই হোক না কেন আসামি খালাস পেয়ে যাবে। তারপর দেখতে হবে যাকে ফুল ছুঁড়ে মেরেছে সে সাবালিকা না নাবালিকা? সাবালিকা হলে তার কনসেন্ট ছিল কি না? যদি প্রতিবাদ করে থাকে তা হলে সে প্রতিবাদের সাক্ষী কে? তা ছাড়া ফুল যে ছুঁড়ে মেরেছে বলছেন তার কোনও সাক্ষী আছে? প্রমাণ কী ফুল ছুঁড়ে মেরেছে? কেস ডিসমিস্ট। আসামি বেকসুর খালাস। আসামি এখন অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারে। হাজার দশেক টাকা অবশ্যই পেয়ে যাবে।
