যে-পাতায় কনক আছে, সেইসব পাতা যেন দুম করে বের করে দিয়ো না। কী কুক্ষণেই যে ডায়েরি। লেখার ইচ্ছে হয়েছিল। ভেবেছিলুম মহাপুরুষেরা ডায়েরি লেখেন, তা হলে ডায়েরি লিখলে। মহাপুরুষ হয়। লজিক।
পিতা মুখ তুলে বললেন, বাপস, কী সব লিখেছে?
প্রতাপ রায় বললেন, খারাপ কথা?
না না, অতি উচ্চমার্গের কথা। লিখছে, জীবনে পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়াটাই বড়। পেলে হারাবার ভয় থাকে, যা পাইনি তা তো কোনওদিন হারাবে না। সোজা চলে যাও, কিছু ধরার চেষ্টা। কোরো না, কিছু তুলে নেবার চেষ্টা কোরো না। রিক্ত হবার সাধনা ক’জন করে। সকলেই তো দেহি দেহি করছে। সত্য একটাই, সব ছাড়োয়ে, সব পাওয়ে।
জবার কাকা উসখুস করে বললেন, হাতের লেখা কি মিলছে?
চিঠিটাই পেলুম না, তো হাতের লেখা মেলানো!
এই যে স্যার।
এতক্ষণে কাগজটা নজরে এল। এ সেই চিঠি। সুখেন ব্যাটা সেদিন দুপুরে আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিল। দেখেছ কাণ্ড! একটু বেশ জমিয়ে লেখ তো পিন্টু। বেশ একটু আবেগ দিয়ে মারাত্মক করে লেখ তো। বড় ফসকে ফসকে পালাচ্ছে। প্রথম লাইনেই মেরে দে, লেখ, আর কতকাল থাকব। বসে, পরান খুলে বঁধু আমার! রাসকেল একবারও আমাকে বললে না মেয়েটা কে? বন্ধুকৃত্য করতে গিয়ে আজ অবস্থা দেখো। অপরাধ স্বীকার করে নিলে সাজা কমে যায়। সেই পথেই এগিয়ে দেখি।
মেলাতে হবে না, ওটা আমারই হাতের লেখা। তবে অন্যের হয়ে লেখা। হাতের লেখা আমার হলেও লেখক অন্য।
ভদ্রলোক বললেন, আজ্ঞে, হাইকোর্ট দেখাতে চাইছে? একটু চাপ দিলেই বেরিয়ে পড়বে জবা কোথায়।
মেসোমশাই ধমকের গলায় বললেন, চুপ করুন, চিঠির শেষে কার নাম আছে দেখুন তো হরিদা?
পিতা পাতা উলটে বললেন, ইতি তোমার সুখাদ্য।
প্রতাপ রায় বললেন, বাবা, একেবারে খাদ্যখাদক সম্পর্ক।
মেসোমশাই বললেন, কাকে সম্বোধন করা হয়েছে?
পিতা ভাল করে দেখে বললেন, আমার শ্যামা মায়ের চরণতল।
প্রতাপ রায় বললেন, একেবারে ধর্ম, অর্থ, মোক্ষ, কাম। বহত আচ্ছা।
মেসোমশাই বললেন, এ চিঠি কিছু প্রমাণ করে না। ইট মে বি এনিথিং। কয়েক লাইন পড়ুন তো হরিদা। পিতা চিঠিটা মাতুলের হাতে দিয়ে বললেন, আমি পারব না, তুমি পড়ো।
ভদ্রলোক বললেন, বেশ পাকা পাকা কথা লেখা আছে। ইচ্ছে করলে আমি চেপে ধরে জবার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিতে পারি। দুঃখু নেই। পাত্র হিসেবে ছেলেটি তো খারাপ নয়।
কথা শুনে সকলেই নির্বাক। বলে কী রে! পোস্তার কারবারি। সেই ছড়া নাকি, শুনতে পেলুম পোস্তা গিয়ে তোমার নাকি ছেলের বিয়ে। মাতুল চিঠিটা শুরু করার আগেই প্রতাপ রায় ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে পকেট থেকে সিগারেট লাইটার বের করে দপ করে আগুন ধরিয়ে দিলেন। চিঠি পুড়ছে, মাতুল চিৎকার করছেন, আগুন লেগে যাবে, ওরে আগুন লেগে যাবে।
ভদ্রলোক চিৎকার করছেন, আমার চিঠি, আমার চিঠি।
প্রতাপ রায় জ্বলন্ত চিঠিটা কার্পেটের পাশের মেঝেতে ফেলে দিয়ে খুব সহজ গলায় বললেন, এবার আপনি আসতে পারেন। জবা এখানে নেই। ভোরবেলা গাছে খোঁজ করবেন।
মাতামহ বললেন, আর একটা কথা বলেছ কী চ্যাংদোলা করে বাইরে ফেলে দিয়ে আসব।
মাতুল বললেন, উনি যা বলেন তাই করেন। তন্ত্রসাধক।
ভদ্রলোক উঠে পড়লেন। মাতামহের দিকে ভক্তি গদগদ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, বাবা, একটু আশীর্বাদ করুন। মাতামহ হাত তুলে বললেন, করলুম।
আশীর্বাদ করুন যেন এই অপমানের উপযুক্ত প্রতিশোধ নিতে পারি।
অ্যাঁ সেকী?
আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনাদের ছেলে ছাত টপকে ফুল ফেলবে, চিঠি ফেলবে, আইবুড়ো মেয়ে অদৃশ্য। হয়ে যাবে, দেশে আইন বলে তো একটা কিছু আছে। মেয়ে যদি না ফেরে আমি থানায় যাব। তখন। যা হয় টানা হ্যাঁচড়া হবে। মেসোমশাই বললেন, আমি আছি।
পিতা খুব গম্ভীর গলায় বললেন, আপনারা একে ডিফেন্ড করবেন না। আমার ছেলে অপরাধী। শুধু অপরাধী নয়। চরিত্রহীন, লম্পট। হি ইজ এ সাফারার। বয়েসের অসুখে ভুগছে। শেম! শেম!
১.১৪ খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়
সব স্থির। সমস্ত মুখ গম্ভীর। এমনকী প্রতাপ রায়ের মুখ থেকেও সেই বিচিত্র হাসি অদৃশ্য হয়েছে। মাতামহ মাথা নিচু করে হাতের আঙুল নিয়ে পুর-মুঠ খেলছেন। এসরাজ একপাশে অভিমানী স্ত্রীর মতো পাশ ফিরে শুয়ে আছে। হারমোনিয়ম বেলো খোলা, সুরহারা। বাঁয়া আর তবলা মাথা ঠোকাঠুকি করে ফাটকের দুই রাতজাগা আসামির মতো নিজেদের ভাগ্য নিয়ে যেন বড়ই বিব্রত। দুই উরুতে হাত রেখে পিতা এত সোজা হয়ে বসেছেন, মনে হচ্ছে অমরনাথের তুষারলিঙ্গ। মাতুল ওপর-ঠোঁট দিয়ে নীচের ঠোঁট চেপে বসে আছেন। বোঝাই যায় সুর বেরিয়ে আসতে চাইছে, কোনওরকমে চেপে রেখেছেন। নিজেকে মনে হচ্ছে ইঁদুরকলে পড়ে গেছি। কেউ-না-কেউ এইবার তুলে নিয়ে বাইরে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আসবে। এক ঝক কালো কালো কাক, ডানা ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে তেড়ে আসবে। প্রাণভয়ে ন্যাজ তুলে শুরু হবে আমার দৌড়োদৌড়ি।
প্যাঁচ ঘুরিয়ে এসরাজের ছড়ির ছড় আলগা করতে করতে পিতা বললেন, আর কী রইল? কিছুই রইল না।
মাতামহ মাথা তুলে প্রশ্ন করলেন, তার মানে?
মানে অতি সহজ। চরিত্র গেল তো আর কী রইল? কিছুই রইল না।
ছড়িটা শূন্যে তুলে দেখাতে লাগলেন, এই হল মাথা, লম্বা লম্বা চুল, দুটো লিকলিকে হাত, কঞ্চির মতো বাঁকা বাঁকা দুটো পা, এই ধনুকের মতো পিঠ। এই দুর্বল স্ত্রীর কীসের জোরে জগতের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত?
