সুর ভাজতে ভাজতে মাতুলের প্রশ্ন, নাচ আসে?
আজ্ঞে না।
আসা উচিত ছিল। তোমার বিউটিফুল নাচের ফিগার।
আমার দিকে তাকিয়ে গুনগুন করে সুর ভাজতে ভঁজতে বললেন, কী রে! তোর রেওয়াজ টেওয়াজ কেমন হচ্ছে?
একেবারেই না।
তুই আমার নাম ডোবাবি ব্যাটা। আজ আমার সঙ্গে বোস। গানে গলা দিবি।
কোঁচায় লাথি মারতে মারতে, কার্পেটের ওপর দিয়ে বেড়াতে বেড়াতে মায়ের ছবির সামনে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। চিত্রার্পিত পুত্তলিবৎ। পকেট থেকে সিল্কের রুমাল বের করে কাঁচ মুছলেন। মৃতের সঙ্গে জীবিতের ভাষাহীন আলাপন চলেছে। কিছুক্ষণ স্থির থেকে বললেন, আজ তোমাকে গান শোনাব।
আমাদের দিকে যখন ফিরে তাকালেন, তখন অন্যভাব। মুখে বিষণ্ণতার প্রলেপ। রিমলেস চশমার আড়ালে জ্বলজ্বলে দুটো চোখ। একটু যেন জল চিকচিক করছে।
যন্ত্র বের করো যন্ত্র বের করে বলে পিতা সদলে কুচকাওয়াজ করে ঘরে ঢুকলেন। হাতে দু’ফালি কাপড়। নিশানের মতো পতপত উড়ছে। একই সঙ্গে চামেলি আর বকুলের সুবাস। আতর ঢেলেছেন। বাতাস এখনও ভিজেভিজে। পাতা নড়লে এখনও জলের ফোঁটা ঝরছে। সেই বাতাস ফুলের গন্ধে কতদূর যে পৌঁছিয়ে গেল। কালিদাসের কালে। ওয়াজেদ আলির লক্ষ্মৌতে। সাজাহানের দিল্লিতে। ওমর খৈয়ামের পারস্যে। কাল কোথা থেকে কোথায় চলে গিয়ে ঘুরপাক খেতে লাগল। চরিত্রদের চেহারাও যেন পালটে গেছে। মাতামহকে মনে হচ্ছে পুত্রের হাতে বন্দি সাজাহান। পেছন পেছন মুকু আসছে জাহানারার মতো। মাতামহর মুখ দেখে মনে হচ্ছে সব ভুলে গেছেন। সিনেমা, বাড়ি বন্ধক, গয়না বিক্রি, উত্তেজনার ছিটেফোঁটাও আর মনে লেগে নেই। এখনই হয়তো অহীন্দ্র চৌধুরীর মতো কাঁপতে কাঁপতে বলতে থাকবেন, না, আমি আর সম্রাট হয়ে বসতে চাই না। আমার সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। এ সাম্রাজ্য তুমি ভোগ করো পুত্র। এ মণিমুক্তো মুকুট তোমার! আর মার্জনা? ঔরংজীব, ঔরংজীব। না সেসব মনে করব না। ঔরংজীব! তোমার সব অপরাধ ক্ষমা করলাম।
জাহানারার সকাল থেকেই সর্দি হয়েছে। ফুচুত করে হাঁচি হল। মুকু ঘাড় হেঁট করে হাঁচে। হাঁচার পর আরও কিছুক্ষণ নিচু হয়ে থেকে মুখ তুলে অপাঙ্গে তাকিয়ে মুচকি হাসে। বড় লজ্জার কাজ করে ফেলেছে। হেঁচে ফেলেছে। নবাব ওয়াজেদ আলির মতো পিতা মধ্যমণি হয়ে বসেছেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলে উঠলেন, অ্যাকোনাইট থার্টি। মাতামহ বললেন, মাঝরাতে এক ডোজ ডালকামেরা। প্রতাপ রায় কোঁচা সামলে বসতে বসতে বললেন, কিস্যু না, স্রেফ গরম জলে একটা পাতিলেবু কষকষে করে নিংড়ে একটু নুন দিয়ে খেয়ে নাও। মাতুল বললেন, কষা মাংস আর ফুলকো লুচি। মাতামহ বললেন, আদা দিয়ে গরম চা। মেসোমশাই বললেন, ভোরবেলা ঠান্ডা জলে স্নান। মুকু ধীরে ধীরে দরজার দিকে সরতে আরম্ভ করেছিল। টুক করে চৌকাঠ টপকে বাইরে অদৃশ্য হয়ে গেল। সেখান থেকে ফুচুত করে আর একটি হাঁচির শব্দ ভেসে এল।
কনক আর আমি যন্ত্রপাতি বের করছিলুম। হারমোনিয়ম, বায়াতবলা। পিতা বললেন, এসরাজটাও নামাও। অনেকদিন বাজানো হয়নি। ছড়টড় কী অবস্থায় আছে, কে জানে?
হারমোনিয়মটা বেজায় ভারী। দু’জনে ধরাধরি করে এনে কার্পেটের মাঝখানে ধপাস করে ফেললুম। প্রতাপ রায় উঠব উঠব করছিলেন। কোঁচায় কাছায় জড়াজড়ি হয়ে গেছে বলে রক্ষা পেয়ে গেল কনক। নয়তো তেড়ে এসে সরো সরো বলে আমাকে একপাশে চিতপাত করে দিয়ে কনকের সঙ্গে একটু দহরম-মহরম করার চেষ্টা করতেন।
পিতা খোল থেকে এসরাজ বের করে নরম একটুকরো ন্যাকড়া দিয়ে ধুলো পরিষ্কার করতে লাগলেন। আমাকে বললেন, ওহে রজনটা বের করো।
মাতুল হারমোনিয়মের রিডের ওপর দিয়ে বিদ্যুৎবেগে এপাশ থেকে ওপাশে বারকতক আঙুল চালালেন। অনামিকায় আংটির পাথর ঝিলিক মেরে গেল। সুরের গমকে ঘরের বাতাস চমকে। চমকে উঠল। এসরাজে ছড় টেনে অষ্টকুটি একটা শব্দ বের করে পিতা বললেন, বহত্ আচ্ছা। তোমার মেজাজ এসে গেছে।
প্রতাপ রায় তবলায় তড়াং করে একটা চাঁটি মারলেন। মেরেই বললেন, অ্যাঃ, ঢ্যা ঢ্যা করছে। কতদিন হাত পড়েনি? হাতুড়ি কই, হাতুড়ি?
এই রে, তবলা ঠোকার সেই ছোট্ট হাতুড়ি যে প্রায়ই হারিয়ে যায়। খুঁজে পাওয়াই যে মুশকিল। পিতা অধৈর্য হয়ে বললেন, কী হল, পেলে না? পাবে না জানি। এ বাড়িতে কোনও একটা সিস্টেম নেই। না পাও কয়লা-ভাঙা হাতুড়িটাই আনন।
যন্ত্রপাতির বাক্স থেকে সেই সুদৃশ্য হাতুড়ি অবশেষে বেরোল। এসরাজের ছড়ে রজন ঘষতে ঘষতে পিতা বললেন, কোথায় ছিল?
আজ্ঞে, আপনারই যন্ত্রপাতির বাক্সে।
প্রতাপ রায় তবলা ঠুকতে ঠুকতে বললেন, পাউডার আছে?
এ বাড়িতে পাউডারের পাট নেই। তবে ফ্রেঞ্চচক আছে। সে বস্তু যে-জায়গায় আছে তার নাগাল পেতে হলে চেয়ার চাই। কনক বললে, পাউডার? আমি এনে দিচ্ছি। খুব বাঁচিয়েছে। টঙে চড়ে আলমারির মাথা থেকে চক নামাতে হলে আসর মাথায় উঠত।
প্রচুর ঠোকাঠুকি করে তবলা সুরে বাঁধা হল। মাতুল বলতে লাগলেন, গাঁট্টায় মারো, গাঁট্টায় মারো। উঁহু ডান দিকটা এক পরদা নেমে আছে।
মাতুলের সাংঘাতিক কান। তার চেয়েও সাংঘাতিক কান পিতার। হাতে পাউডার ঢেলে তবলার গাবে প্রতাপ রায় ভাল করে মাখালেন। ওপর দিকে দু’হাত তুলে জয় নিতাইয়ের ভঙ্গিতে নিজের তালুতে বেশ করে ঘষলেন। মাতুল হারমোনিয়মে একটা সাপটা তাল বাজিয়ে সুরের মুখটি সবে ধরতে যাচ্ছেন, পিতা উঁহু উঁহু করে উঠলেন। মাতুলের ভুরু কোঁচকাল।
