বোহ ফিরাক অওর বোহ্ বিসাল কহাঁ ॥
বোহ্ শব ও রোজ ও মাহ্ ও সাল কহাঁ ॥
মাতুল চেয়ার ছেড়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন, আমি ক্ষমা চাইছি।
মাথা নিচু করে প্রণাম করতেই পিতা পিঠে হাত রেখে বললেন, বড় রোগা হয়ে গেছ। সে যত্ন আর কোথায় পাবে? আমিও একটু কাব্য করে বলি, যারা ছিল তারা আর নেই, যারা পড়ে আছে, তারাও তো থাকবে না চিরদিন, কিছুটা পথ এগিয়ে দিতে পারি, তারপর তুমি একা। তোমার শাস্তি, আমাদের গান শোনাও। আজ হল গজলের রাত। কী বিনয়দা, অসুবিধে হবে না তো?
কিছুমাত্র না। সেই সকাল থেকে পড়িয়ে পড়িয়ে নিজেকে আর মানুষ মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে। টিয়াপাখি।
হ্যাঁ, ওই আধিভৌতিক, আধিদৈবিক কিছুক্ষণ জিরেন পাক।
প্রতাপ রায় বললেন, কিন্তু সেই গল্পটা?
ও, সেই গল্প! তুমি ঠিক মনে রেখেছ দেখছি! সেই ক্যানাডিয়ান ইঞ্জিনের গল্প। পিতা হাসতে লাগলেন। আমি ফরাস বিছোতে শুরু করলুম। আসর বসবে।
১.১৩ প্রেমের তিন পর্ব
পারস্যের গালিচা। কে কিনেছিলেন জানি না। তবে রবিবার রবিবার এই বস্তু জীবন বের করে ছেড়ে দেয়। মানুষের চেয়েও যত্নে থাকে। নরম বুরুশ দিয়ে বুনোন বরাবর ঝাড়ো আর গোল করে গুটিয়ে রাখো। ব্রাশ অ্যান্ড রোল, রোল অ্যান্ড ব্রাশ। আবার খোলা মুখ দিয়ে ইঁদুর না ঢোকে। দুটো মাথায়। কাপড় জড়াও।
ঘরের এপাশ থেকে ওপাশ সেই গালচে পড়েছে। বুকে লতাপাতার কারুকার্য। পাড় বসানো। নরম দুব্বো ঘাসের মতো জমি। কনক খুব সাহায্য করেছে। টানা হ্যাঁচড়ায় খোঁপা ভেঙে গেছে। পিঠের ওপর দুলছে সাপের কুণ্ডলীর মতো। আমার ওসব দেখা উচিত নয়। তবু নজর চলে যাচ্ছে। বয়েসের দোষ। বগলের কাছে ব্লাউজ টাকার মতো গোল হয়ে ঘামে ভিজে উঠেছে। হালকা নীল ওই জায়গাটা গাঢ় নীল হয়েছে। আবহাওয়া যত শীতলই হোক ওই জায়গাটা ঘামবেই। কঁধ আর ওপর বাহুর সন্ধিস্থল পায়রার বুকের মতো গরম। তোমার তাতে কী? কার্পেট পাতছ পাতো, অন্যদিকে নজর যাচ্ছে কেন? মিটমিটে শয়তান।
হামা দিয়ে বসেছিলুম। কনক সামনে ঝুঁকে কার্পেট সমান করতে করতে পিছু হটছিল, ঘাড়ে এসে উলটে পড়ল। রেগে গেছে। আচমকা এমন ঘটনা ঘটলে সবাই রাগবে। আমিও রেগে যেতুম। আমার পিঠের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পেছনে চিতপাত। পা জোড়া এখনও আমার পিঠে। মোমের মতো মসৃণ গোড়ালি দু’চোখের কোণে ঝিলিক মারছে। নিতম্বের ঘর্ষণে পিঠ গরম হয়ে উঠেছে। চোখে শাড়ির নিম্নাংশের ঝাঁপটায় জল এসে গেছে। ব্যাপারটা বিশ্রী হলেও মধুর। মানুষের মাথায় ছাদ ভেঙে পড়ে, যুবতী ভেঙে পড়ার ঘটনা খুব কম কোষ্ঠীতেই লেখা থাকে। কনক যদি মাতুলের ছবিতে নায়িকা হয় আমি নির্ঘাত আত্মহত্যা করব।
পিঠ থেকে পা তুলে নিয়ে কনক বললে, কী যে তখন থেকে বেড়ালের মতো পায়ে পায়ে ঘুরছ। পইতেতে পা লেগেছে?
কী জানি? খেয়াল করিনি।
ইস পাপ হয়ে গেল। দাঁড়াও একটা প্রণাম করি।
প্রণাম? পাগল নাকি?
ওপাশের ঘরে চেয়ার সরাবার শব্দ হল। চট করে উঠে দাঁড়ালুম। দু’জনকে কার্পেটে এইভাবে গড়াতে দেখলে, এ বাড়িতে আমার দানাপানি বন্ধ হয়ে যাবে। এলোমেলো শাড়ি গুছিয়ে নিয়ে কনকও উঠে দাঁড়াল। কনকের পাপ হবে কেন? পাপে আমি নিজেই মজে গেছি। কদিন থেকেই নিজেকে লক্ষ করছি, পুণ্যের চেয়ে পাপের আকর্ষণ হাজার গুণ বেশি। দেবতা হবার বাসনা তলিয়ে গেছে। অসুর হতে চাই। আমায় দাও মা অসুর করে, কাজ নেই আমার দেবতা হয়ে। স্বর্গপুরীর হর্মে নাকি দেদার হুরি বসত করে/সেথায় নাকি অঢেল সুরার ঊর্মিমুখর ঝরনা ঝরে/পুণ্যবানের কাম্যভূমির মর্ম যদি এমনতর/দোষ কী তবে বরণ করার আগেই এদের মর্ত পরে? এসো খৈয়াম এসো। তোমাকে নিয়ে কোনও মরূদ্যানে পালাই। মধ্যবিত্ত বাঙালির সংসার বড় একঘেয়ে। Those who have gone before us, O Cupbearer, are sleeping in the dust of Self-pride. অহংকারের অট্টালিকায় নির্বাসিতের হাহাকার। বেশ বলেছিস ব্যাটা।
দেয়ালে আমার মাতৃদেবীর ছবি সন্ধের ঝোড়ো বাতাসে একটু হেলে গিয়েছিল। পায়ের আঙুলের ওপর ভর রেখে শরীর উঁচু করে কনক ছবিটাকে সোজা করছিল, এমন সময় মাতুলের প্রবেশ। আমার চেয়ে অন্তত হাতখানেক বেশি লম্বা। পদক্ষেপের আগে আগে কোঁচা চলেছে লাথি খেতে খেতে। কনকের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার নাম কনক?
কনকের গোড়ালি মাটি স্পর্শ করল। ছবি নিয়ে বেচারা তন্ময় ছিল। আমি সাহায্য করলে ব্যাপারটা নিমেষে হয়ে যেত। ইচ্ছে করেই করিনি। স্বার্থ ছিল। বেশ লাগছিল দেখতে। কেমন ডিঙি মেরে মেরে হুকের নাগাল পেতে চাইছিল। দীর্ঘকাল এ বাড়িতে শুধু পুরুষেরই রাজত্ব ছিল। সকাল সন্ধে মিলিটারি মার্চ করছে। আদেশ ছিটকোচ্ছে ছিটেগুলির মতো। অ্যাটেনশন। অ্যাবাউট টার্ন। ফরোয়ার্ড মার্চ। সেই কঠোরে কোমলের স্পর্শ লেগেছে। ফুটিফাটা জমিতে বৃষ্টি নেমেছে।
কনক হাসিহাসি মুখে ফিরে তাকাল, আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার নাম কনক।
তুমি গান জানো? মাতুল কার্পেটে প্রমথেশ বড়ুয়ার মতো পায়চারি করতে করতে প্রশ্ন করলেন। গুনগুন করে গানের সুরও ভাঁজছেন। মেজাজ আসছে। আসতেই হবে। এ ঘরে কম গান হয়েছে? বড় বড় আসর বসেছে, রাতের পর রাত। এ ঘরের দেয়ালও গান গাইতে পারে।
কনক হাসিহাসি মুখেই বললে, অল্পস্বল্প।
