প্রতাপ রায় বললেন, চন্দ্রলেখা ভেরি সাকসেসফুল ছবি। বক্স অফিস স্ম্যাশ করে দিয়েছে। ভেরি সিম্পল ফর্মুলা। একটু বীররস, একটু রোমান্স, আর একটু সেক্স। (শেষ কথাটি বলার সময় ঠোঁটদুটো ছুঁচোর মতো সামনে উলটে এল, বাঁ চোখ ছোট হয়ে শর্টসার্কিট বাতির মতো তিড়িক করে লাফিয়ে উঠল।) সব একসঙ্গে তাল করে চিটেগুড় দিয়ে মেখে ফুরফুরে অম্বরী তামাক।
পিতা বললেন, তোমার ভূমিকাটা কী? তখন থেকে ফড়ফড় করছ! তোমার মুখ দেখলে এলিস ইন দি ওয়ান্ডারল্যান্ডের সেই চেশায়ার ক্যাটের কথা মনে পড়ছে, এ গ্রিন উইদাউট এ ফেস। কোনও কোনও প্রাণী শাঁকালু দেখলে ওইভাবে হাসে। তোমার এই বোকা সেন্টিমেন্টাল বন্ধুর টাকাকে শাঁকালু ভেবে হাসিটা মুখে পার্মানেন্ট হয়ে গেল নাকি?
পিতার কাঁধের পাশ থেকে মাতামহ বললেন, ওটা হল ফেউয়ের হাসি।
প্রতাপ রায়ের অসম্ভব সহ্যশক্তি। এতটুকু না রেগে বললেন, বড় বড় গাইয়েদের সঙ্গে তাল। মেরে ফিরি তাই হাসিটা মুখে লেগেই থাকে। এই ছবি করার ব্যাপারে আমার বিশেষ কোনও ভূমিকাই নেই। পিতৃদেব কিছু টাকা, একটা বাড়ি, বিলিতি একটা গাড়ি রেখে গেছেন, বিয়েথা করিনি, ওস্তাদ মেরে বেড়াই, সেই টাকারই কিছু শ্রাদ্ধ হবে। শাঁকালু আমি দেখিনি, শাঁকালু দেখেছে আপনার শ্যালক।
পিতা এবং মাতামহ দু’জনেই একেবারে থ হয়ে গেলেন। এও সম্ভব। জগতে তোক চেনা ভার মুখ দেখে। মাতুল বললেন, প্রতাপ, তুই শেষে আমাকে ভাল্লুক ভাবলি?
ওঁরা যে আমাকে ভাল্লুক ভেবেছিলেন?
পিতা বললেন, এমন একটা প্রতিভা ভুলপথে চলে নষ্ট হয়ে যাবে, তুমি বারণ করতে পারছ না?
করেছিলুম। শুনবে না। ব্যাপারটা জেদাজেদির পর্যায়ে চলে গেছে। হতে চেয়েছিল মিউজিক ডিরেক্টর। ল্যাং মেরে দিয়েছে। সেই থেকে গোঁ চেপেছে, নিজে ছবি করবে, সেই ছবির মিউজিক ডিরেক্টর হবে। নৌশাদ ফৌশাদ সব তলিয়ে যাবে।
পিতা হা হা করে প্রাণখোলা হাসি হেসে চেয়ারে বসলেন। আরে, বোসো বোসো। আমার একটা ঘটনা মনে পড়ছে হে।
মাতুল ইতস্তত করছেন। উঠে যখন পড়েছেন তখন বসা কি আর উচিত হবে। হাসি শুনে দর্শন ছেড়ে মেসোমশাই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলছেন, পরিস্থিতি শান্ত হয়েছে?
আপাতত। বিনয়দা আসুন। অনেকক্ষণ কচলাকচলি করেছেন। মেয়েটাকে এবার একটু রেস্ট দিন। মাতুলের দিকে তাকিয়ে সামান্য বিরক্তির গলায় বললেন, কী হল তোমার? বসতে বললুম না?
বসার সাহস পাচ্ছি না।
সেকী? তুমি চন্দ্রলেখা করে ঢাকের ওপর মেয়েছেলে নাচাবে, তোমার সাহস নেই?
মেসোমশাই চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, ঢাকের ওপর কেন? লাল মেঝেতে কিংবা কার্পেটের ওপর নাচালে ক্ষতি কী? ঢাকের ওপর থেকে দুম করে পড়ে গেলে কী হবে?
আরে মশাই, এ ঢাক সে ঢাক নয়, জয়ঢাক। শ্রাদ্ধের সঙ্গে তিলকাঞ্চন।
মাতুল বসে পড়লেন। আমতা আমতা করে বললেন, কই আমি তো চন্দ্রলেখার কথা বলিনি। আমি এমন একটা ছবি করব, যে-ছবি মানুষের চোখের জল টেনে বের করে আনবে। শিল্পীর বঞ্চিত জীবন। প্রতিভা আছে সুযোগ নেই। গোটা আঠারো গান থাকবে। সব রাগরাগিণীর ওপর। দরবারি, বাগেশ্রী, মালকোষ, দেশ। সব কম্পোজ করা হয়ে গেছে।
শেষ দৃশ্যে নায়কের টিবি?
আজ্ঞে হ্যাঁ, ধরেছেন ঠিক। দরবারির ওপর বেস করে গান। তেমনি বাণী!
হৃদয়বিদারক?
আজ্ঞে হ্যাঁ। এ জীবনে আর কোনও প্রয়োজন নাই। এক এক লাইন গাইছে, আর মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
কাশছে, এক ঝলক রক্ত উঠছে, আর দরবারিতে এ জীবন, এ জীবন করছে। তাই তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ, একেবারে অবিকল।
মাথায় আর কিছু এল না?
কেন?
দুঃখ, মৃত্যু, প্রেম, এ ছাড়া কিছু ভাবা যায় না? কেন, টকি অফ টকিজ কি মানময়ী গার্লস স্কুলের মতো একটা বই করা যায় না।
ওসব এখন চলবে না। মানুষের মনের ভেতর উঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরোতে হবে। মানুষ এখন কাঁদতে চায়। বেদনায় জন্ম নেবে যন্ত্রণার শতদল, জীবনের ইতিহাস লেখা হবে রক্তের অক্ষরে, জীবনের মূল্য শুধু অশ্রুজল, তৃণশীর্ষে শিশিরের ক্ষণস্থায়ী বিন্দু।
ও, তোমার তো আর্টস ছিল। সবেতেই তাই এলিয়ে পড়ো। জীবনে চোখের জল তো আর ফেলতে হল না। তাই চোখের জল নিয়ে কাব্য করতে পারছ। তবে হ্যাঁ, যে-লাইনে নাক গলাতে চলেছ তার শেষটা অবশ্য অশ্রুজলেরই কাব্য। তুমি তো সাহিত্যের ছাত্র ছিলে, পড়েছ কি না জানি না, ভার্জিল থেকে দুটো লাইন বলি, Human deeds have their tears and morality touches the heart.
আমি তা হলে কী করব?
প্রথমে তুমি তোমার পিতার কাছে ক্ষমা চাইবে। তারপর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবে, আমাকে শুভবুদ্ধি দাও।
আমার অপরাধ?
সেকী? তোমার অপরাধ, তুমি জানো না? প্রথম অপরাধ, পিতাকে অপমান।
মাতুল সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আপনারা দেখছি এজলাস বসিয়ে ফেলেছেন।
তা বলতে পারো। পাশে জজসাহেবও বসে আছেন, বিনয়দা। তোমার দ্বিতীয় অপরাধের বিচার এখন হবে না, হবে পরে। সেটা হল বুদ্ধিবৈকল্য।
মাতামহ বললেন, ক্ষমা চাইতে হবে না। ও তো ছেলেবেলা থেকেই এইভাবে কথা বলে। মা-মরা ছেলে।
পিতা বললেন, জানি জানি, ও তো আমার কাছেই মানুষ। আজই না হয় আতর-মাখা ওস্তাদ হয়েছে। অতীত সহজে ভুলতে পারে বলেই বর্তমানে মানুষের তুড়িলাফ। অতীতের সব ছবি আমার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। হয়তো বয়েস বাড়ছে বলেই। বর্ষার রাত। ওর দিদি ডিম দিয়ে খিচুড়ি বেঁধেছে। অনেক রাত হয়ে গেছে। ওই টিনের চালে ঝমঝম বৃষ্টি পড়ছে। চাদর মুড়ি দিয়ে এই বাবু তখন ঘুমে কাদা। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি আমি। বিছানা থেকে পাঁজাকোলা করে তুলে আসনে বসিয়েছি। মাথা ঢুলে পড়ছে। আমি ধরে আছি, ওর দিদি একটু একটু করে খাইয়ে দিচ্ছে। এক এক চামচে তুলছে, ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করে পাখির ঠোঁটে পুরে দিচ্ছে। আমি দেখতে পাচ্ছি। এমনকী ওর দিদির নাকের নাকছাবির হিরের ঝিলিকটি পর্যন্ত চোখের সামনে খেলে যাচ্ছে। কী অদ্ভুত মিল দুজনের মুখের। আমি ওকে দেখছি, ওর দিদির মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আমরা তিনজন একই বিছানায় পাশাপাশি শুয়েছি। ভোরে আমার এসরাজের সঙ্গে গলা সেধেছে। সে মিলন আর সে বিচ্ছেদ কোথায়? সেই রাত, সেই দিন, মাস, বৎসর কোথায়?
