প্রতাপ রায় বললেন, যাঃ বাবা।
মাতুল উঠে দাঁড়ালেন, কোলের ওপর থেকে কেঁচা পাটে পাটে, ধাপে ধাপে মেঝেতে নেমে এল। ভীষণ অপমানিত হয়েছেন। দুর্দান্ত রাগী মানুষ। এমন বেকায়দায় পড়েছেন রাগতেও পারছেন না। ফরসা মুখ জবাফুলের মতো টকটকে লাল। কেঁচা ঝেড়ে হাতে ধরে বললেন, বেশ আমি চলে যাচ্ছি। আপনার নির্দেশ মনে থাকবে।
প্রতাপ রায় বললেন, বাড়ি মর্টগেজের ব্যাপারটা তা হলে কী হবে? মিনিমাম দু’লাখ নিয়ে ফ্লোরে নামতে হবে।
সে হবে। এখন জামাইয়ের তোয়াজে আছেন। বাড়িতে তো ফিরতেই হবে। মর্টগেজ ডিড তৈরিই আছে, ধরে সই করিয়ে নোব। বাড়ি বাঁধা রেখে তো আর দু’লাখ হবে না। সীমার গয়না বেচে কয়েকদিন কাজ চালাই।
মাতামহ আর্তনাদ করে উঠলেন, ওকে তোমরা ধরো। ওকে বাঁচাও। ফতুর হয়ে যাবে। সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে। আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।
পিতা বললেন, উতলা হবেন না। ভাগ্যকে ধরে রাখা যায় না। It is all a chequer-board of nights and days/where destiny with men for pieces plays. উতলা হবেন না। শুধু দেখে যান।
মাতুল রাগ-রাগ গলায় বললেন, ফিমের কিছুই যখন বোঝেন না, তখন মন্তব্য না করাই ভাল। আমি পুডোভকিন হব, আমি গদার হব, আমি আইজেনস্টাইন হব। হয়ে দেখাব।
মাতামহ বললেন, এসব কী বলছে গো? আমরা ছেলেদের তো বলতুম, বিদ্যাসাগর হও, বিবেকানন্দ হও, রবীন্দ্রনাথ হও। এরা আবার কারা?
পিতা বললেন, জানো যখন কিছুই বুঝি না, তখন দয়া করে বোঝাতে এলে কেন? তুমি হয়তো আবদুল করিম হতে পারতে, গোলাম আলি হতে পারতে। একেবারে দ্বিতীয় হতে না পারলেও কাছাকাছি যেতে পারতে। তোমার ভাগ্য। ভাগ্যের ঘোড়া ছুটল বেরাস্তায়। বয়েস হয়েছে, যা ভাল বোঝে তাই করো।
আজ্ঞে হ্যাঁ, তাই করব। শুধু নাম নয় অর্থও। সাত দিন হাউসফুল হলে সব টাকা উঠে আসবে। চোদ্দো দিনে টাকা ডবল, আটাশ দিনে চার ডবল।
ব্যস ব্যস, তাই করো। সেই চটে শুয়ে মুটে রাজার গল্প। সেই ফেরিঅলার গল্প। মনে নেই দিবাস্বপ্ন দেখতে দেখতে সব ভেঙে চুরমার করেছিল। আমি তোমার কথা নয়, কাঁচ ভাঙার শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
ওল্ড জেনারেশন আর নিউ জেনারেশনে এই হল তফাত। টাকা সিন্দুকে রাখলে বাড়ে না। ছাতা পড়ে যায়। টাকা বাড়ে ব্যবসায়ে খাটালে। কোনও নন-বেঙ্গলি ব্যাবসার নামে এমন আঁতকে ওঠে না।
বাঙালির ব্যাবসা আমার জানা আছে। তোমার এটা ব্যাবসা নয়, ফাটকা।
রাজকাপুরের নাম শুনেছেন? জেমিনি গণেশনের নাম শুনেছেন?
প্রতাপ রায় বললেন, উত্তেজনায় তুই নাম গোলমাল করে ফেলেছিস। শিবাজি গণেশন। জেমিনি স্টুডিয়োর নাম। চন্দ্রলেখা করে কোটি কোটি টাকা রোজগার করেছিল।
চন্দ্রলেখা? তুমি চন্দ্রলেখা করবে? চন্দ্রলেখা?
কথায় কথায় পিতা কিঞ্চিৎ শান্তভাব ধারণ করছিলেন। মুখ দেখে মনে হচ্ছে ফেটে পড়লেন বলে। ভিসুভিয়াসের মুখ দিয়ে লাভ বেরোয়। পিতার মুখ দিয়ে লাভার বদলে চন্দ্রলেখা বেরোচ্ছে ছিটকে ছিটকে। কেউ না জানুক, আমি জানি কারণটা। এক ঢিলে দু’পাখি মারা হচ্ছে। চারদিকে তখন চন্দ্রলেখার খুব প্রচার। সাংঘাতিক, ফ্যাবুলাস, সার্কাস, সোর্ডফাইট। কে জানত ওর মধ্যে আরও সব উঁচু উঁচু ব্যাপার আছে। আমার কথাতেই পিতা সপুত্র সেই ছবি দেখতে গেলেন। সবচেয়ে দামি আসনে দু’জনে পাশাপাশি বসে আছি। অন্ধকার ঘরে পিতা কখনও হরীতকীর টুকরো, কখনও যোয়ান, কখনও পাতলা কাগজে মোড়া লজেন্স এগিয়ে দিচ্ছেন। জিভ নানা রসে একেবারে চুর হয়ে আছে আরকের মতো। কষা থেকে মিষ্টি, মিষ্টি থেকে ঝাল, ঝাল থেকে মিষ্টি। পিতার ওপাশে একত্সর যুবতী। আমার পাশে মধ্যবয়সি একসার গোঁত্তামারা ভদ্রলোক। অবশেষে বই শুরু হল হাতির তোলা শুড়ের জল ছিটোনো দিয়ে। প্রথমটায় অত বোঝা যায়নি। বেশ চলছিল রাজারাজড়ার ব্যাপার। হঠাৎ শুরু হল ঢাকের ওপর যুবতীর নৃত্য। দক্ষিণী শরীর। যেমন নিতম্ব, তেমনি বক্ষ। চোখ ঠিকরে কোটর ছেড়ে পরদায় গিয়ে ঠোক্কর মারছে। নীচে সামনের সারির দর্শকরা নেচে নেচে উঠছে। দু-একজন চেয়ার ভেঙে পড়েও গেল। পিতা বললেন, হরি। পেছনের দর্শকরা বললেন, চপ। নর্তকীরা হঠাৎ পেছন দিকে চেত্তা খেয়ে পড়তে লাগলেন। জীবনে অমন কুচ যুগ’ দেখিনি। কাঁচুলি ফেটে ফ্যাটাস করে বেরিয়ে না পড়ে। পিতা বললেন, হরেন্ডাস। পেছনের দর্শক বললেন, চোপ। এরপর মেয়েদের ঘাড়ের ওপর দিয়ে ছেলেরা, ছেলেদের ঘাড়ের ওপর দিয়ে মেয়েরা চলে যেতে লাগল। মত্তপ্রমত্ত অবস্থা। এরপর গোদের ওপর বিষফোঁড়া। চন্দ্রলেখার কেরামতি দেখে রাজা কামার্ত হয়ে, হাউমাউ করে তেড়ে এলেন। পিতা বললেন, গেট আপ। হাত ধরে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে প্যাসেজ পার করে হলের বাইরে নিয়ে গিয়ে ফেললেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্রেফ দুটি কথা, আরে ছ্যাঃ ছ্যাঃ, তোমার এই টেস্ট হয়েছে। মাই গড! ঠিক সেইসময় পাশ দিয়ে বোকাবোকা চেহারার এক ভদ্রলোক কাছাকোঁচা সামলাতে সামলাতে যাচ্ছিলেন, থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, কী করেচে, নাক খুঁটেছে? শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গে ঝাঁকুনি মেরে পিতা বললেন, বাক আপ। ধড়ফড় করে সামনে এগোতে এগোতে ভদ্রলোক বললেন, বাবা রে। পিতা হেসে উঠলেন। শেষ লজেন্সটি হাতে দিয়ে বললেন, তোমার দোষ নেই। যেমন শুনেছ তেমনি করেছ। এসব ছবি কক্ষনও দেখবে না। এসব হল নেগেটিভ পিকচার্স। ব্রেনওয়াশের জন্যে তৈরি। ক্যাপিটালিস্টদের চাল। নৈতিক ব্যাকবোন ভেঙে দিয়ে কল্পজগতের সরীসৃপ করে রাখার ষড়যন্ত্র। আর ইউ এ হিউম্যান ফডার ফর দেয়ার ক্যান? পাশ দিয়ে ঝড়ের বেগে একটা বাস চলে গেল ধুলো উড়িয়ে। নাকে চাপা নাকে চাপা বলে পিতা পকেটে রুমাল খুঁজতে লাগলেন। আঁধি উঠেছে আঁধি। সেই চন্দ্রলেখার নাম শুনে পিতা তো লাফাঁকেনই।
