আজ্ঞে না। দেখি কী তুলো আনলেন? ভিজে যায়নি তো!
মাতামহ মাথা নিচু করলেন। এইবার সেই মুহূর্ত এসেছে। জীবন-মরণ সমস্যা। আমতা আমতা করে বললেন, তুলে আনা হয়নি হরিশঙ্কর।
কেন? ঘুমিয়ে পড়েছিলেন? দিবানিদ্রা?
না না, সে এক অলৌকিক ব্যাপার।
তার মানে? তুলো উড়ে গেছে?
না না, সে এক মহা অলৌকিক ব্যাপার।
আপনাদের সবেতেই দেখছি অলৌকিক ব্যাপার! থাকেন লৌকিক জগতে, কাজকারবার সব অলৌকিক জগতে! মজা তো মন্দ নয়। আপনারা আমার সব প্ল্যান বানচাল করে দিলেন। বললেই পারতেন, পারব না।
কনক বললে, মেসোমশাই, এখন আর মেজাজ খারাপ করবেন না। পাঁপড়ভাজা আর চা খান, তুলোর চিন্তা পরে করা যাবে।
তুমি বলছ বটে, তবে আমার সমস্ত পরিকল্পনা একেবারে ভেস্তে গেল।
বাড়ির সামনে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। এই ঝড়ের রাতে কার আবার অভিসার! দরজা খোলা। আর বন্ধের শব্দ। এই বাড়িতেই কেউ এলেন। গাড়ি চেপে কার আগমন? সুরেলা গলা উচ্চগ্রামে খেলে গেল, পিন্টু, পিন্টু।
মাতুল এসেছেন। আরে বাপ রে! মহামান্য অতিথি। তটস্থ হয়ে থাকতে হবে। পান থেকে চুন খসলেই বিপদ। আসুন আসুন। অভ্যর্থনা জানাতে গিয়ে কাছা কেঁচা খুলে যাবার মতো অবস্থা। সেই পরিচিত সুবাস সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছে। সেই পরিচিত জুতোর শব্দ। সেই ফিনফিনে শৌখিন মানুষটি এবার দৃশ্যমান। আর একটু ফরসা হলে মনে হত ধুতি-পাঞ্জাবি পরা সাহেব। আলো পড়ে বুকের একসার হিরে-বসানো বোম জলতরঙ্গের মতো হাসছে। কখনও এটা কখনও ওটা। মাতুলের পেছনে আর এক ভদ্রলোক। যে-কোনও বিয়েবাড়িতে এমন কাঠামোর মানুষ প্রায়ই দেখা যায়। হৃষ্টপুষ্ট। লাগাম ছাড়লেই ফচকেমিতে ভেসে যাবেন। সমস্ত মহিলাই এঁর বউদি। চিরন্তন ঠাকুরপো। ঝুলনতলার নাচের তাবুতে লোকটি কনুইয়ের খোঁচা মেরে বলেছিল, মাগির রস আছে। মহিলারা এই মানুষটিকে অবশ্যই বলবেন, মিনসের রস আছে। গা থেকে সেই পরিচিত গন্ধ বেরোচ্ছে। পুরুষালি ঘাম, সিগারেট আর সেন্ট। ব্যাকব্রাশ চুল। যৌবনের ব্রণ মুখে দু-চারটে ক্ষত রেখে চলে গেছে। এমন মানবের সঙ্গে মেশার আগে মহিলাদের খতিয়ে দেখা উচিত, কোথাকার জল কোথায় গড়ায়! অকারণে মুখে যে-হাসি লেগে আছে, সে হাসি দেখলেই পিতা বলতেন, উজবুকের মতো হাসছ কেন বলো তো? পৃথিবীটা কি এতই আনন্দের জায়গা।
মাতুল আমার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে বললেন, সব ঠিক আছে তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আবহাওয়া অনুকূল না প্রতিকূল?
আলেকজান্ডার সেই পুরুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন না! তুমি কীরকম ব্যবহার প্রত্যাশা করো? মাতুলের প্রশ্নের উত্তর আমাকে আর দিতে হল না। পিতা পেছন থেকে আলেকজান্ডারের কণ্ঠে পালটা প্রশ্ন করলেন, তুমি কীরকম আবহাওয়া চাও?
মাতুল পুরুর মতোই বীর দর্পে বললেন, মৃদু এবং মোলায়েম। ময়েন দেওয়া লুচির মতো।
তৈরি করে নাও।
এসে যখন পড়েছি, অনুমতি পেলেই হাত লাগাব। বেতলব দে তো মজা উস-র্মে সিবা মিলতা হৈ। বোহগদা জিস-কো নহ হো খু-এ সবাল, আচ্ছা হৈ। না চাইতেই যদি দেন তো তার স্বাদই আলাদা; সেই তো শ্রেষ্ঠ ভিখারি, হাতপাতার অভ্যেস হয়নি যার।
আহা গালিব দিয়ে শুরু করলে! সব মাটি করে দিলে। বেশ একটা রাগ-রাগ ভাব আসছিল। তোমাকেও ফায়ার করার ইচ্ছে হচ্ছিল।
আমাকে? আমার অপরাধ?
তোমার অপরাধ? তোমার উপেক্ষা। এই ঝড়ের রাতে পারিবারিক হাড়ি খুলে পচাই বের করতে চাই না। আজ হল শ্যাম্পেন নাইট। তুমি স্রেফ তরে গেলে গালিবের জন্যে, তরে গেলে এই ভদ্রলোকের জন্যে।
ও হ্যাঁ, পরিচয় করিয়ে দিই। প্রতাপ রায়। আমার কলেজ জীবনের বন্ধু। অসাধারণ ভাল তবলা বাজায়।
প্রতাপ রায়ের কাণ্ডজ্ঞান আছে। প্রণামটি চট করে সেরে নিল। মাতুল সাধারণত কারুর কাছে। মাথা নিচু করেন না। তবে ভগিনীপতির কাছে অহংকার খাটো করার অভ্যাস বজায় রেখেছেন।
পিতা জিজ্ঞেস করলেন, তুমি হঠাৎ এলে কেন? তুমি তো সহজে আসো না। তোমার জগৎ তো আলাদা। এ কি তোমার মতিভ্রম!
মাতুল বললেন, ধরেছেন ঠিক। পৃথিবীকে আপনি যতটা চেনেন, আর কেউ ততটা চেনে না। আপনারই কথা, ধোঁয়া দেখলেই বুঝবে আগুন। আমরা এসেছি আপনাদের দুজনকে ধরতে।–
হঠাৎ। নিশ্চয়ই স্বার্থ আছে।
অবশ্যই।
টাকাপয়সার ব্যাপার?
অবশ্যই।
তা হলে পরিবেশ বিষিয়ে ওঠার আগে একটু চা খেয়ে নেওয়া যাক।
প্রতাপ রায় ঠিক তালে ছিলেন। কনককে দেখেই বললেন, এক গেলাস জল খাওয়াবে ভাই।
সুন্দরীরা বড় তৃষ্ণার্ত করে তোলে বুঝি!
১.১২ রতনে রতন চেনে, ভালুক চেনে শাঁকালু
পাঁপড়ভাজা আমি খাই না। ও আপনি নিয়ে যান। চিরকালের নাক-তোলা মাতুল, হাত নেড়ে, মাথা নেড়ে ভয়ংকর এক ভঙ্গি করলেন। যোড়শীর বদলে বৃদ্ধা তেড়ে এলে মানুষ এমন ছিটকে যেতে পারে। বর্ষার রাতে মুচমুচে পাঁপড়ে এমন বিতৃষ্ণা বড়ই বেমানান। কনক হকচকিয়ে গেছে। মাতুল আবার আপনি বলে বয়েস আর ব্যবধান দুটোই বাড়িয়ে দিয়েছেন।
পিতা বললেন, ও হ্যাঁ, তুমি তো আবার চপকাটলেট ছাড়া অন্য কোনও মধ্যবিত্ত খানা পছন্দ করো না। পোস্ত, বড়ি, মুড়ি, পাঁপড়।
আজ্ঞে না, তা কেন? পোস্ত দিয়ে পরোটা আমি ভীষণ ভালবাসি। পাঁপড় কেমন যেন বুড়োটে খাবার।
তাই নাকি? তা হলে তুমি বিস্কুট খাও, কটেজ ক্রিম।
বিস্কুট তো রুগিরা খায়।
ও, রুগিরা খায়!
