জানলা ফাঁক করে কনক এতক্ষণ বৃষ্টি দেখছিল। গাছপালা সব জবুথবু হয়ে ভিজছে! একদল দৌড়বীরের মতো বৃষ্টি রাস্তার ওপর দিয়ে ধর ধর করে দৌড়েই চলেছে। ছোটার যেন শেষ নেই। পাল্লা বন্ধ করে কনক মাতামহর কাছে সরে এসে বললে, কী, চা খেতে ইচ্ছে করছে?
মাতামহ সুবোধ বালকের মতো মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ।
পাঁপড়ভাজা।
মেসোমশাই যে-ঘরে বসে মুকুর সঙ্গে তর্কশাস্ত্র নিয়ে ধস্তাধস্তি করছেন সেই ঘরের দিকে উঁকি মেরে ভয়ে ভয়ে বললেন, বুডোর খাইখাই দেখে তোমার বাবা যদি রেগে যান!
কনক হেসে বললে, বা রে, রেগে যাবেন কেন?
আমতা আমতা করে মাতামহ বললেন, তা ছাড়া জামাইটা বাইরে এই দুর্যোগে কোথায় এখন ভিজছে কে জানে? আমরা বেকারের দল মজা করে চা-পাঁপড় খাব, আর সে বেচারা ভিজে জাব হয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি আসবে। সেটা কি ভাল দেখাবে নাতনি!
নীচে একটা হ্যাটহুট শব্দ শোনা গেল। যাক পিতৃদেব বেশি না ভাবিয়েই ফিরে এসেছেন। প্রকৃতির কাছে হেরে যাবার মানুষ তিনি নন। মাঝে মাঝে গর্ব করে বলেন, আমি একটা ট্যাঙ্ক। এমন কোনও শক্তি নেই আমাকে থামিয়ে রাখতে পারে।
পিতার গলা আবার শোনা গেল, দুধ খাবে একজন, আর গোবরে মাখামাখি হবে আর একজন। ব্যাটা, এটা তোমার মামার বাড়ি?
মাতামহ আনন্দে আটখানা, ঠিক বলেছে, ঠিক বলেছে। চলো চলো আমরা যাই। গোবরকুণ্ড থেকে উদ্ধার করে আনি।
সামান্য গোলমাল, তাইতেই মেসোমশাই বিরক্ত। তুমি পড়ো তুমি পড়ো, বলতে বলতে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। একটা মানুষ বটে! যাই বলো বাবা, বেশ স্বার্থপর! কনক কিন্তু একেবারে অন্যরকম। দু’জনের তফাত একেবারে উত্তরমেরু দক্ষিণমেরু। কনক নীচে নেমে গেল। আমরা দুজনে সিঁড়ির মাথায় বৃষ্টিধৌত বীরকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্যে স্থির দণ্ডায়মান।
মারাত্মক কিছু একটা সিঁড়ির দু’পাশের দেয়ালে ঠকাস ঠাস করে ধাক্কা খেতে খেতে ওপরে উঠছে। পিতা কি শেষে বর্ম শিরস্ত্রাণ পরে ফিরে এলেন! কিছুই বিশ্বাস নেই। সব পারেন। ধনুকের মতো কী একটা ঘাড়ে করে উঠছেন। পেছনে কনক। একেবারে বাধ্য মেয়ে। মেসোমশাইয়ের চেয়ে আমার পিতার সঙ্গে যেন বেশি মানিয়েছে।
মাতামহ বললেন, বাঃ বাঃ, বেশ মানিয়েছে হে। মহাভারতের পাতা থেকে যেন গাণ্ডীব ধারণ করে উঠে এলে! বস্তুটা কী গো! কোথাও হরধনু ভঙ্গের কমপিটিশন হচ্ছিল নাকি আজ?
একটা দিক কনকের কাঁধে। জিনিসটাকে ধীরে ধীরে দেয়ালে ঠেসিয়ে রেখে পিতা কনকের পিঠে দু’বার তারিফের চাপড় মেরে বললেন, তুমিই হলে রিয়েল কর্মী। আর এঁরা হলেন মহামান্য দর্শক। ন্যাজ নাড়েন শিকার ধরেন না। হ্যাঁ, কী যেন বলছিলেন? হরধনু ভঙ্গ! তা হলে তো একটি সীতাও আসত বুড়ো রামচন্দ্রের পেছন পেছন।
মাতামহ গ্রাহ্যই করলেন না। গীতার মহাপুরুষ। আক্রমণ অনাক্রমণে স্থির, অচঞ্চল। তিনি সেই যন্ত্রের ছিলেতে আঙুলের টুসকি মারলেন। ব্যাঙাও ব্যাঙাও করে শব্দ হল। বাঃ যন্ত্রটি বেশ তো! দক্ষিণ ভারতীয় সংগীতের সঙ্গে জমবে ভাল। ইল্লেহেহে কুড়হুহু।
আপনার সংগীতের সঙ্গেও মানাবে ভাল। তবে বাজাতে পারবেন না। এ চালাতে হলে ষাঁড়ের ডালনা খেতে হবে বছর দুই।
মাতামহ বললেন, তোব তোবা, তা হলে আনলে কেন?
কনক বললে, মেসোমশাই, এটা তুলোধোনা যন্ত্র না?
আঃ ঠিক ধরেছ। ভেরি ইনটেলিজেন্ট, ভেরি ইনটেলিজেন্ট। তোমার মতো একজন কেউ আমার পাশে থাকলে সংসারে ফুল ফুটিয়ে ছেড়ে দিতুম।
পিতা ঘরে ঢুকলেন। হাতে একটা হাফ মুগুর। ওইটা দিয়ে তাতে আঘাত করলে ব্যাঙাও ব্যাঙাও করে শব্দ হয়। ছটফট ছটফট করে চার পাশে তুলো লাফাতে থাকে। শৈশবে বাড়ির বিশাল ছাতে ধুনুরি এসে বসলে আমাদের উত্তেজনা বেড়ে যেত। মুগুরটাকে অনেকটা মিনারের মাথার মতো দেখতে। কনক হাত থেকে নিয়ে ঘরের এক পাশে সাবধানে রেখে দিল। এই প্রথম চিন্তাটা মনে। উঁকি দিয়ে গেল, কনক যদি আমার মা হয়ে এই সংসারে বেশ আঁকিয়ে বসে, তা হলে কেমন হয়? মন্দ কী? বয়েসে একটু ছোট হবে। তা হলেও, মা ছোট হলেও মা। ছেলে হিসেবে আমি একটু বেমানান হয়ে যাব। এই যা সমস্যা! ট্রেনের টিকিট চেকার সেই সুখেনকে ধরেছিল। হাফ টিকিটে ওপরের বাঙ্কে চাদর মুড়ি দিয়ে বোম্বাই যাচ্ছিল। চাঁদরের বাইরে পা বেরিয়ে পড়েছে। চেকারের হাতে টিকিট,নজর পায়ের দিকে, এতনা মোটা গোড়, এতনা লম্বা বাল, হাফ টিকিট? সুখেনের দাদা বলছেন, মোটা হুয়া তো কেয়া হুয়া, গোদ হুয়া সাহাব। লোকে হয়তো বলবে, আহা মেয়েটার কী ভাগ্য, একেবারে রাজহাঁসের মতো ছেলে নিয়ে চলেছে। ধেড়ে গলায় যখন ম্যা ম্যা করে ডাকে তখন প্রাণ একেবারে জুড়িয়ে যায়? কেন যে এসব চিন্তা আসছে। বড় পাপ ঢুকেছে মনে। হিংসে, অভিমান, লোভ, কামনা, সব মিলেমিশে মন নয় তো, জগাখিচুড়ি।
মাতামহ বললেন, হঠাৎ তুমি এই যন্ত্রটা কিনতে গেলে কেন হরিশঙ্কর! ভাল দেখে একটা তানপুরা কিনলেই পারতে!
ভিজে জামা খুলতে খুলতে পিতা বললেন, তাতে তো আর তুলো ধোনা যেত না!
তুমি তুলো ধুনবে? সব ছেড়ে তোমার এমন অদ্ভুত ইচ্ছে কেন?
সংসারে সবকিছু শেখা দরকার। সেলফ হেলপ। পরমুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকব কেন? নিজের কাজ নিজে করে নোব। সংসারের সাশ্রয়।
এটাও কি তুমি ডিসপোজাল থেকে কিনলে?
