পিতা ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছেন। শ্যালক একের পর এক ফাঁকড়া বের করছেন। সামান্য খাওয়া নিয়েও মানুষের সংসারে কত ফ্যাচাং। এ ব্যাপারে মাতামহ আমার সোনারচাঁদ ছেলে। কোনও বায়নাক্কা নেই। একেবারে কোণের দিকে একটা বেতের চেয়ারে বসে আপন মনে একা একা পাঁপড়। চিবোচ্ছেন। যেন এ জগতের মানুষই নন। মা ছোট্ট ছেলেকে ধামিতে মুড়িমুড়কি দিয়ে বসিয়ে দিয়ে গেছেন যেন! শিশু ভোলানাথ খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে, পাখি দেখছে, হাত নাড়ছে। চোখে কেবল মোটা করে কাজল আঁকা নেই, কপালে ধেবড়ানো টিপ নেই। কনকও ভীষণ বিপদে পড়েছে। এক পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছো কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কে জানে?
পিতা বললেন, তা হলে তুমি কেক খাও।
না না, কেক দাতে বড় জড়িয়ে যায়, জিবে বিচ্ছিরি একটা কোটিং পড়ে যায়।
তাই নাকি? তুমি টুথব্রাশ দিয়ে খাও। আমি তোমাকে নতুন টুথব্রাশ দিচ্ছি। এক কামড় করে খাও আর ব্রাশ দিয়ে ঘষে দাও।
সেটা একটা পাগলামো হবে।
পাগল তো পাগলামি করবেই। সেইটাই তো তার স্বভাব! বেশ, তুমি তা হলে ওমলেট খাও। কনক, তুমি ওমলেট করে নিয়ে এসো তো!
মাতুল বললেন, হ্যাঁ ওমলেট চলতে পারে, তবে পেঁয়াজ ছাড়া। আর মাখন দিয়ে নরম করে ভাজা।
কনক পাঁপড় নিয়ে চলে যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছে, প্রতাপ রায় বললেন, আমাকে দিয়ে যাও। আমার খোলটা অনেক বড়।
কনক পাঁপড়ের ডিশটা প্রতাপ রায়ের সামনে কোনওরকমে নামিয়ে রেখে পালিয়ে বাঁচল। মেয়েরা মানুষ পড়তে পারে। চোখের ভাষা, মুখের মুচকি হাসি। বহু যুগের অ্যানিম্যাল ইন্সটিংক্ট। প্রতাপ রায় যেন রেডিয়ো ট্রান্সমিটার। যখন যেখানেই থাকুন না কেন, লাগাতার বিপ বিপ করার জন্যেই জন্মেছেন। আমাদের ভোমলা পাগলা। ডাকলেই বলবে, কী করতে হবে? ওই মেয়েটাকে চুমু খেতে হবে। সন্ধ্যা শিশি হাতে কেরোসিন তেল আনতে যাচ্ছে, ভোমলা দৌড়োল পেছন পেছন। ভোমলার পেছন পেছন দৌড়োলুম আমরা, ওরে, না-রে, না-রে, তোকে রুটি খাবার জন্যে ডেকেছিলুম। তিন দিন উপোস করে আছিস।
পিতা বললেন, তোমার স্বভাবের সাত খুন মাপ হয়ে যায়, তোমার একটি মাত্র গুণের জন্যে। সে হল তোমার সংগীত। তোমার বড়লোকি চালের জন্যে যখনই ঘৃণা করতে ইচ্ছে করে তখনই কানে ভেসে আসে তোমার সুর, কৈসে গুজার গই হায় জওয়ানি। সেই ছেলে, সেই এতটুকু ছেলে, স্কুলে আমার কোলে বসে গান গেয়েছিলে বাগেশ্রীতে, কোলে তুলে নে মা কালী। তাবড় তাবড় গুণী সেদিন কাত হয়ে গিয়েছিল। সময়, সময়! সময় কীভাবে চলে যায়। ব্রিজের ওপর দিয়ে যেন মেল। ট্রেন ছুটছে।
মেসোমশাই ওঘরে বাঘের মতো চিৎকার করে উঠলেন, মূর্খ! সেই সকাল থেকে চেষ্টা করছি, কিছুতেই তোমার মাথায় ঢুকছে না, শি অ্যাস, শি গোট। কোতের পজিটিভিজমের সারকথা কী? চিন্তাধারা পরপর তিনটি ক্রম পার হয়ে এগিয়েছে। কী কী? আধিদৈবিক, আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক। বলো, বারবার বলো। মুকু ঘুম-জড়ানো গলায় বলতে লাগল, আধিদৈবিক, আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক।
মাতুল এতক্ষণে জিজ্ঞেস করলেন, এঁরা কারা?
এঁরা হলেন মেজদার ভায়রাভাই আর তার দুই মেয়ে।
ও, এঁরাই তো সেই রেঙ্গুনে ছিলেন। ইভ্যাকুয়েশানের সময় আরাকানের জঙ্গলে স্ত্রী মারা গেলেন? আচ্ছা সব বড় বড় হয়ে গেছে। উনি আর বিবাহ করেননি?
কোনও সেনসিবল মানুষ দ্বিতীয় পক্ষ গ্রহণ করে? তোমার বাবা, আমি, ওই ভদ্রলোক। ইচ্ছে করলে আমরা আবার সংসারে ঢুকতে পারতুম। স্রেফ তোমাদের মুখ চেয়ে আমাদের এই স্যাক্রিফাইস। তোমরা এর দাম দিতে পারবে?
কেন পারব না?
ওই তো তার প্রমাণ। তোমার বৃদ্ধ পিতা গত তিন দিন অনাহারে ছিলেন। তুমি জানতে? তোমার স্ত্রী জানত?
অনাহারে থাকাটা ওনার একটা বিলাসিতা। কৃচ্ছসাধন। হোয়্যার ইগনোরেন্স ইজ ব্লিস, দেয়ার ইট ইজ ফলি টু বি ওয়াইজ। মনে রেখো, তোমাদেরও দিন আসবে। সব, সব শোধ করে দিয়ে যেতে হবে।
কনক ওমলেট নিয়ে এল। বেশ একটা খিদেখিদে গন্ধ বেরোচ্ছে। প্রতাপ রায় হাত বাড়িয়ে প্লেটটা নিতে নিতে বললেন, উমার ভূমিকায় সুন্দর মানাবে। পরদায় একেবারে নিউ ফেস। ফেটে যাবে বুঝলে? একেবারে ফাটাফাটি হয়ে যাবে।
কনক অবাক হয়ে সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে আবার কী রে বাবা! প্রতাপ রায় নতুন এক চাল ছেড়েছেন। ভেতরে বেগ এসেছে। মনের চালে শৃগালের হাহাকার। কনক, কনক। কোন মানুষ যে কখন কীভাবে পাগল হয়ে যাবে, কেউ জানে না। নিজেরও জানা নেই। ঘোড়ার মতো নাক ঘেঁদা করে লাগাম পরিয়ে রাখতে পারলে ভাল হয়। চার পা তুলে কখন যে চি-হি-হি করে উঠবে
মাতুল বললেন, তোর চোখ আছে প্রতাপ। বাংলা স্ক্রিনে নতুন নায়িকার বড় অভাব। এইসময় বাজারে ছাড়তে পারলে একেবারে ক্যান্টার হয়ে যাবে।
পিতা বললেন, তোমাদের আলোচনা কোন পথে চলেছে? পরদাফরদা কী বলছ? সিনেমা নাকি?
ধরেছেন ঠিক।
মাতামহ অন্ধকার কোণে স্প্রিংয়ের মানুষের মতো মোড়া থেকে ছিটকে উঠলেন, তোমাকে আমি ত্যাজ্যপুস্তুর করব। তোমার বায়োস্কোপ করা আমি ঘুচিয়ে দোব। এই কাপ্তেনটি কে? হাতি-ছাড়া বিশ্বকর্মা! মুখ দেখলে মনে হয় রামবাগানের আড়কাঠি।
মাতামহ বাঘের মতো এগিয়ে এসেছেন। পাঁপড়ের তেলহাত মাথার চুলে বুলিয়েছেন। আলো পড়ে পাকা চুল জরির মতো চিকচিক করছে। মেসোমশাই মুকুকে চড়া গলায় দর্শন বোঝাচ্ছেন, যদি ভূতমাত্রের হিতসাধন ধর্ম হয়, তবে একজনের হিতসাধন ধর্ম আবার একজনের হিতসাধন অপেক্ষা দশজনের তুল্য হিতসাধন অবশ্য দশগুণ ধর্ম। গুড অফ দি গ্রেটেস্ট নাম্বার। বাপস, বাংলা বটে। মুকু পরীক্ষার আগেই শুকিয়ে মরে যাবে। এরই মধ্যে কেমন যেন বাসি ফুলের মতো চেহারা হয়ে গেছে। মাঝরাতে ঘুমের ঘোরে ‘মিল’, ‘মিল’, ‘বেনথাম’, ‘বেনথাম’ বলে কেত পাড়ে।
