এ যে শাড়ি! সকালে কনকের শরীরে পেঁচিয়ে ছিল। এ যে ব্লাউজ! এখনও শরীরের ঘ্রাণ লেগে আছে। এ যে সেই, যা আরও তলায় থাকে। হে জগদম্বে! ভেতরে ভিসুভিয়াস ভসর ভর করছে।
মাতামহ ওপরে উঠে এসেছেন। পেছন থেকে বললেন, কী হে, আবার সেই সমাধি নাকি?
আজ্ঞে না।
তা হলে এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছ কেন? ওই তো পায়রার মতো বুক! নীলমণি হলে কে দেখবে!
পাপীর মন। কী যেন একটা চাপা দিতে চাইছে। আলিঙ্গনাবস্থায় গুরুজনের কাছে ধরা পড়ে গেছি নাকি? চোরের মন, সবসময় বোঁচকার দিকে। ঝড়ের ঝাঁপটা চলছে রান্নাঘরের দিকে তেড়ে। একহাতে মাথা আর মুখ আড়াল করে দেয়ালে কাধ ঘেঁষে ঘেঁষে কনক এদিকে এসে বললে, দাও। তুমি ঘরে ঢুকে গেলে না কেন?
মাতামহ সাধক মানুষ। মনে সবসময় সুবাতাস বইছে। আমার মতো কুবাতাসে পাড়ি দিয়ে হাবুডুবু খেয়ে মরেন না। গ্রাহ্যই করলেন না কী ঘটে গেল অন্তঃপুরে। একগাল হেসে বললেন, কিস্যু নেই। ব্যাটা শুকনো হয়ে শুয়ে আছে।
ঢুকে পড়ুন ঢুকে পড়ুন, বলতে বলতে ঝড়ের ঝাঁপটার সঙ্গে কনক আমাদের নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। বারান্দায় চটাপট চটাপট বৃষ্টি পড়ছে। টিনের চালে টুং-টাং শব্দ হচ্ছে। মনে হয় শিল পড়ছে। মাতামহ বললেন, অকৃতজ্ঞ দুনিয়া, শোবে এক জায়গায় দুধ দেবে আর এক জায়গায়।
কাপড় কোঁচাতে কেঁচাতে কনক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে, সে আবার কী?
ওই যে গোরুটা। নীচে শুয়ে আছে। দুধটুকু দিয়ে এসেছে মালিককে।
থাকলে কী করতেন?
একবার চেষ্টা করে দেখতুম।
পটাং পটাং করে শিল পড়ছে। ন্যাপথলিনের বলের মতো বারান্দার মেঝেতে লাফালাফি করছে। শিল পড়ছে শিল। আধ-কোচানো কাপড় মেঝেতে ফেলে রেখে কনক ছুটল। দু’জনে নিচু হয়ে হয়ে শিল কুড়োচ্ছি আর মুখে পুরছি। বৃষ্টির ছাট এসে গায়ে লাগছে। এক-একটা শিল পড়ে পিংপং বলের মতো লাফিয়ে উঠছে। ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
এই যে এই একটা। এই আর একটা। এটা কত বড়! তুমি নাও, তুমি নাও।
বয়েস, পরিবেশ ভুলে, দু’জনে ভীষণ ব্যস্ত। পেছনে পেছন ঠেকে যাচ্ছে। মাথায় মাথা ঠুকে যাচ্ছে। বাতাসের আর্দ্রতায় কনকের সুন্দর মুখ আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। টাটকা-ফোঁটা ভিজে গন্ধরাজের মতো। এবার কিন্তু সত্যিই আমি ভালবেসে ফেলব। তারপর যা থাকে বরাতে। কিন্তু ওই সাধিকা যে বলে গেলেন, কখনও কাউকে ভালবাসার চেষ্টা কোরো না, কাউকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা কোরো না। সে চেষ্টা তো আমি একবারও করিনি মা। আমার মতো বোকচৈতন পৃথিবীর তাবৎ প্রাণীকেই তো ভালবেসে বেকুব হতে পারে। তাতে কার কী যায় আসে! মূর্খরা ভালবেসে মরে। চালাকে কাজ গুছোয়।
মেসোমশাই এতক্ষণ ভেতরের ঘরে মুকুকে নিয়ে বোধহয় ব্যস্ত ছিলেন। কখন পেছনের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন আমরা কেউই লক্ষ করিনি। বেশ রাগরাগ গলায় বললেন, কনক, তুমি কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি করে ফেলছ। একেই তোমার সেপটিক টনসিল, হঠাৎ ঠান্ডা লেগে গেলে তোমার আর কী বলল, বিপদে পড়ব আমি।
কনক উঠে দাঁড়াল। বারান্দার আলোটা মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে। ঝোড়ো বাতাসে তার দুলে উঠলে আলো কাপে। নিবেও যেতে পারে। কনকের ধারালো চোখে কেমন যেন একটা ছায়া নেমে এল। আমি জানি অভিমান কাকে বলে। মন কীভাবে টসটসে হয়ে ওঠে। দরজা খুলে মানুষ কীভাবে জগতের বাইরে ছিটকে চলে যায়। আমার পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে কনক ভেতরে চলে গেল। পেছনের দিকে গোড়ালির কাছে লেসের কাজ করা সায়ার অংশ ভিজে গেছে। সে যুগের ঋষিরা কত সাধারণ কথা কেমন অসাধারণ করে যুগের এপারে ওভার বাউন্ডারি করে দিয়ে চলে গেছেন। প্রথম বয়সে মেয়েরা পিতার সম্পত্তি, তারপরই স্বামীর। মেসোমশাই মানুষটি তেমন সহজ সরল নন। অহংকারের পুরিয়া।
মাতামহ চেয়ারে চুপ করে বসে আছেন। ইচ্ছে থাকলেও নিজের ডেরায় ফিরে যাবার উপায় নেই। বেশ ঝেপে বৃষ্টি এসেছে। মেসোমশাই আবার ভেতরের ঘরে চলে গেছেন। মুকুকে পড়াতে। বসেছেন। মেয়েকে প্রেমাদ রায়চাঁদ করে ছাড়বেন। কনক বকুনির ধাক্কা সামলে উঠেছে। আমার। মতো ওর ঠোঁট বেশিক্ষণ ফুলে থাকে না। সহজেই সামলে নিতে পারে। মেয়েদের তা না হলে তো চলবে না। প্রথম জীবনে পিতাকে সামলাও, শেষ আর মধ্যজীবনে স্বামীকে খেলাও। মাছ ধরার মতো। সুতো ছাড়ো আর সুতো টানো। আমার আর কতটুকু জ্ঞান। চার পাশে যা দেখছি আর কী! মেয়েছেলে যদি খেলোয়াড় না হয় তার অশেষ দুর্গতি। ওই জবা, জবার মা, মা কি না সঠিক বলতে পারব না, জবার মাসি, মাসিই হবে, দু’জনকে প্রায় একই রকম দেখতে, ওদের মতো হলে সুখের শেষ নেই। সুখেন সব জানে। নিজেও মাঝে মাঝে দেখি তো। এই তো সেদিন! দুপুরবেলা বাড়িতে বোধহয় দুই মাতব্বরের কেউই ছিল না, যে ছেলেটাকে ওরা পিসতুতো ভাই বলে এতকাল চালিয়ে আসছে, সেই ষণ্ডামার্কাটা জবাকে পাঁজাকোলা করে বারান্দায় গোল হয়ে ঘুরছিল। কী খেলা কে জানে? সে জিনিস সিনেমা ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না। দুপুরবেলা সব কাজ ফেলে এক মদ্দা সোমত্ত মেয়েকে কোলে নিয়ে বৃত্তাকারে ঘুরে মরছে। নাও বোঝে ঠ্যালা। কে বাবা সেই উপদেশ মনে রাখছে, ওরে দাগ রেখে যা, দাগ রেখে যা। উলটো বুঝলি রাম! তাবৎ মানুষ চরিত্র দাগবাজ করে পস্তে মরছে। মেসোমশাই কি আর সাধে গোঁফ পাকিয়ে তেড়ে এসেছিলেন! কনক হয়তো আমাকে গ্রাহ্যই করে না। কিন্তু আমার চালচলন তো দেখতে হবে। ফোঁস করে ছোবল মেরে দিলে কে সামলাবে। মানুষ তো আর ঢোঁড়া সাপ নয়। খড়ম মার্কা কেউটে। মেয়ে আমার নীলবর্ণ হয়ে যাবে। ভালবাসার ছোবল আর বাঘের কামড় কোনওটাই কম যায় না। আঠারো ঘা।
