অ্যায়? ওই জন্যেই অবিশ্বাসীদের কিছু বলতে নেই। কাঠিয়াবাবার নাম শুনেছেন?
আজ্ঞে না। গাঠিয়ার নাম শুনেছি। গুজরাটিরা আদাকুচি দিয়ে খায়।
তিনি ছিলেন যোগী, তান্ত্রিক। ছ’ফুট লম্বা। কাঠির মতো চেহারা। আসনে বসে হাত বাড়িয়ে গাছ থেকে নেবু পেড়ে আনতেন।
এই উদীয়মান মহাপুরুষেরও কি সেইরকম কোনও শক্তি আছে?
থাকলেও দেখায় না। হরি ওম তৎসৎ।
আমি আর আড় হয়ে শ্যাওলা গঙ্গামাটি মাখামাখি ঘাটে শুয়ে থাকতে পারছিলুম না। মশায় সর্ব শরীর ছিঁড়ে দিচ্ছে। ঘোর কেটে গেছে। পুরো ব্যাপারটাকেই এখন স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে। ওম তৎসৎ বলামাত্রই তড়াক করে দাঁড়িয়ে পড়লুম। ভদ্রলোক ওরে ব্বাবারে বলে তিরবেগে দৌড়োলেন। মহাপুরুষের ভয়ে মানুষ এমন তিরবেগে দৌড়োতে পারেন, জানা ছিল না। যেন বাঘ দেখেছেন।
মাতামহ বললেন, যাঃ সব মাটি করে দিলি। দু’গেলাস খাঁটি গোরুর দুধ হাতছাড়া হয়ে গেল। সবে দোয়া হয়েছে। এখনও গরম। ফ্যানা উঠছে।
এইভাবে ধাপ্পা মেরে দুধ খাবেন! এক গেলাস দুধ তো আপনি বাড়িতেই পেতে পারেন। চলুন। খাইয়ে দেব।
আরে ধুস, সে দুধ আর এ দুধ! পকেটে আফিমের গুলি৷ টুক করে মুখে ফেলে, এক গেলাস ফ্যানাফ্যানা দুধ চোঁচোঁ মেরে দাও। যত রাত বাড়ছে তত মৌতাত বাড়ছে। অন্যায়টা কী হত! সত্যিই তো তোর সমাধি হয়েছিল। আমি লক্ষণ মিলিয়েই বলছি। সমাধির তুই কী বুঝিস?
সমাধি না হাতি। ভবিষ্যতের ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলুম। সতীমা যা বলে গেলেন, তাই যদি সত্যি হয়?
ধর্মের লাইনে অনেক বুজরুকি আছে। সহজে ওসব বিশ্বাস করিসনি। তোকে বিভূতি দেখিয়ে গেলেন। যাঁরা কথায় কথায় বিভূতি দেখান, তারা হলেন প্রথম স্তরের সাধু।
কীসে কী, সে পরে ভাবা যাবে, বাড়ি গিয়ে কী বলবেন তাই ভাবুন। কাল সকালেই তো ধুনুরি আসবে।
মাতামহ দুর্ভাবনায় আবার উবু হয়ে বসে পড়লেন। ঘুসুরি থেকে আমাদের তুলে আনার কথা। কাল সকালেই পিতার প্রিয় ধুনুরি গফুর মিঞা আসবে। তোশক তৈরি হবে। তিন অতিথির শুতে ভীষণ অসুবিধে হচ্ছে। তুলো এল না। মিঞা সায়েবকে ফিরে যেতে হবে। যেদিন যা হবার কথা, সেদিন তা না হলে পিতৃদেব তুলোধোনা করে ছেড়ে দেবেন। নদী তরতর করে বেশ চলছে, বাধা। পেলেই উদ্দাম, ক্ষিপ্ত।
মাতামহ বললেন, কী আছে, সত্যি কথাই বলব। এমন ঘটনা তো সহজে ঘটে না।
উনি বিশ্বাস করবেন না।
ওর বাপ করবে।
হ্যাঁ, তখন বুঝবেন ঠ্যালা। ঈশ্বর সিদ্ধে প্রমাণাভাবাৎ বলে যখন ঠেসে ধরবেন তখন আমার পিতামহ অয়েল পেন্টিংয়ে যেমন বসে আছেন তেমনি বসে থাকবেন। বাঁচাতে আসবেন না।
তা হলে আমি পালাই। তোমার বাবাকে তুমিই সামলাও। আমার তো জামাই।
তা তো বটেই। একে বলে সুবিধেবাদী। আমাকে বাঘের মুখে ঠেলে দিয়ে নিজে গিয়ে বসবেন বেটির কাছে।
তা যা বলেছিস! মাতামহ উঠে দাঁড়ালেন। ওই সাধিকার মতো শক্তি থাকলে আকাশে হাত বাড়িয়ে মেঘ থেকে পাঁজা তুলো ধরে আনতুম। বৃথাই সাধনা। রাতটা ভাগাভাগি করে বকুনি খেয়ে কাটিয়ে দেওয়া যাক।
আকাশের উত্তর-পশ্চিম কোণ বারকতক চমকে উঠল। এক চাকলা মেঘ জমেছে। লক্ষণ ভাল না। বেশি রাতে বৃষ্টি নামতে পারে। মাইলখানেক হাঁটতে হবে। একটা দোকানে গরম শিঙাড়া ভাজছে। সেদিকে তাকিয়ে মাতামহ বললেন, তুলোর পয়সার কিছু সদ্ব্যবহার করে গেলে হয়! কীরকম হাবুডুবু খাচ্ছে দেখেছিস। একেবারে গরম গরম। এক এক কামড়ে হা হা করতে হবে। তোর বেশ দুর্বল দুর্বল লাগছে না? একটু চা না খেলে এতটা হাঁটতে পারবি?
বৃদ্ধর খুব লোভ হয়েছে। তুলোর পয়সা এদিক-ওদিক করা আর ব্যাঙ্কের ক্যাশ ভাঙা একই অপরাধ। বুকপকেটে নিজস্ব একটি টাকা মজুত আছে। মায়া সিনেমা দেখতে চেয়েছিল। অন্ধকার ঘরে দু’জনে পাশাপাশি বসে চিনেবাদাম চিবোতে চিবোতে নদের নিমাই দেখব। কতদিনের পরিকল্পনা আমাদের। সেই টাকাতেই এখন শিঙাড়া হোক।
শিঙাড়া আর চা খেতে খেতেই আকাশ বেশ ঘোর হয়ে এল। যে ক’টা তারা চোখ মেলেছিল তাদের চোখ বুজে এল। পা চালা পা চালা বলে মাতামহ দৈত্যের মতো হাঁটতে শুরু করলেন। বৃদ্ধ হলেও তিনি আমার চেয়ে যুবক। পেছন পেছন আমি চলেছি নেচে নেচে।
বাড়ির সদরে পা রাখতেই দমকা হাওয়া শুরু হল। ভৈরব আসছে তেড়ে। দোর ভাঙার শব্দ হচ্ছে। দুই বোনে মনে হয় খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। জানলা দরজা একটা-আধটা নয় তো! উত্তর থেকে দক্ষিণে ঘুরে আসতে আসতেই একটা-না-একটা দিক ভেসে যাবেই। সদর খোলা ছিল। গলিতে কাদের একটা ছাড়া-গোর ঢুকে বসে আছে। ভোস ভেঁস করে জাবর কাটছে।
প্রথমেই কনকের সঙ্গে দেখা হল। একগাদা শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ বুকের কাছে ধরে ঘরে ঢুকছে। আমি আগেই উঠে এসেছি ওপরে। মাতামহ এখনও নীচে। গোরুর বাঁট পরীক্ষা করছেন। যে-দুধ ছেড়ে এসেছেন ওঁর ধারণা সেই দুধ বাড়ি বয়ে এসেছে। সাধিকার সঙ্গ বিফলে যাবার নয়। এখন থেকে অলৌকিক ব্যাপারস্যাপার ঘটতেই থাকবে।
কনক হাসিমুখে বললে, যাক বাবা, এসে গেছ। আকাশ যা হয়েছে। ভেঙে পড়ল বলে।
হুস করে প্রবল একটা হাওয়া এল। রান্নাঘরের সামনের বারান্দা থেকে কয়লা তোলার খালি গামলাটা গড়াতে গড়াতে উনুনের দিকে চলে গেল।
ধরো ধরো, বলে কনক কাপড়জামার বোঝা ধরিয়ে দিয়ে দুদ্দাড় করে রান্নাঘরের দিকে দৌড়োল। গেল গেল সব গেল। কী গেল কে জানে? হয়তো কিছু নামিয়ে এসেছিল। রান্নার এখন খুব তরিবাদি চলছে তো! মরাগাঙে বান এসেছে। আমি এদিকে লক্ষ্মণ ফল ধরে হাঁদার মতো দাঁড়িয়ে থাকি। প্রকৃতিতে প্রলয় নাচন, মনেও তাই। এ তুমি কী ধরালে প্রভু! বড় গরম লাগছে। গরম কী রে গাধা! ধুর, বৃষ্টির শীতল বাতাস ভলকে ভলকে বয়ে আসছে। এক এক ঝাঁপটায় পেয়ারাগাছের ডাল ঝড়াস ঝড়াস করে বারান্দার টিনের চালে আছড়ে পড়ছে।
