মা মহাদেবের বুকে দাঁড়ানো জগদম্বার মতো দৃপ্ত ভঙ্গিতে বললেন, কৃপা কি ভিক্ষে করে পাওয়া যায় বাবা? এ কি ছেলের হাতে মোয়া যে তুমি খাবে ভোগা দিয়ে! আধার প্রস্তুত কর। যন্ত্রটাকে বেঁধে নে তবে তো সুরে বাজবে।
সিঁড়ির দু’ধাপ নীচে আমি উদোবন্ধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। প্যাচালো মন। সহজে যেন বিশ্বাস আসতে চায় না। নাস্তিকের রক্ত শরীরে বইছে। আমার ঘোড়ার মতো মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি ডাকলেন, এদিকে উঠে আয়। তোকে কানে কানে দুটো কথা বলে যাই।
নিশ্বাসে গোলাপের গন্ধ। কানে কোঁদল ফিট করে তপ্ত সিসের মতো গুটিকতক কথা তিনি ঢেলে দিলেন, তুই কখনও কাউকে ভালবাসার চেষ্টা করবি না, তা হলে তার মৃত্যু হবে। কিছু আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করবি না, সে পালিয়ে যাবে। সুখে থাকার চেষ্টা করলে অসুখে পড়বি। নিজেকে খুব কষ্টে রাখবি তা হলেই তোর সুখ হবে। তুই হলি শনি। নীলাঞ্জন-সমাভাসং রবিপুত্রং যমাগ্রজম। ছায়ায়া গর্ভসস্তৃতং তং নমামি শনৈশ্চরম ॥ ওই তোর পথ, ওই দেখ। ধুধু প্রান্তর। ধুলো উড়ছে। সাদা উত্তরীয় উড়িয়ে তুই চলেছিস, চলেছিস, ছায়া নেই, মায়া নেই, কায়া নেই, মমতা নেই, কনককান্তি নেই।
কী হল কে জানে? চোখের সামনে যেন মরীচিকা দেখছি। নদী অদৃশ্য। জনপদ লুপ্ত। সব যেন ভোজবাজি হয়ে গেল। সত্যিই ধুলো-ওড়া, রোদ-জ্বলা প্রান্তর। দূরে বহু দূরে আমি আমাকে ছেড়ে দাঁড়িয়ে আছি। ভীষণ ভয়ে আমার চিৎকার, এ তুমি কী করে দিলে? উত্তর এল দূর থেকে, ভয় পাসনি খোকা, আবার দেখা হবে, আবার, আবার।
১.১১ কেয়া হুয়া, গোদ হুয়া
হিস্টিরিয়া, হিস্টিরিয়া, নাকের সামনে জুতোটা ধরুন। হ্যাঁ হ্যাঁ জুতোর গন্ধেই জ্ঞান আসবে। আমার মাসিমার মূৰ্ছা রোগ আছে। যেই ভিরমি যায় মেসো অমনি নাকের কাছে কঁচা চামড়ার জুতো ধরেন। ব্লটিং পেপারে শুকনো লঙ্কা গোল করে পাকিয়ে আগুন ধরিয়ে সিগারেটের মতো ধরতে পারলে আরও তাড়াতাড়ি কাজ হত।
আচ্ছন্ন ভাব কেটে আসছে। যে-কল্পজগতে সহসা ঢলে গিয়েছিলুম সেই জগৎ থেকে ধীরে ধীরে ফিরে আসছি। সেই ঘাট, সেই নদী, সেই ঢেউ, সেই শব্দ। আকাশের রংটাই যা কেবল পালটে গেছে। অন্ধকারের আয়োজন চলেছে। একটি-দুটি তারা ইতিউতি চোখ খুলব কি খুলব না করছে। কে একজন গলাজলে দাঁড়িয়ে অস্ত-আকাশের দিকে মুখ করে স্থির হয়ে আছে।
মাতামহ বলছেন, কেন হিস্টিরিয়া হিস্টিরিয়া করছেন। এ অন্য ব্যাপার।
আমার কানের কাছে মুখ এনে বলতে শুরু করলেন, হরি ওম তৎসৎ, হরি ওম তৎসৎ।
এতক্ষণে নিজের অবস্থা টের পেলুম। শ্যাওলা-ধরা ঘাটের পইঠেতে থেবড়ে বসে আছি। পাশে মাতামহ। তার বুকের ওপর আমার মাথা। তিনি দু’হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছেন। পিটপিট করে তাকালে সামনে ঝুঁকে থাকা এক ভদ্রলোককে দেখতে পাচ্ছি। হাঁটুর ওপর দুটো হাত। পেছন দিকটা তোলা উনুনের মতো ঠেলে আছে। দু’ভাগ করে আঁচড়ানো চুল। চোখে রিমলেস চশমা। গায়ে গিলে করা পাঞ্জাবি। এতক্ষণ তিনিই জুতো শোকাবার পরামর্শ দিচ্ছিলেন। ভদ্রলোক সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, অন্য ব্যাপার মানে? গাঁজা নাকি?
আরে না মশাই। গাঁজা হবে কেন?
তা হলে? অন্য ব্যাপার মানেটা কী?
মাতামহ রেগে গিয়ে বললেন, আচ্ছা নেইআঁকুড়ে দাদা তো? অন্য ব্যাপার, মানে অন্য ব্যাপার।
ও, ভাল করতে গেলে মন্দ হয়। বিপদে পড়েছেন দেখে ওপর থেকে নীচে নেমে এলুম, এখন মেজাজ দেখানো হচ্ছে? এক্ষুনি ভাবছিলুম একটা চামচে এনে দাঁতি লাগা ছাড়াবার ব্যবস্থা করব। এক গেলাস খাঁটি গোরুর দুধ খাওয়াব, এইমাত্র দোয়া হল। ঠিক আছে, আমার কী? নিজের ম্যাও নিজেই সামলান।
দুধের নামে মাতামহ নরম হয়ে গেলেন। বললেন, ও আপনি বুঝি এই বাড়িতেই থাকেন?
হ্যাঁ, এই ঘাটও আমাদের। পশ্চিমে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছিলুম, দেখলুম ছেলেটা মাথা ঘুরে পড়ে গেল। থাকতে পারলুম না নেমে এলুম। পরোপকারে আমার পিতৃদেব দেউলে হয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। তস্যাঁতস্য পিতা উমেদারের জ্বালায় খুন করে জেলে। যাবজ্জীবন কাটিয়েছিলেন। সেই রক্তের ধারাই তো আমার শরীরে বইছে।
মাতামহ ঘাটের ওপর ঠেলে ওঠা তিনতলা বাড়ির দিকে ঘাড় তুলে তাকালেন। আমিও পিটপিট করে একপলক তাকিয়ে নিলুম। ভাঙাভাঙা হলেও বিশাল বাড়ি। একটা পাশ প্রায় ধসে পড়েছে। বটের ঝুরি নেমেছে। একসময় সাদা রং ছিল। এখানে-ওখানে ছাপকা ছাপকা সেই স্মৃতিচিহ্ন মরা হাতি লাখটাকার কথা ঘোষণা করছে। মাতামহ বললেন, মনে কিছু করবেন না, বয়েসে মেজাজ তিরিক্ষি। কী হয়েছে তা হলে বলি, এ হল ঈশ্বরাবেশ।
আমি ফিসফিস করে বললুম, দাদু।
কানে মোচড় দিয়ে তানপুরার তার নামানোর মতো আমার কণ্ঠ নামিয়ে দিলেন। বোঝাতে চাইলেন, চুপ, লোকটাকে একটু খেলাই।
ভদ্রলোক বললেন, ঈশ্বরাবেশ মানে?
আমার এই নাতিটি ক্ষণজন্মা পুরুষ। মাঝে মাঝেই সমাধিস্থ হয়ে যায়। ঈশ্বরানুভূতিতে শরীর স্থির। দেহ এ জগতে চেতনা অন্য জগতে। তখন দর্শনটর্শন হয়। একথা তো সকলকে বলা যায় না!
অ্যাঁ, তাই নাকি? বলেন কী? সমাধি তো মশাই ঠাকুর রামকৃষ্ণের হত। তিনি কি আবার ফিরে এলেন নাকি? গীতা অবশ্য বলেছেন, যদা যদা হি ধর্মস্য; কিন্তু এঁর চেহারায় তো তেমন চেকনাই নেই। গেঁজেল দুধ না পেলে যেমন হয় অনেকটা সেইরকম। কী জানি বাবা!
