মাতামহ বললেন, একী? এ তো দেখছি উর্দু! তুমি উর্দু শিখলে কোথা থেকে?
হঠাৎ নৌকো চরকিপাক খেয়ে গেল, মোচার ভোলার মতো। মাঝিদের হইহই, পালের দড়ি ছিঁড়ে গেছে, সামাল সামাল। সামনের দিকে যাঁরা বসে ছিলেন তারা চিৎকার জুড়লেন, গেল গেল। নৌকোর দুলুনি দেখে প্রথম থেকেই আমার আত্মা খাঁচাছাড়া হচ্ছিল। সাধিকা মাথায় হাত রেখে চেপে ধরেছিলেন। এখন মনে হল জলে ডুবে মরার আগে একবার বাথরুমে যেতে পারলে ভাল হয়। খোলসা হয়ে মরার আর এক আনন্দ। মাতামহ তারা তারা বলে চিৎকার শুরু করলেন। দড়ি-ছেঁড়া পাল ছিটকে বেরিয়ে গেছে। নাগালের বাইরে পতপত করে উড়ছে। মাঝে মাঝে হ্যাঁচকা। টান মেরে যাত্রীসমেত নৌকো উলটে দেবার চেষ্টা করছে। হালমাঝি যেন লড়াই করছে। হাত আর পা দুটোই চলছে। এত ভয়েও সে দৃশ্য দেখে মনে হল, একেই বলে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জার লড়াই। মাতামহ এরই মাঝে ফিসফিস করে বললেন, পইতে থেকে সিন্দুকের চাবিটা খুলে নে। নামতে নামতে একেবারে নীচে নামবি, দেখবি একটা ছোট্ট বালিশ। বালিশটা তোর। বাকি সব ফেলে দিবি।
ডুবলে, আমরা দু’জনেই তো ডুবব। চাবি নিয়ে করবটা কী?
তুই তো সাঁতার জানিস।
সে সাঁতারে এ নদী সাঁতরানো যাবে না।
সাধিকার কিন্তু কোনও ভাবান্তর নেই। মুখ দেখলে মনে হবে বেশ মজা পাচ্ছেন। বিষ্ণুও বসে আছে গাট হয়ে। নিমীলিত চোখে আমার দিকে তাকালেন। ঠিক মনে হল পেতলের চোখ। সে দৃষ্টি একমাত্র স্বপ্নেই হয়তো দেখা যায়। আমাকে বললেন, তোকে দুটো জিনিস শিখিয়ে দিই।
এখন শেখাবেন? সে শিক্ষা কি আর কাজে লাগানো যাবে? একমাত্র সাঁতার ছাড়া আর কোনও শিক্ষাই এখন কাজে লাগবে না।
কথার ফাঁকেই নৌকো আর একবার বাঁই করে ঘুরে গেল। যাঁরা আরও বেশিদিন বাঁচতে চান তারা সেই ঘূর্ণায়মান পদ্মপত্রে বসে পতনোম্মুখ জলবিন্দুর মতো হায় হায় করে উঠলেন। মাঝিরা পালের দড়িটাকে ধরবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। ভূত না হলে অত বড় হাত পাবে কোথায়? সাধিকা ছেলেমানুষের মতো বলে উঠলেন, বাঃ, বেশ মজা তো! নাগরদোলায় চেপেছি রে বিষ্ণু।
দেরিতে হলেও বিষ্ণু এবার ভয় পেয়েছে। সে বলল, মা, তুমি একটা কিছু করো।
আমি কী করব? আমি কি ভগবান? তোরা বড় চিৎকার করছিস। মরবি তো মানুষের মতো মর। এমন করছিস যেন ঘোড়ার আস্তাবলে আগুন লেগেছে। বড়ছেলে?
মাতামহ ফ্যাকাসে মুখে শুকনো গলায় বললেন, বলো মা।
দড়িটাকে চেপে ধরো না বাবা।
আমি কি পারব মা? আমার যে বয়েস হয়েছে।
তা হলে হাওয়া কমুক। এমন ঝোড়ো বাতাস এল কোথা থেকে! তোমরা একটু স্থির হও, মনে স্থির, দেহে স্থির। সেই পেতলের চোখদুটি অর্ধনিমীলিত হয়ে রইল কিছুক্ষণ। হালের মাঝি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আর পারছে না যেন সামাল দিতে। হঠাৎ বাতাস পড়ে গেল। নদীর জল সম্পূর্ণ স্থির। বহু টাকা উড়িয়ে বড়বাবুর দাপট যেমন কমে আসে, পালের ফটফটানিও সহসা থেমে গিয়ে নেতিয়ে পড়ল। ঘরের ছেলে ঘরে এসো বাবা। মাঝিরা দড়িটা আবার যথাস্থানে বেঁধে দিল। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার সতীমাইকি জয়।
নৌকোর মুখ কিন্তু ঘুরে গেছে। যে-পার থেকে ছেড়েছে সেই পারের দিকেই মুখ। সতীমা চোখ খুললেন। হাসিহাসি মুখে তাকিয়েছিলুম। তিনি উদাস কণ্ঠে বললেন, বিষ্ণু, ছেলেটা মারা গেল বাবা।
সেকী মা? এই তো দেখে এলে, হাসছে, দুধ খাচ্ছে।
নাঃ, বাতাস বড় জোরে বইছিল। প্রদীপ নিবে গেল। মাঝি, তোরা বাবা নৌকোর মুখ আর যোরাসনি। আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে চল।
মাতামহ জিজ্ঞেস করলেন, কে মারা গেল মা?
আমার এক ভক্তের ছেলে। এই নিয়ে তিনটি গেল। সবাই কি আর মা হতে পারে? হয় ছেলে মরে, নয়তো মা মরে। আমি কী করব? তোমরা সব পাপ করবে, পাপের বোঝা নিয়ে আসবে। ফল ভুগতে হবে না!
তোমার কে মা বুঝবে লীলে। তুমি কী নিলে কী ফিরিয়ে দিলে ।
নৌকো কোনাকুনি পাড়ি মেরে যে-ঘাটে ভিড়ল, সেটা পারঘাটা নয়। চৈতন্যঘাট। ইতিহাসের কোনও এক কালে এই ঘাটে শ্রীচৈতন্য নৌকো থেকে নেমেছিলেন। সময় সময়ের নদী দিয়ে বয়ে চলেছে। ঘাট পড়ে আছে আধভাঙা হয়ে জলধারার পাশে। ক্ষয়া ক্ষয়া পাথরে কালচে সবুজ শ্যাওলার পুরু আস্তরণ।
বিষ্ণু আগে নামল। বিষ্ণুর কাঁধে ভর রেখে তিনি সাবধানে নামলেন। ঘাট বেশ পিছল। মাতামহও নেশাগ্রস্তের মতো পেছন পেছন চলেছেন। মন পড়ে আছে সাধিকার দিকে। নৌকোর দুলুনিতে তাই বোধহয় টালমাটাল হচ্ছেন না। আমাকেও নামতে হল। কী যে হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না। কোথায় চলেছি, কেন চলেছি জানি না। পিছলে পা হড়কাচ্ছে। পড়ে না যাই।
প্রভু যেমন পেছনে ন্যাজ নাড়তে নাড়তে আসা কুকুরের দিকে ‘কী রে কেন আসছিস’ দৃষ্টিতে তাকান, সেইভাবে তিনি আমাদের দিকে তাকালেন। হাতে বিস্কুট নেই, তবু সেই ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বললেন, কী রে কোথায় চললি তোরা?
মা, একটু কৃপা। একটু কৃপা দিয়ে যাও মা। মাতামহ জমিদারের পেছনে হাতকচলানো নায়েবের মতো সামনে কুঁজো হয়ে সিঁড়ি ভাঙছেন। মাঝে মাঝে পিছলে যাবার মতো হচ্ছেন। কৃপাটুপার কথা আমার কিছু মনে হচ্ছে না। আমি কেবল ভাবছি বাতাস উঠল কেন? বাতাস পড়ল কেন? এ কি শক্তি? না কোনও স্বাভাবিক ঘটনা। কে মরল! সে খবরও কি বাতাসে ভেসে এল! নৌকো তীর ছেড়ে চলে গেল।
