তারপর সেই ষাঁড়ের লড়াই?
হ্যাঁ, ষাঁড়ে ষাঁড়ে লড়াই। বিশ্বনাথের গলি, একটা গাভী, দুটো ষাঁড়।
নিজেকে ষাঁড় বলুন ক্ষতি নেই, দিদিমাকে গাভী বলাটা উচিত হচ্ছে?
তুই তো তার ভুড়ি দেখিসনি। দেখলে তুইও তাই বলতিস। আমি আদর করে নাম রেখেছিলুম ভগবতী। ঘর অন্ধকার করে যখন ঘুমোত, দুর থেকে নিশ্বাসের শব্দ শুনলে মনে হত, মাঝরাতে গোয়ালে এসেছি। যা যা শালা, নিজের বউকে আমি যা খুশি বলতে পারি। তোর বউকে তো বলিনি!
সকালে বাবা আপনাকে যে সারমন দিলেন ভুলে গেলেন। এই এত কথা বলছেন? অভ্যাসটা থেকে যাবে, রাতে বকুনি খাবেন।
রাতে তোর বাপের চ্যাটাং চ্যাটাং কথা শুনতে যাচ্ছে কে? নিজের মসনদে গিয়ে একগুলি আফিং খেয়ে বেটির পায়ের তলায় পেছন উলটে পড়ব।
কনক যখন জিজ্ঞেস করল, রাতে কী খাবেন? তখন লম্বা এক ফিরিস্তি ছাড়লেন কেন?
তুই বুঝিস না কেন? এক বেলা খেতেই আমার লজ্জা করে। জামাই আমার বলেছে বলে দু’বেলাই খেতে হবে। আমি কি তোর তেমন হ্যাংলা দাদু?
কনক রাগ করবে।
রাগ করবে কেন?
বাঃ, রান্না নষ্ট হবে না?
তাও তো ঠিক। নাতবউকে তো রাগানো চলবে না।
কেন বউ বউ করছেন? ব্যারিস্টারের মেয়ে। সকালে ফট করে যখন বললেন মেসোমশাইয়ের মুখটা কীরকম গামলার মতো হয়েছিল, দেখেছিলেন?
রাখ তোর ব্যারিস্টার। এমন সোনারাদ ছেলে পাবে কোথায়?
দু’আঙুলে আমার গাল টিপে দিলেন। নৌকো দুলে উঠল। টকটকে লাল পাড় শাড়ি পড়া এক বর্ষীয়ান মহিলা নৌকোয় ডান পা রেখে সঙ্গের ছেলেটিকে বলছেন, বিষ্ণু, আমাকে ঠেলে তোল। দেখিস যেন দেবে যাসনি।
বিষ্ণু বললে, মা জননী, তুমিও একটু চেষ্টা করো।
আমি কি আর চেষ্টা করছি না বাবা, এ তো আর সানবাঁধানো পইঠে নয়, নৌকো যে ভর সইতে পারছে না। বিষ্ণু ঠেলছে আর বলছে, হেঁইও মারি হেঁইও, আউর ঘোড়া হেঁইও, বয়লট ফাটে হেঁইও।
মাতামহ উঠে দাঁড়ালেন। পালের খোঁটা ধরে টাল সামলে, সামনে এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন, আসুন মা, আমার হাত ধরে উঠুন।
শাঁখা পরা, গোল, টকটকে একটা হাত দাদুর হাতে ধরাতে ধরাতে সেই মা বললেন, বিষ্ণু, আর ভাবনা নেই, আমার বড়ছেলে এসে গেছে।
কপালে এতখানি গোল সিঁদুরের টিপ পড়ন্ত বেলার সুর্যের মতো টকটক করছে। গলায় গোটা গোটা রুদ্রাক্ষের মালা। এক এক আঙুলে ঝিলিক মারছে এক এক রকম পাথরের আংটি। দিদিমা বেঁচে থাকলে মনে হয় এইরকমই দেখতে হতেন। চোখদুটো ভারী অদ্ভুত। নীলার মতো। যার দিকেই তাকাচ্ছেন দৃষ্টি যেন তাকে ছুঁড়ে চলে যাচ্ছে। সামলেসুমলে বসতে হয়। অস্বস্তি হয়। মনে হয় উলঙ্গ হয়ে যাচ্ছি।
মহিলা পালের খোটা ধরে দাঁড়াতেই মাতামহ হাঁসের মতো পেছন উলটে পায়ের কাছে প্রণামে। নামলেন। গাঙের জল ছলকে উঠল, মা, মা, জগদম্বে, সর্বমঙ্গলা, মঙ্গল্যে, মা, মা।
ওরে পা ছাড়, ওঠ পাগল ওঠ, নৌকো দুলছে, পড়ে যাব বাবা। এইখানটাতেই বসি। ছইয়ের ভিতরে গিয়ে কাজ নেই। বিষ্ণু বললে, পড়ন্ত বেলার রোদ লাগবে গো।
ওরে মুখপোড়া, বেলা যার পড়ে এসেছে তাকে একটু দিনের আলোয় থাকতে দে। ঘরে ঘরে আলো দেখে লাগে ভাল, মোর হৃদি গেহ অন্ধকারে কালো। হ্যাঁগো বড়ছেলে, তোমার গান আসে?
কথা বলতে বলতে মহিলা আসনপিড়ি করে নৌকোর মাঝখানে বসলেন। আহা! একেই বলে। মায়ের কোল। তেমন মানুষ হলে বলত, মা জননী আমার এক কাঠা জায়গা নিয়ে চারপাশ আলো। করে বসেছেন। টুক করে আমিও একটি প্রণাম সেরে নিলুম। দুহাতে আমার মাথাটি আঁকিয়ে দিয়ে বললেন, ছেলেবেলায় মাতৃহারা হলে বড় কষ্ট রে! এটি বুঝি তোমার নাতি? মেয়ের মেয়ে?
মাতামহ বসে পড়েছেন। তুমি কী করে বুঝলে মা?
ও আমি বুঝতে পারি। কী করে পারি তা বলতে পারব না। সবই গুরুর কৃপা। এই ছেলেটি পৃথিবীতে স্নেহ ছাড়া সবই পাবে। মরুভূমিতে হাঁটতে হবে, কঁটাগাছ চিবোতে হবে উটের মতো। তোমার জীবন বাবা খুব সুখের হবে না। তবে ঘাবড়ে যেয়ো না। শত দুঃখ শত জ্বালা আসিবে আসুক। জীবন হল কাঁচের ফানুস। আলো যদি জ্বালাতে পারো অন্ধকারে চাঁদের মতো দেখাবে। ধারা নৈবপতন্তি চাকমুখে মেঘস্য কিং দূষণম/ ষৎ পূর্বং বিধিনা ললাট লিখিত তন্ মার্জিতুং কঃ ক্ষমঃ? চাতকের মুখে যদি জল না পড়ে তাতে মেঘের কী দোষ বলো? বিধি তোমার ললাটে যা। লিখেছেন, কার ক্ষমতা আছে তা মুছে দেয়? তবু পথ আছে। বিপদি মহতাং ধৈর্য।
নৌকোর নোঙর উঠল। বাতাস লেগে পাল ফুলে উঠেছে। একপাশে কাত হয়ে জলে ফেনা কেটে কেটে নৌকো সবেগে ছুটেছে। বড় বড় ঢেউ উঠছে হিসহিস করে। নৌকোর ধাক্কা লেগে ঢেউ। ভেঙে পড়ছে টুকরো টুকরো কাঁচের মতো। গায়ে জলের কণা এসে লাগছে। ভয়ে বুক কেঁপে কেঁপে উঠছে। মাতামহ উন্মুখ হয়ে বসে আছেন। চোখদুটো জ্বলছে। মনের মতো সঙ্গ পেয়ে গেছেন। এ আর এক চাতক। না চাইতেই জল পেয়ে গেছেন।
মহিলা আমার মাথার পেছনে একটা হাত রাখলেন। কী ভারী হাত! এ হাতে জগৎকে দাবিয়ে রাখা যায়। বললেন, কী রে ভয় করছে? পরান মাঝি হাল ধরেছে, ভয় কীসের বোকা! তুই না পুরুষমানুষ! তুই বলবি, হরিফে জোশিশে দরিয়া নহি খুদাদারি-এ সাহিল। উদ্বেল সমুদ্রের শত্রু আমি নই, আমি তটের দম্ভ। আমি পুরুষ। কীরকম পুরুষ? জানতুম পর নিসার করতা হুঁ। মৈ নহি। জানতা দুআ ক্যা হৈ। তোমার পায়ে নিজেকে ফেলে দিয়েছি, প্রার্থনা ফ্রার্থনা জানি না।
