পালের ভারে কাত হয়ে তীব্র বেগে নৌকো ঘাটে এসে ভিড়ল। দু’জন মাঝি লগির ঠেকনা দিয়ে সানবাঁধানো সিঁড়িতে নৌকোর মাথা ঠোকা অদ্ভুত কায়দায় বাঁচিয়ে দিল। নিত্য করে করে এমন অভ্যস্ত হয়েছে, টাল খায় না, ফসকায় না, পেটে খোঁচা লেগে ভুঁড়ি ফঁসে না। নৌকোর মাঝখানে সাইকেল নিয়ে একজন দাঁড়িয়ে ছিলেন, বাহনের ওপর বাহন। বেশ মজা। তিনি ঠেলেঠুলে আগে নামতে চাইছিলেন। পারলেন না। ছইয়ের ভেতর থেকে ডুরে শাড়ি পরা বেশ পাঠঠা চেহারার এক মহিলা বেরিয়ে এলেন। পানের রসে পুরুপুরু ঠোঁটদুটি বেশ লাল। শরীরের ঊর্ধ্বভাগে অদ্ভুত এক ঝাঁকুনি দিয়ে কোমরে শাড়ির আঁচল জড়াতে জড়াতে কাঁচ-ভাঙা গলায় বললেন, যাচ্ছেন কোথায়? মাছের ঝুড়ি না নামলে নামবেন কী করে? যাঁরা শেষে নামবেন বলে উদাস উদাস মুখে বসেছিলেন, মহিলা তাদের মাথার ওপর দিয়ে টপকাতে টপকাতে গলুইয়ের পাশ দিয়ে টাল খেতে খেতে, মাঝিদের কোমর জাপটাতে জাপটাতে সামনে চলে এলেন। কে একজন বলে উঠলেন, গন্ধ। মহিলা ঘাড় ঘুরিয়ে ফোঁস করে উঠল, তোমার বউয়ের গায়ে কীসের গন্ধ? গোলাপের?
রসিক ছোকরা উত্তর দিল, বউ নেই গো আমার।
ঝুড়িটা মাথায় চাপিয়ে কোমর দুলিয়ে মেয়ে উত্তর দিলে, তা হলে রাতের বেলা লণ্ঠন জ্বেলে পাড়ায় এসো, চাঁদা মাছ পাবে।
এনকোর, এনকোর! গরবিনি মাছ নিয়ে, হেলে দুলে, সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে ওপরে উঠে এল। ওপারের যাত্রীরা এপারে পারানির কড়ি ফেলে। এপারের যাত্রীরা ওপারে। মহিলাকে কিছুই দিতে হল না। তিরছি নজরিয়াকি বাণ মেরে, ঘাটমাঝিকে কাত করে দিয়ে সরে পড়ল। পৃথিবীতে আদিরসের বড় ছড়াছড়ি। মৎসগন্ধা হলেও যৌবনে ডগমগে। আর যায় কোথায়? পৃথিবী ছেড়ে কথা কইবে? ঝুলনের মেলায় আধবুড়ি ঘাঘরা পরে মুখে রং মেখে নাচছে। সমঝদার খোঁচা মেরে বলছে, রস অছি। পরেশ মাঝরাতে ঘেঁটে গামছা পরে ছানার তালের ওপর নাচছে। জবা মাথার ওপর হাত তুলে চুল আঁচড়াচ্ছে। ফুলগাছের টবের আড়ালে বসে শিকারের চোখ অজগরের নিশ্বাসের টানে গুটিগুটি এগিয়ে চলেছে। আগুনে পতঙ্গের আত্মাহুতি। ও থাক। ও যেখানে লেখা আছে সেইখানেই থাক, দুঃখং সর্বং অনুস্মৃত্য কামভোগান্নিবর্তয়েৎ, অজং সর্বং অনুস্মৃত্য জাতং নৈব তু পশ্যতি। পাগলা জগৎ দুঃখময়। এই দুঃখের পৃথিবীতে সকাম হয়ে মরিসনি। সবই অজ। কিছুই নেই। তবে তুই ব্যাটা দামড়া ছাগল আঠাঅলা বটপাতা দেখে ব্যা ব্যা করে ছুটিস কেন? ডুরে শাড়ির ফাঁদ দেখলি। আর খোঁপা মাথায় মাছের ঝুড়িটা দেখতে পেলি না। চিদানন্দ সাগরে মাছ খেলছিল, টোপ ফেলে, বঁড়শি গেঁথে, আঁশ চুবড়িতে লাদাই করেছে। দশ টাকা সের, দশ টাকা সের।
শেষ যাত্রী নেমে গেল। পাটাতনে লগি রাখার শব্দ হল। শিকলে বাঁধা নোঙর ঝপাং করে জলে পড়ল। মাতামহ বললেন, নে উঠে পড়। কখন ছাড়বে কে জানে?– ঢেউয়ের তালে তালে নৌকো দোল খাচ্ছে। আই অ্যাম হেলপলেস, আই অ্যাম হেলপলেস। পাপীর মাথা নড়ছে। পুণ্যাত্মার মাথা নড়ছে। জজসাহেবের মাথা নড়ছে, আসামির মাথা নড়ছে। আমার কাঁধে হাতের ভর রেখে মাতামহ উইকেটকিপারের ভঙ্গিতে টাল খেতে খেতে নৌকোয় উঠলেন।
ঘটের মাথায় কঁঠালি কলার মতো নাতি আর মাতামহ নৌকোর মাঝখানে পাল টাঙাবার বাঁশের পাশে গাট হয়ে বসেছি। এ সময় এপার থেকে ওপারে কে আর যাবে! এখন সব ফেরার সময়। কলকারখানায় ছুটির সময়। মাতামহ জোরে জোরে দু’বার নিশ্বাস নিয়ে বললেন, জলের কেমন মিষ্টি গন্ধ দেখেছিস? ভেতরটা যেন জুড়িয়ে যাচ্ছে। আসছে বার জন্মে মাঝি হব। মাঝিরা খুব তাড়াতাড়ি ঈশ্বরকে পায়। মরে স্বর্গে যায়। তুই কী হবি?
আমি গভীর জলের মাছ হব।
খুব ভাল ইচ্ছে। কারুর বাপের ক্ষমতা নেই ধরে। মাঝে মাঝে শুধু ঘাই মেরে যাবি। তবে এ জন্মের সংস্কারে আসছে বার তুই লেংটি আর চিমটে নিয়ে জন্মাবি। এই পথের মাঝখানে বসে বিশেষ সুবিধে হচ্ছে না রে, চল গলুইয়ের ওপর গিয়ে বসি।
যদি টাল খেয়ে পড়ে যাই!
ঠিক মামার ধাতটি পেয়েছিস। ভয়েই আধমরা। পুরুষমানুষকে একটু ডাকাবুকো হতে হয়। আমার শরীরে কত জায়গায় কাটার দাগ আছে জানিস? এই দেখ।
সামনে একটা ঠ্যাং ছড়িয়ে দিলেন। গুলি থেকে উরু পর্যন্ত বড় ছোট নানা ধরনের দাগ।
দাদু, আপনি কি যুদ্ধে গিয়েছিলেন?
দুর ব্যাটা। যুদ্ধ কি থেমেছে নাকি? এখনও চলছে। এই দাগটা কীসের জানিস?
উরুর মাঝখানে বেশ বড় মাপের গভীর এক ক্ষতচিহ্ন।
এই দাগটা বেনারসের স্মৃতিচিহ্ন। বিশ্বনাথের গলিতে ষাঁড়ের লড়াই। যাঁড়ে ষাঁড়ে নয়। ষাঁড়েতে আর আমাতে। সেই চাঁদবদনিকে বাঁচাতে গিয়ে এই অবস্থা। তুই হলে?
কোন চাঁদবদনি দাদু? আপনার প্রেমিকা?
জিভের ডগাটা সামনে একটু বের করে বললেন, তুই চাঁদবদনি বলিসনি। তোর গুরুজন, দিদিমা। সবে বিয়ে হয়েছে। মনের যমুনায় তখন প্রেমের ঢেউ। রেল কোম্পানির ‘পাসে’ ভারত-ভ্রমণ হচ্ছে। তখনও তো পুরনো হয়নি বউ। ধরে আনতে বললে বেঁধে আনি গোছের অবস্থা। আর তোর কানে কানে বলি, প্রথম যৌবনে সেই মেয়েমানুষটিকে দেখলে তুইও ভিরমি যেতিস। টকটক করছে গায়ের রং। তেমনি চেহারা। যেন উড়িষ্যার মন্দিরের খোদাই করা পাথরের মূর্তি।
ছবি দেখেছি দাদু।
ধুস, ও ছবিতে সে চেহারাই নেই। ঘি আর মালাই খাইয়ে খাইয়ে কুমড়োপটাশ করে দিয়েছি। তোকে আর একটা কথা বলে রাখি, সোহাগ ভাল অতি সোহাগ ভাল নয়। আদরের জিনিস তাড়াতাড়ি সরে পড়ে।
