এমন মজা, সেই থেকে কিছু দুললেই কান সুড়সুড় করে ওঠে, আর সেই মেয়েমানুষটির কথা মনে পড়ে। আহা, এ যেন ভক্ত প্রহ্লাদ, ক বললেই কৃষ্ণের কথা ভেবে হাপুস। কিন্তু দূরে ঘাট-মাঝি চট পেতে ক্যাশব্যাক্স নিয়ে বসে আছেন। গঙ্গার ধারে সারাদিন বসে থেকে থেকে, নৌকোর পারাপার দেখে দেখে কেমন যেন দার্শনিকের মতো মুখ। বসে আছেন তো বসেই আছেন। ইনি যেন সিদ্ধার্থের সেই ঘাট-মাঝি। হেরম্যান হেসের ওই বইটা কতবার যে পড়েছি। যতই পড়ো বাবা! জীবন অনেকটা চুনো মাছের মতো। আঁশটে গন্ধ কি সহজে যেতে চায়। ছাঁকা তেলে কড়কড়ে করে ভাজা না হলে!
পশ্চিমে রোদ ঝুলছে। জল থেকে মাঝে মাঝে হিরের আঙুল বেরিয়ে এসে চোখে খোঁচা মেরে যাচ্ছে। বাঁ পাশে বিশাল একটা বাগানবাড়ির জলটুঙি অতীত গৌরব হারিয়ে, আধ-ভাঙা হয়ে জলের ওপর ঝুঁকে আছে। ছেলেবেলায় ওখানে সুন্দরীদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। চুল উড়ছে, শাড়ির আঁচল উড়ছে। সময় উড়ছে, টাকা উড়ছে, পাখি উড়ছে। যাহা যায়, তাহা যায়। ডাকলেও আর আসে না। ফাটা রেকর্ড বাজতেই থাকে, শূন্য এ বুকে পাখি মোর, আয় ফিরে আয়, ফিরে আয়।
মাতামহ পাশে বসে আছেন গুম হয়ে। কনকের হাতের রান্না খেয়ে সেই দুপুর থেকে স্তব্ধ হয়ে আছেন। নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করছেন বুঝি? খাবার সময় ছাড়া ঠোঁট ফাঁক করবেন না। জল থেকে রোদের ঝিলিক উঠে মুখে লেগেছে। তপ্ত কাঞ্চনের বর্ণ হয়েছে। মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখছি, যদি কিছু কথা বলেন।
ভস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, কী দেখছিস? কতদিন হয়ে গেল এই পৃথিবীতে এসেছি। জীবন যেন আর ফুরোতেই চায় না। যে শেষে যায় সে বড় কষ্ট পায়। একে একে হাত ধরে নৌকোয় তুলে দিয়ে, চুপচাপ গালে হাত দিয়ে বসে থাকো। দিন যায়, দিন যায়, সে আর আসে না।
কে দাদু?
মৃত্যু রে বোকা, মৃত্যু।
মৃত্যুর কথা আসছে কেন? সব বুড়োরই এক রোগ।
ওই জলটুঙিটার দিকে তাকিয়ে দেখ।
সেই তখন থেকেই তো দেখছি।
ওইটার মতোই আমি জীর্ণ আর প্রাচীন। হুহু করে জল বয়ে চলেছে। পোস্তা ভাঙছে আর ভাঙছে। একদিন ধস করে ধসে পড়ে যাবে। ওর আর কী কদর আছে বল? আমার মতোই। ভেঙে এসেছে। ভাঙল বলে।
এ তুলনার কোনও মানে হয় না। জড় পদার্থের সঙ্গে সজীব পদার্থ বিজ্ঞান মানবে না।
রাখ তোর বিজ্ঞান। জড়ে আর বৃদ্ধের জীবনে বিশেষ তফাত নেই রে! দেহে সে শক্তি নেই, মনে সে জোর নেই, উপার্জনের ক্ষমতা নেই। বেঁচে থাকার অধিকার কোথায়? এ পৃথিবী হয় ভোগীর না হয় যোগীর। আমি যে কোনওটাই নই।
বাবা আপনাকে বকেন বলে মনে দুঃখু হয়েছে?
তোমার বাবা? ও তো মানুষ নয় দেবল। তুই চিনতে পারিস না?
না।
তা পারবি কেন। পিতা সূর্যসমং জ্যোতিঃ মাতা সমুদ্রসমং সরঃ। পিতা পৃথিবৈঃ বর্ষীয়ান্ মাতুর্মাত্রা ন বিদ্যতে ॥ বুঝলে কিছু? ও আমার পাগলা ছেলে। এই কড়া কথা, এই নরম কথা, এই দূর দূর করছে, এই আবার কোলে তুলে নিচ্ছে। ওর নখের যোগ্য হতে পারলে তোমার জীবন তরে যাবে।
একটু একগুঁয়ে।
গোঁ না থাকলে পুরুষকে মানায় না। গন্ডারের মতো গো চাই। একেবারে এ ফোঁড় ও ফোঁড় করে বেরিয়ে যেতে হবে। পৃথিবী কি তোমার সহজ জায়গা ভেবেছ? ওর তেজ তো তোমরা কিছুই দেখোনি। সে আমরা দেখেছি। সবাই বলত আপনার জামাই নয় তো আগ্নেয়গিরি। ওর সেই বিয়ের রাতের ঘটনাটা! একেবারে প্রথম রাতে বেড়াল কাটার মতো। এখনও মনে পড়লে একা একা কুঁই। কুঁই করে হাসি।
কী দাদু?
হ্যাঁ রে শালা, বাপের বিয়ের ঘটনা শোনার খুব শখ। আচ্ছা শুনে রাখ, তোরই হয়তো কাজে লাগবে। বাপকো বেটা হতে হবে তো। তোর বিয়েও তো লাগল বলে!
হ্যাঁ, তাই তো? ও পথে বাড়াস নে তুই পা।
তুই বাড়াবি কেন রে শালা, আমরাই বাড়িয়ে দোব।
আমি সারাজীবন ব্রহ্মচারী থাকব ভীষ্মের মতো।
আমরা বেঁচে থাকতে তুমি ধর্মের ষাঁড় হয়ে ঘুরবে ভেবেছ? ষণ্ড আর ভণ্ড এক জিনিস। পাত্রী উজিয়ে এসে ঘরে বসে আছে। একেবারে সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। চোখদুটো দেখেছিস, যেন মা দুর্গা। হাতের রান্না দেখেছিস? আমি খাব কী, আমাকেই খেয়ে ফেললে। কাপড়ের কষি কোথায় নেমেছে দেখেছিস? মেয়েটিকে বড় পছন্দ হয়েছে আমার। মায়ায় বেঁধে ফেলেছে। ছোটটা তেমন নয়। একটু গুমোরে।
এতই যখন পছন্দ তখন করে ফেলুন।
হ্যাঁ রে শালা, তোর মতো বয়েসে আমাদের কালে দশ-বিশটা বিয়ে করে ফেলত তেমন-তেমন পুরুষ। কী সব দাপট ছিল তাদের। বিয়ের নামে তোর মতো এমন কোঁচার খোট মুখে পুরে ছাগলের মতো চিবোত না। বংশবৃদ্ধি করার সময় কারুর মুখের দিকে তাকাত না। পাশের ঘরে মা তালপাতার চ্যাটাইয়ে পড়ে খাবি খাচ্ছে। মাথার কাছে এনামেলের চটা-ওঠা বাটিতে সর-পড়া বার্লি। ডেওপিঁপড়ে বিড়বিড় করছে। পাশের ঘরে পতিতপাবন মাগ জাপটে পড়ে আছে। মৃত্যু এসে দু’জানলাতেই উঁকি মারলে। ওরে ব্যাটাচ্ছেলে, গর্ভধারিণীকে নিয়ে চললুম। তখন তোর বীজ যিনি গর্ভে ধারণ করছেন, খাতায় তার নামও লেখা আছে। গর্ভধারিণী হয়ে ওই খাট থেকে চ্যাটাইয়ে একদিন নামতেই হবে, তখন দেখা যাবে। দৃকপাত নেই। সব শালা চার্বাকের ব্যাটা। বললে, অঙ্গনালিঙ্গনাদি জন্যং সুখম এব পরুষার্থঃ। যাবজ্জীবং সুখং জীবেৎ নাস্তি মৃত্যোরগোচরঃ। কী ভয় দেখাও মৃত্যু! বড় বউ, মেজ বউ, সেজ বউ। বড় ছেলে, মেজ ছেলে, ছেলের পর ছেলে। রোলকল করে রাতে ঘরে তুলতে হয়। মুথো ঘাসের বংশ। শিকড়ে বাকড়ে জড়িয়ে মুকুজ্যে বংশ কুঁড়োজালি তৈরি করে বসে আছি। টান মারলে মাটিসুদ্ধ উপড়ে চলে আসবে। কী ভয় মরণে। ন স্বর্গো নাপবর্গো বা নৈবাত্মা পারলৌকিকঃ। ভস্মীভূতস্য দেহস্য পুনরাগমনং কুতঃ। এক বাপ মরলে আরও একশো বাপ রয়ে গেল। যমরাজ তুমি কত নেবে? ধিনতাকের ব্যাটা তিনতাক, আমি দিতে থাকি তুই নিতে থাক।
