সে আবার কী? মাতামহ জানতে চাইলেন।
সে একটা অসুখ, এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।
ছোঁয়াচে?
মানসিক ব্যাধি। মহিলা বাঙালি। আমাদের বললেন, আপনারা দয়া করে আমার পাশে বসুন। কলকাতা পর্যন্ত যাব। একা ভীষণ ভয় করছে।
তোমরা চেন টেনে লোকটাকে নামিয়ে দিলে না কেন? আইন আছে, পাগল, ছাগল, ছোঁয়াচে রোগী, কেরোসিন, বারুদ, মাতাল, ট্রেনে ট্রাভেল করতে পারবে না। ঘাড়ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দাও।
মাতামহ এমনভাবে বললেন, যেন ট্রেন চলছে, ঘটনা ঘটছে।
পিতা আবার শুরু করলেন, আমরা ওপর থেকে নীচে নেমে এসে সেই মহিলার দু’পাশে বসলুম। কথায় কথায় জানা গেল, মহিলার স্বামী দেরাদুনে সম্প্রতি মারা গেছেন। ফিরে চলেছেন। কলকাতায় নতুন জীবন শুরু করতে। বিবাহিত জীবন মোমবাতির মতো গলে গলে নিবে গেছে। চার বছরেই সব শেষ। মানুষ কী জীব দেখুন। লালসার জিভ লকলক করে বেরিয়ে এলেই হল। চেক-ভালভ বলে কিছু নেই। এরাই আবার গর্ব করে বলে, অমৃতস্য পুত্রা।
মাতামহর প্রতিবাদ, একটা মানুষ দেখে সব মানুষকে গালাগাল দিয়ো না। গরলের পুত্র একটা-দুটো, অমৃতের পুত্ৰই বেশি। তা ছাড়া তুমি তো বললে, লোকটা অসুস্থ! কী যেন অসুখ। বললে? ও রোগের নাম বাপের জন্মে শুনিনি।
না শোনাই ভাল? কিছু অসুখ আছে যার ওষুধ হল লাঠি। লাঠৌষধি। ব্রায়োনিয়া নয়, অ্যাকোনাইট নয়, পটপটি নয়। লালসার দাওয়াই হল শাশুড়ি-ছ্যাঁকা। জিভটি টেনে বের করো, আর খুন্তিকে লাল করে পুড়িয়ে ছ্যাঁকা।
তুমি আমাকে বলছ না তো হরিশঙ্কর? পান্তুয়া দেখলে যে আমার নোলা সকসক করে ওঠে।
এ নোলা সে নোলা নয়। এ হল নোলকের নোলা। প্রস্টেট থেকে বেরিয়ে এসে কুলকুণ্ডলিনীতে সুড়সুড়ি দেয়। মানুষ তখন সারমেয়ের মতো জিভ বার করে হ্যাঁ হ্যাঁ করতে থাকে। অমৃতের পুত্র উদম হয়ে হেঁচকি তোলে। সময় নেই, অসময় নেই, স্থান কাল-পাত্রের বিচার নেই। আমার পাখিই ভাল, আমার পাখিই ভাল। সূক্ষ্ম আহার, সূক্ষ্ম বিয়োগ, দুটি ডিম। একটু তা। লাল-ঠোঁট বাচ্চা। পালকের বাহার। অনন্ত আকাশ। গান, শুধু গান। দ্বিপদ প্রাণী যখন চতুষ্পদ হয়ে যায় তখন ব্যাপারটা এত ভালগার হয়ে দাঁড়ায়? আমাদের ভোলা ষাঁড় অনেক অনেক ডিগনিফায়েড।
মেসোমশাই সামান্য অধৈর্য হয়ে বললেন, এখনও কিন্তু উপসংহারে এলেন না।
ও হ্যাঁ। ঠিকই তো। মানুষের ব্যবহারে বড় বিচলিত হয়ে পড়েছিলুম। যা বোঝাবার জন্যে এই গল্পের অবতারণা, তা হল, সেই হ্যাটকোটধারী পশুমানবটি কুপেতে আর বসতে পারলেন না, বাইরের প্যাসেজে দাঁড়িয়ে রইলেন। অনেক রাতে বাথরুমে যাবার পথে প্যাসেজের শেষ প্রান্তে পিতা-পুত্রকে মুখোমুখি দেখলুম। ছেলে বাপকে জিজ্ঞেস করছে, হোয়াট হ্যাভ ইউ ডান ফাদার?
গলায় অভিমান, অভিযোগ। ফাদার ফাম্বল করছে। ইউ হ্যাভ ডান সাম রং। হোয়াই, হোয়াই? হোয়াই? হোয়াই? গলা ভেঙে এসেছে কান্নায়। আমি চাই না, আমি চাই না আমার পুত্র, জীবিত আমি মৃত আমির সামনে পঁড়িয়ে অভিযোগের আঙুল তুলে বলে, কেন, কেন তুমি এমন কাজ করতে গেলে? আমার চরিত্রের অর্কিড হাউসে ও ঝুলতে থাকবে হিমালয়ের সৌন্দর্য নিয়ে। সেই কারণেই আমি বিধুকে পাঁচ হাজার টাকা দোব।
সেকী? মেসোমশাই, মাতামহ, দুজনেই আবার চিৎকার করে উঠলেন। এ যেন সাতকাণ্ড রামায়ণ শুনে সীতা কার বাবা বলে চিৎকার করে ওঠা।
সেকী টেকি নয়, ডিসিশন ইজ ডিসিশন।
মাতামহ বললেন, হরিশঙ্কর, তোমারও ওই লাঠৌষধি। বিধুকে তুমি টাকা দিয়ে দেখো!
মেসোমশাই বললেন, এ হল আইনের অবমাননা। লোকটাকে আমি জালিয়াতি কেসে ফেলে যাবজ্জীবন করে ছাড়ব ভেবেছিলুম। আপনি বাদ সাধলেন। কিল খেয়ে কিল হজম করে পুত্রবধূর৷৷ কয়েকদিন পরেই আপনি শ্বশুর হবেন, আপনার এ কী ভীরুতা।
মাতামহ বললেন, ও হবে শ্বশুর? শ্বশুর হলুম আমি। এ জিনিস দ্বিতীয় আর পাবে না। মেয়ে নেই আমার জামাই আছে। আর তার ঘাড়ে বসে লুচি চলছে, মালপো চলছে। দু’বার তীর্থভ্রমণও হয়ে গেছে।
মেসোমশাই চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বললেন, বাথরুমে বসে ঠান্ডা মাথায় আর একবার চিন্তা করুন হরিদা।
চিন্তা? পিতা হাসলেন। পাঁচ হাজার টাকা আমাকে বেঁধে ফেলার আগেই লোহা গরম থাকতে থাকতেই হাতুড়ি মারব। মন বড় দুর্বল। আমি ক্যাশবাক্স খুলব, এখুনি টাকা বের করব, এখুনি দিয়ে আসব। কে জানে? মন বড় দুর্বল। মন বড় অপলকা। পিতা ক্যাশবাক্সর দিকে এগোতে লাগলেন। তা না হলে রক্ষক ভক্ষক হয়ে যায়?
তার মানে? পইতের চাবিটি হাতে ধরে পিতা ঘাড় ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ হাসি হেসে বললেন, ওই যে আমার ট্রেনের বন্ধু!
১.১০ নীলাঞ্জন-সমাভাসং রবিপুত্রং যমাগ্রজম
দিন যেন ঝলসে যাচ্ছে। চনমনে রোদ। চারপাশ ঝনঝন করছে। সামনে গঙ্গা। জোয়ারে ভারভরন্ত। সারাশরীরে ঢেউয়ের কুচুরমুচুর। একটু আগে একটা স্টিমার চলে গেছে। তলপেটে চাকা ঘোরাতে ঘোরাতে। বড় ঢেউ ভাঙতে ভাঙতে ঘাট পর্যন্ত চলে এসেছে। পইঠেতে জলের ধাক্কা লেগে লপাত লপাত শব্দ হচ্ছে। শ্মশানের কাঠকয়লা তালে তালে নাচছে- এই ছিল এই নেই সুরে। নৌকো ভেড়ার বাঁশের সাঁকো তলিয়ে গেছে জলের তলায়। নৌকো বাঁধার খোঁটাটি শুধু জেগে আছে দূরে। একপাশে পতিত মাঝির বৃদ্ধ নৌকো দুলে দুলে উঠছে। ঝুলনের মেলায় সেই প্রৌঢ়া নর্তকীর কোমর দুলিয়ে নাচার মতো। যে নাচ দেখতে গিয়ে তাঁবুর ভেতরেই শশাঙ্ককাকার কানমলা খেয়েছিলুম। বাইরের পোস্টারে মাকড়সা কন্যার জাল বোনার কথা সাড়ম্বরে লেখা ছিল। ভেতরে যে ঘাঘরা নাচের আয়োজন কেমন করে জানব। সুখেন হয়তো জানত! তা না হলে ঢুকবে কেন? কন্যাটন্যার। মর্ম সেই বয়েসে সুখেনের চেয়ে ভাল কে আর জানত। প্রথমে প্যান্ট পরা চোয়াড়ে মার্কা একটা লোক কাঠের পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে খুব খানিক অসভ্যতা করে, সিক সিক দু’বার সিটি মারতেই ততোধিক অসভ্য সেই মহিলা পেছনের ঘেঁড়া চটের পরদা ঠেলে বেরিয়ে এল। মুখে খড়ি, ঠোঁট লাল। বুকদুটো ঠেলে বেরিয়ে আছে। সুখেনের মতো অ্যানাটমিই বা কে জানে? ফিসফিস করে বললে, ফক্স। শুরু হল অশালীন ক্রিয়াকলাপ। ভদ্ররুচির কোনও মানুষের সেসব দেখা উচিত নয়। উঠে পালাবার উপায় নেই। সুখেন চেপে ধরে রেখেছে। আমাদের পাশে লুঙ্গি পরা সব লোক বসেছে। মদের গন্ধ, রসুনের গন্ধ, তেলের গন্ধ, বিড়ির গন্ধ। মঞ্চের লোকটা মাঝে মাঝে সেই মহিলার বিশাল পাছায় পটাস পটাস চাপড় মারছে, আর সকলে হায় হায় করে উঠছে। বুকফাটা আর্তনাদ। মানুষের কখন কী যে কেমনভাবে ফেটে যায়! চিতায় বেলের মতো ফটাস করে মাথা ফাটে। দুঃখে বুক ফাটে। এ আবার কী ফাটা! আমার পাশের লোকটা কনুইয়ের খোঁচা মেরে বলল, মাগির রস আছে। রসগোল্লার রস হয়। এ আবার কী রস বাবা! কিন্তু শশাঙ্ককাকার মতো প্রবীণ মানুষ কী জন্যে ওই রসমঞ্জরীর কাছে গিয়েছিলেন? জবাব নেই।
