আর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মেজদা নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ঘুম ভেঙে গেল। ফুটো দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়লে যেমন হয়, সেইরকম একটা রুপোলি রেখা ক্রমশ গুটোতে গুটোতে বহু দূরে চলে গেল। সারাঘরে সুন্দর গন্ধ। আমি একজন কেমিস্ট। অমন গন্ধ পৃথিবীর কোনও আতরে খুঁজে পাইনি। জানি না ব্রহ্মকমলের কেমন গন্ধ!
মাতামহের চোখ বড় বড় হয়ে উঠেছে। মেসোমশাই বিলেত-ফেরত ব্যারিস্টার। মুখ দেখে মনের ভাব বোঝার উপায় নেই। সামনে ঝুঁকে পড়ে মাতামহ বললেন, তারপর কী হল!
আলমারি খুললুম। চশমার খাপ। সত্যিই টাকা রয়েছে। একটা দশটাকার নোট। সকাল হল। কেবলকে জিজ্ঞেস করলুম। সাধুসন্ত মানুষ। কিছুতেই স্বীকার করবে না। শেষে বললে, হ্যাঁ, মেজবাবু জুতো সারিয়েছিলেন। তবে সে পয়সা আমি আর কিছুতেই নিতে পারব না। স্বপ্নের কথা বলতেই কেঁদে আকুল। একজোড়া সোয়েডের নিউকাট দেখিয়ে বললে, ওই দেখুন, মেজকত্তার জুতো। তৈরি হল, পরা আর হল না। এই তো মানুষের জীবন! টাকা কী হবে? সেই টাকা দশটা ফ্রেমে বাঁধাই করে দোকানে ঝুলিয়ে রেখেছে। সেই মেজদা বিধুর কাছে টাকা ধার করেছেন আমাকে। বিশ্বাস করতে হবে?
মেসোমশাই বললেন, একটা মানহানির মামলা ঠুকে দিই। আর দেরি নয়। ফার্স্ট, থানায় একটা ডায়েরি করে আসতে হবে।
না। মামলা-মকর্দমা নয়। আমি টাকাটা ওর নাকের ডগায় ছুঁড়ে ফেলে দোব।
সেকী? মাতামহ আর মেসোমশাই দুজনেই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলেন।
পাঁচ হাজার টাকার চেয়ে আমার কাছে আমার ইজ্জত অনেক মূল্যবান। ওর জন্যে, ওর জন্যেই আমি ওই জোচ্চোরটা যা চায় তাই দোব।
পিতা দূর থেকে আমাকে বারকতক আঙুলের খোঁচা মারলেন।
মেসোমশাই বললেন, এর মধ্যে ও আসছে কী করে?
ভবিষ্যতে কেউ যেন না বলতে পারে, তোমার বাবা চোর ছিল, জোচ্চর ছিল, চরিত্রহীন ছিল। দেয়ালে যখন ঝুলব, তখন দেবতার মতো ঝুলব। পৃথিবীর আদর্শ পিতাদের তিল তিল নিয়ে আমি হব তিলোত্তম। কোনওদিন ওর মনে যেন এই ক্ষোভ দেখা না দেয়, আমার পিতা যা বলতেন তা করতেন না। হি ওয়াজ এ বান্ডল অফ প্যারাডক্স। দেবদেবীতে আমার বিশ্বাস নেই, দেবচরিত্রে আমার বিশ্বাস আছে। আমার চরিত্রই আমার গর্ব। সেই গর্বের ছোঁয়া লাগবে আমার 91698 1691 All over the land they will be telling of Dugald Stewart. Mothers will teach their children to be men by him. High will his name be with the teller of few teles. There are things greater than death. Dugald Stewart-এর জায়গায় হরিশঙ্কর। পাঁচ হাজার টাকা নাথিং বাট স্ক্র্যাপ অফ পেপারস।
শুনুন, শুনুন হরিদা, সেন্টিমেন্ট ভাল, সেন্টিমেন্টাল হওয়া ভাল নয়। রামকৃষ্ণ বলেছেন, ফোঁস করবে। সেটি ছেড়েছ কী মরেছ। চরিত্র এক জিনিস, দুর্বলতা আর এক জিনিস। ভীরুতা কি ভাল? মেসোমশাই বেশ গম্ভীর মুখে বললেন।
ভয়? যে ঈশ্বরকে ভয় করে না, যে শয়তানকে ভয় পায় না, জীবনের সিংহদুয়ারে যে একা প্রহরীর মতো সারাজীবন খাড়া তার অভিধানে ভয় শব্দের স্থান নেই বিনয়দা।
আছে আছে, সাবকনসাসে’ লুকিয়ে আছে বদনামের ভয়, চরিত্রহননের ভয়। It is the dark idolatry of Self/Which, when our thoughts and actions once are donel Demands that man should weep, and bleed, and groan/Seek not glories that are in heaven.
বেশ, এর ও উত্তর আছে, We have no wings, we cannot soar. But we have feet to scale and climb. দেখতে দোষ কী, কতটা ওঠা যায়, হায়ার, স্টিল হায়ার।
চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে মাতামহ বললেন, বেশ জমেছে হে? তবে বাংলায় হলে খুলত ভাল।
মাতামহের তারিফে বিশেষ কেউ কান দিলেন না। এজলাসে দুই বাঘা উকিল যেন সমানে সমানে লড়ছেন। আসামি হল মানুষের চরিত্র। পিতা বললেন, তা হলে একটা ঘটনা শুনুন।
আবার ঘটনা? মাতামহ টানটান হয়ে বসলেন।
দেরাদুন থেকে ট্রেনে ফিরছি। আমি ওপরের বাঙ্কে। ওপরের বিপরীত বাঙ্কে আমার এক বন্ধু। তার নীচে একটি ছেলে। একেবারে নীচের বাঙ্কে একজন বাঙালি মহিলা। মহিলার বিপরীতে হ্যাটকোট পরা এক প্রৌঢ় মানুষ। আমার নীচের বাঙ্ক খালি।
মাতামহ বললেন, সব গুলিয়ে গেল। তোমরা কে যে কোথায়?
আপনার আর বুঝে কাজ নেই। মডেল তৈরি করে না দেখালে আপনি বুঝতে পারবেন না। সে ইনটেলিজেন্স আপনার নেই। আমারও সে সময় নেই।
কে কোথায় আছ বুঝতে পারলে ভাল হত।
থাক। যা বুঝলেন তাইতেই সন্তুষ্ট থাকুন। ট্রেন চলছে। প্রৌঢ় ভদ্রলোক হলেন কিশোরটির পিতা।
কেমন করে জানলে? মাতামহের বাগড়া।
পিতার ধমক, আবার আপনি কিন্তু শর্ত ভেঙে পূর্বের অবস্থায় ফিরে চলেছেন।
মাতামহ অপরাধীর মুখে বললেন, স্বভাব যায় না মলে।
ট্রেন চলেছে। বিপরীত বাঙ্কে শুয়ে থাকা আমার বন্ধু কেমন যেন উসখুস করছে।
প্রথমে কারণটা বুঝতে পারিনি। আমার বাঙ্ক থেকে আমি ছেলেটিকে দেখতে পাচ্ছি, আর সেই মহিলাকে দেখতে পাচ্ছি। অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ছে না। মহিলা বসে আছেন জড়োসড়ো হয়ে। আমার বন্ধু হঠাৎ তড়াক করে বাঙ্ক থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ল। নেমেই সেই সায়েবি পোশাক পরা লোকটির কলার চেপে ধরল, রাসকেল। খুবই অশ্লীল ব্যাপার। আমার নজরে পড়ার কথা নয়, বন্ধুর নজরে পড়েছে, লোকটা হল একজিবিশনিস্ট।
