পিতার প্রশ্ন, দানাপানি জোটেনি কেন?
আর বলল কেন? সে আর এক দুঃখের কথা। এখন সই করতে গেলে হাত কাঁপে। যতবার টাকা তোলার ফর্মে সই করি, পোস্টমাস্টার বলে সই মিলছে না। সাক্ষী ধরে আনুন। শেষে জিজ্ঞেস করলুম, মশাই আমি তা হলে কোন শালা? সইয়ের আমি, না আমার সই!
আজ থেকে আপনি আমার এখানে খাবেন। যদ্দিন আমি বেঁচে থাকব। তবে একটা অনুরোধ, যতদূর সম্ভব হুগলি জেলার ওই গ্রাম্য শব্দগুলো ব্যবহার না করার চেষ্টা করবেন। শুনলেই আমার পিত্তি চটে যায়। মনে থাকবে?
মাতামহ বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়লেন। গালে জলের রেখা। দুঃখ আর লঙ্কা নিংড়ে বের করেছে।
মেসোমশাই বললেন, আমারও একটা প্রতিবাদ আছে। উনি একটু আগে উকিলদেরও একহাত নিয়েছেন। বলেছেন আমরা মক্কেলকে যা দিই তা হল প্যারাম। মক্কেল মেরে, তেল বের করে আমাদের চেকনাই। হাইলি অবজেকশনেবল।
মাতামহ জল-ভরা চোখে হেসে উঠলেন। কানন দেবীও এমনটি পারবেন না। অনেকটা রোদ আর বৃষ্টির মতো। হাসতে হাসতে বললেন, তোমাকে বলিনি গো। তুমি তো আমাদের ঘরের উকিল। ঘরকা মুরগি ডাল বরাব্বর। অনেকদিন আগে বিভক্তির শ্লোক মুখস্থ করেছিলুম, প্র, পরা, অপ, সম, নি, অভি, দুর, বি৷ হরিশঙ্করের প্যারার সঙ্গে মেলাতে গিয়েই কথায় কথা বাড়ে, টাকায় বাড়ে সুদ। ও কিছু না। তোমাকে আমি কিছু বলিনি।
মুরগি বলাটা মনে হয় উপযুক্ত হল না, যতই হোক হিন্দুর ছেলে!
পিতার মুখ দেখে মনে হল ভীষণ বিরক্ত হয়েছেন। কথার জালে ক্রমশই এমন জড়িয়ে পড়ছেন কীভাবে যে কেটে বেরিয়ে আসবেন ভগবানই জানেন। আঙুল তুলে মাতামহকে বললেন, আপনি অনেকটা গেঞ্জির মতো। কোনা ধরে টান দিলেই হল, ফড়ফড়, ফড়ফড় খুলেই চলেছেন। ওর জন্যে আমি যেমন এক নব-সারমন-অন-দি মাউন্ট তৈরি করছি, আপনার জন্যও সেইরকম একটা তৈরি করতে হবে।
ওই একটাতেই হবে হরিশঙ্কর। আবার নতুন করে খাটবে কেন?
খাটতেই হবে। দু’জনের দু’রকম নেচার। আপনার জন্যে পয়লা উপদেশ হবে, কম কথা বেশি। আহার। খাবার না দেখলে ঠোঁট ফাঁক হবে না।
আঃ, চমৎকার চমৎকার! তুমি আমাদের হিন্দু যিশু, তোমাকে শিশুর মতো কোলে তুলে আমার ধেই ধেই করে নাচতে ইচ্ছে করছে। প্রেমদাতা নিতাই বলে গৌরহরি, হরিবোল। হরি হরয়ে নমঃ কৃষ্ণ-যাদবায় নমঃ। যাদবায় মাধবায় কেশবায় নমঃ। মাতামহ মাথা নেড়ে নেড়ে সুর করে গাইতে লাগলেন। পিতা তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বললেন, অ্যাবসলিউটলি ব্যাড টেস্ট। নাম। নিয়ে ব্যঙ্গ।
গান থেমে গেল। সরল মুখে মাতামহ বললেন, কেন, শাক্ত কি মাঝে মাঝে বৈষ্ণব হতে পারে না?
কেন পারবে না? সব ধর্মেরই শেষে মৃত্যু। তা বলে আপনি আমার নাম নিয়ে সুর করে হরি হরায় নমঃ, হরি হরয়ে নমঃ করবেন? অত্যন্ত কুরুচির পরিচয়।
আরে এ হরি সে হরি নয়। ইনি সেই লোকনাথং ত্রিলোকেশং পীতাম্বরধরং হরিম। তুমি তো শুধু হরি নও, হরি আর শঙ্কর একসঙ্গে পাটিসাপটা হয়ে বসে আছ। রেগে আছ তো, তাই বুদ্ধিবৈকল্য। হয়েছে। না বাবা, তোমার সামনে আর বসব না। কী বলতে কী বলে ফেলব!
মাতামহ উঠে দাঁড়ালেন। কোলের ওপর থেকে গোটাকতক মুড়ি মেঝেতে ছিটকে পড়ল। ভয়ে ভয়ে মুড়ির দানা ক’টা মেঝে থেকে নিচু হয়ে তুলতে তুলতে বললেন, তোমার কোনও কথাই শোনা হল না।
আপনিই তো সব ভন্ডুল করে দিলেন।
আচ্ছা বেশ, আমি যদি এখন একটাও কথা না বলে চুপ করে লক্ষ্মীছেলের মতো বসি!
চেষ্টা করে দেখুন।
মাতামহ চেয়ারে বসে মেঝে থেকে কুড়োনো মুড়ির একটা দানা মুখে পুরলেন। কার সামনে কী কাজ। পিতার নজর সর্বত্র, আরে ছিঃ ছিঃ। আপনি ওই মেঝের মুড়ি দাতে কাটছেন, ছি ছি ছিঃ। দেশে এত বড় দুর্ভিক্ষ চলেছে জানতুম না তো! কদিন না খেয়ে আছেন?
মেঝেটা তো বেশ পরিষ্কার হরিশঙ্কর।
আরে একটু আগেই ওখানে বিধু নেচে গেছে। যান, মুখ ধুয়ে আসুন। আপনাকে দেখছি এবার কোমরে ঘুনসি বেঁধে, দড়ি দিয়ে খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখতে হবে, দামড়া গোপালের মতো। দ্বিতীয় শৈশব শুরু হয়ে গেছে।
একদিন তোমারও হবে। না, না, হবে না, হবে না। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে।
স্তম্ভিত ঘরে মাতামহ মুখ ধুয়ে ফিরে এলেন। চেয়ারে বসলেন ধীরে ধীরে, যেন শব্দ না হয়। শুভ্র ব্যাকব্রাশ করা চুলে জল হাত বুলিয়েছেন। ধবধবে সাদা ভুরু জলে ভিজে ভিজে। তপঃক্লিষ্ট মুখ অদ্ভুত প্রসন্ন। কেঁচার খোঁটে মুখ মুছতে মুছতে বহু দূর থেকে বললেন, নাও শুরু করো।
কথা বলার ধরনে বেশ বোঝা যায়, দেহ ঘরে, মন উড়ে চলে গেছে বহু দূরে। আমাদের ছাতে বহুকাল ধরে এক খণ্ড কাঠ পড়ে আছে। জলে ভেজে, রোদে পোড়ে, শীতে শুকোয়, হিম খায়, বসন্তের বাতাস পায়। এর নাম নাকি সিজনিং। কাঠ ধীরে ধীরে লোহা হয়ে উঠছে। মাতামহকে। দেখলে, আমার সেই কাঠের টুকরোটার কথা মনে পড়ে। Seasoned Sailor returns from the Seven Seas/ His eyes speak of Cyclones/ Hairs bleached white.
পিতা শুরু করলেন, রাত প্রায় ফিকে হয়ে এসেছে। ভোরের মেটে আলোয় মেজদা উত্তরের দরজা খুলে এলেন। গায়ে সাদা উত্তরীয়। আমার মাথার সামনে এসে দাঁড়ালেন। মেজদা তুমি? মুখে অপূর্ব হাসি। মানুষের মুখে অমন হাসি দেখা যায় না। স্বর্গীয় হাসি। তুমি কেমন আছ মেজদা? বললেন, সে তোমাকে বোঝাতে পারব না হরি। না থেকেও থাকার আনন্দ। এলে বুঝতে পারবে। সে এক মহাসম্মেলন। তুমি কি আবার আসবে? মেজদা বললেন, আপাতত নয়। তোমাকে একটা কথা বলার জন্যে আজ এলুম। ওই যে কেবল মুচি, যাবার দু-তিন দিন আগে ওকে দিয়ে আমার চটির স্ট্র্যাপটা সেলাই করিয়েছিলুম। পয়সা দিয়ে যেতে পারিনি। বড় ভাল মানুষ। কোনওদিন চাইবে না। তুমি সকালেই গিয়ে দেনাটা শোধ করে এসো। আলমারিতে আমার চশমার খাপে স্যাময় লেদারের তলায় টাকা আছে। পুরোটাই দিয়ে দিয়ো।
