বেহিসেবি হওয়া যেমন ভাল নয়, আবার আপনার মতো ওয়ানপাইস ফাদারমাদার হওয়াটাও ঠিক নয়।
আরে দুর, আমার পাইসই নেই তো ফাদারমাদার। তোমার যেমন কথা!
মেসোমশাই উসখুস করছিলেন। আলোচনা লাইন চেঞ্জ করে অজ্ঞাত দিকে চলেছে। পারিবারিক গোপনীয়তা বেরিয়ে আসছে। খক করে একবার কেশে চূড়ান্ত রায় দিলেন, হোয়েন দেয়ার ইজ নো ডকুমেন্ট, দেয়ার ইজ নো ক্লেম। যিনি ধার নিয়েছেন তিনি আর জীবিত নেই। একটা মানহানির মামলা ঠুকে দিন।
মাতামহ মহাউল্লাসে বললেন, এই তো আইন আমাদের পাশে, আমাদের কাত করে যাবে এক ব্যাটা দালাল! ঠুকে দাও, ঠুকে দাও। আমার জামাইকে আমি রিপ্রেজেন্ট করব।
কত টাকা দাবি করছে? মেসোমশাই আর একটু গভীরে যেতে চাইলেন।
পাঁচ হাজার। বলছে খেপে খেপে দিয়েছে। মেজদা মুদিখানায় কিছু ধার রেখে গিয়েছিল, হাজারখানেকের মতো। ভয়ে আমাকে বলেনি। সাধুখাঁ খাতা দেখাতেই আমি সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দিয়েছি, অফকোর্স উইথ এ প্রেয়ার, মেজদা, এবার তুমি যেখানেই জন্মাও, লম্বা হাত খাটো করার মতো এমন ভাই তোমার পাশে থাকবে না। তুমি সেই স্বভাব নিয়ে এসো, যে স্বভাব বলে, কাট ইয়োর কোট অ্যাকর্ডিং টু ইয়োর ক্লথ।
মাতামহ বললেন, মুদিখানার হাজার তুমি না দিলেও পারতে। ওরা তিন টাকাকে তিরিশ টাকা করে রাখে। ওসব হল বানানো খাতা।
তা বললে কি চলে? ও আপনি পারেন, আমি পারি না, আমার শাস্ত্র আলাদা। আর একটা ধার ছিল, অতি সামান্য। জানতেও পারতুম না, যদি না মেজদা স্বপ্নে এসে বলে যেতেন।
কীরকম? কীরকম? মাতামহ একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। পরকালের গন্ধ পেয়েছেন।
ভোররাতে মেজদা এলেন।
নিশ্চয়ই ট্রেন লেট ছিল। আমি এতকাল রেলকোম্পানির মালবাবু ছিলুম। লেট না থাকলে কোনও ট্রেন শেষরাতে হাওড়ায় ইন করে না।
আপনি ছিলেন মালবাবু, কথা বলছেন জলপাইবাবুর মতো।
অর্থ?
সুকুমার রায়। জল পাই আর জলপাই এক করে পাগল করে মেরেছিল। হচ্ছে স্বপ্নের কথা চলে গেলেন অন্য লাইনে, রেললাইনে।
বয়েস হরিশঙ্কর। বয়েস। বয়েসে বাতুল। তুমি বলো, বলো। লঙ্কা চিবিয়ে ফেলেছি। ব্লটিং পেপারে একটু চিটেগুড় পেলে জিভে সেঁটে ধরতুম।
কাশীর চিনি মিলতে পারে। চিটেগুড় পাবেন গুলিখোরদের আখড়ায়।
কনক চা নিয়ে এল না, এল মুকু। লজ্জা হয়েছে। বিয়ের কথায় মেয়েরা কেমন যেন মেদুর হয়ে যায়। আরে বোকা, ও তো মাতামহর ঠাট্টা। বৃদ্ধদের ওই তো রীতি। সুন্দরী মেয়ে দেখলেই একেবারে ফুলশয্যার ছবি আঁকা। লাল মেঝে। বাঘথাবা খাট। নীল কামুক মশারি। ফলাও সাদা চাদর। বিলাসী বালিশ। রজনীগন্ধার ছড়ি। যুঁইয়ের মালা বাজু বেয়ে জড়িয়ে মড়িয়ে মাতোয়ালা। ইন্দ্রিয়ে সুবাসের সুড়সুড়ি। ফরাসডাঙার ধুতি আর গরদের পাঞ্জাবি পরে প্যাঙা বসে আছে গ্যাট হয়ে। বত্রিশ ইঞ্চি বুকের ছাতি বেড়ে ছেচল্লিশ ইঞ্চি একটি প্রেমের তাকিয়াকে ধরবে বলে। আর পাকা মেয়েরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সেই কঁচা অর্ঘ্যটিকে ভেতর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যাও না যাও, ওই যে বসে আছেন ঠুটো জগন্নাথ, জগন্নাথ স্বামী রসানন্দো রাধাসরসবপুরালিঙ্গনসুখখা। বৃদ্ধের চোখে হারিয়ে যাওয়া সেই অতীত রাতের ছবি। পাকা পেয়ারার মতো দিদিমার বদলে ঘরে একটা কাঠের সিন্দুক। কতদিন দেখেছি, মাতামহ সিন্দুকের গায়ে হাত বুলোত বুলোতে বলছেন, হ্যাঁগা, শেষপারানির কড়িটি তুমি রেখেছ তো!
যাক, চা এসে গেছে, বলে মাতামহ চায়ে একটা চওড়া চুমুক চালিয়ে বাপস বলে কাপ নামিয়ে রাখলেন। ঝালের জিভে গরম চা উত্তপ্ত শাবলের মতো ঢুকেছে। ভয়াবহ মুখে ফেলে আসা আলোচনার টুকরো তুলে নিলেন, শেষরাতে মেজকত্তা এলেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ! তিনি এলেন উত্তরের দরজা দিয়ে।
হ্যাঁ, ওই দিকেই যে হিমালয়! নো কমেন্টস। এটা জিওগ্রাফির ক্লাস নয়। দিস ইজ প্যারাসাইকোলজি। বাবা, কতরকমের প্যারা আছে গো! প্যারাটাইফয়েড, প্যারাচুট, প্যারালিসিস, প্যারাগ্রাফ, প্যারামর্শ।
প্যারামর্শটা কী?
পরামর্শকে একটু বাঁকা পথে চালালেই প্যারামর্শ। উকিলরা যা দেয় তা হল প্যারামর্শ। ওই প্যারামর্শর ঠেলাতেই সারাজীবন কোর্টের খোঁটায় কলুর বলদের মতো ঘুরেই চলেছি, মামলার তেলে আমার উকিল বন্ধুবিহারী দিন দিন চকচকে হচ্ছে। মাগের গতর দেখলে সুন্দরবনের কেঁদোর জিভে জল আসবে।
মাগ ছাড়া অন্য শব্দ মাথায় এল না?
আহা, ওই যার চেহারা তাকে আমি কেমন করে রমণী বলি? একটা মানানসই শব্দ বলতে হবে তো? তুমি সবেতেই যদি চটে যাও তা হলে তো বোবা হয়েই থাকতে হয়। তা হলে তুমি রামকৃষ্ণের ওপর রাগো, রামপ্রসাদের ওপর রাগো। আমি তো তাও মাগি বলিনি! রামপ্রসাদ বলে আমার কোষ্ঠী, শুদ্ধ সেই তারাবেশে। মাগি জানে না যে মন কপাটে খিল দিয়েছি কত কষে।
আপনি অফুল।
নিশ্চয়ই কোনও বিলিতি ফুল। কুন্দ, কমল, বকুল, বেল, যুঁই, জবা, ঘেঁটুর দলে নয়। বুঝেছি খুব বিরক্ত হচ্ছ। কী করি বলো, সারাদিন কথা বলার লোক পাই না। ছেলে ওল্ডফুল বলে মুখ বেঁকিয়ে সরে পড়ে। দেখেশুনে পুত্রবধূ নিয়ে এলুম। ছেলে সরে পড়ল ফুসলে নিয়ে। বড়লোকের মেয়ে, ছেলে শ্বশুরের সেরেস্তায় বন্ধক পড়ে গেল। বউ বললে, ওঠো তো ওঠো বোসো তত বোসো। সঙ্গী আমার কেউ নেই হরিশঙ্কর। দেয়াল, বেটির ছবি, দোরগোড়ার নারকোল গাছ, গোটাকতক কাক, আর আমার এই সুদের সুদ নাতি। মেরে তাড়াবে তাড়াও। তোমারই রকে গিয়ে বসব। লোকে বলবে জামাই শ্বশুরকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে। জানো, গত তিনদিন আমার পেটে দানাপানি পড়েনি। কেউ একবার জিজ্ঞেস করেনি, বুড়ো, তুমি কিছু খেয়েছ? দোতলায় মোগলাই, একতলায় হরিমটর। মাতামহ চোখ রগড়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে উঁহু করে হাত সরালেন, বাপস জ্বলে গেল, আঙুলে আলুর চপের লঙ্কা লেগে ছিল।
