হরিশঙ্কর একটা হুংকার ছাড়লেন, তন্ত্রের নিকুচি করেছে। ভাঙো তালা।
ছোটদাদু বললেন, সেখানেও একটা আইনগত সমস্যা আছে রে? প্রপার্টি তো তার।
হরিশঙ্কর আগুনের মতো উত্তপ্ত, বললেন, আইন তা হলে সবসময় অপরাধীর দিকেই থাকবে! আর আমরা কেবল ধর্মের লেজ নাড়ব! এই দেশ থেকে যেদিন ধর্ম যাবে সেইদিন থেকে আমরা সুখে থাকব। তা হলে চলল সেই রাসকেলটাকে আগে খুঁজে বের করি। পাড়া-প্রতিবেশীকে ডাকি। ছোটদাদু দাওয়ার একপাশে বসে পড়লেন। হরিশঙ্কর উঠোনে খানিক পায়চারি করে নিলেন সম্রাটের মতো। আমার শরীরে আর কোনও বল নেই। একটা ঠেলা মারলেই পড়ে যাব। সারারাত জেগে, তার ওপর ওই প্রচণ্ড হাঁটা। পায়ের খিল খুলে যাওয়ার মতো অবস্থা। ছোটদাদুর পাশে থপাস করে বসে পড়লুম। জেলিফিশের মতো। আমার ভাইবোনেরা কেউই আমার সঙ্গে কথা বলছে না। সেই কতকাল আগে যখন ছাত্র ছিলুম তখন একবারই দেখা হয়েছিল কলকাতায়। বয়েস তখন খুবই কম। একেবারেই শিশু। তিনজনে করুণ চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। এখন কেউই আর শিশু নয়। বড় বোন কিশোরী। তারপরে সবাই বছরের ব্যবধানে সাজানো। অর্থাৎ মাথায় মাথায়।
হরিশঙ্কর পঁড়িয়ে পড়লেন। ছোটদাদুকে বললেন, তা হলে ব্যাপারটা এই দাঁড়াচ্ছে, আমরা এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁ করে বসে থাকব সেই ধর্মাবতার, সেই মদ্যাবতারের আবির্ভাবের অপেক্ষায়! তিনি এসে কৃপা বর্ষণ করবেন!
পিসিমা বললেন, সে তো এখন সেই বাগদিপাড়ায় তার সেই মেয়েমানুষের ঘরে আছে। বারোটার আগে আসছে না। আসবে তার চেলাচামুণ্ডা নিয়ে। এই উঠোনেই হয়তো ছাগবলি হবে। ওরাই রাঁধবে। গেলাসে গেলাসে মদ ঢালা হবে। তখন আর আমরা ত্রিসীমানায় থাকি না। লাল ঢ্যালা ঢ্যালা চোখ। বিশ্রী গালাগাল। হাত ধরে টানাটানি।
হরিশঙ্কর বললেন, এখানে তোদের আপনার লোক বলে কি কেউ নেই! জ্ঞাত-গুষ্টি সব মরে গেছে? না রাধা এমন ব্যবহার করে গেছে যে কেউই আর তোদের ছায়া মাড়ায় না?
কার অত সাহস আছে ছোড়দা! সকলেই ছেলেপুলে নিয়ে সংসার করে। তুকতাক করে দিলে মুখ দিয়ে রক্ত উঠে মরে যাবে।
হরিশঙ্কর হাঁটুতে চাপড় মেরে বললে, উঃ, দেশটা কী কুসংস্কারে পড়ে আছে! জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্ল্যানিং সব ব্যর্থ। এই অন্ধকারে কিছুই ঢুকতে পারছে না। তা হলে তোদের আর এখানে রেখে লাভ কী?
২.৪৬ Keep your fears to yourself
অদ্ভুত একটা বিষণ্ণ পরিবেশে আমরা থম মেরে বসে রইলুম কিছুক্ষণ। সামনে কোনও পথ নেই। বরাত আর মানুষ, দু’তরফ হাতিয়ার ধরেছে। মেরে পাট করে দেবে। আমার পিসিমা আর বিমর্ষ ভাইবোনদের পাশে নিজেকে অপরাধীর মতো সুখী ও শৌখিন লাগছে। যেমন ড্রেস, সেইরকম। ভোগীর মতো চেহারা আমার। শ্যাম্পু করা চুল। ফুরফুর কপালে খেলছে। পরিষ্কার, দামি জামাকাপড়। শহরের জল আর দুধেল সাবানে রঙের জেল্লা। মনে শহুরে অহংকার। নিজেকে মনে হচ্ছে ত্রাণমন্ত্রী। বিমানে করে বন্যাদুর্গতদের দেখতে এসেছি। কথা বলতে গেলেই গলায় এসে আটকে যাচ্ছে, বক্তৃতার মতো শোনাবে। বন্ধুগণ! কষ্ট করো, ত্যাগ স্বীকার করো। জীবন হল সংগ্রাম। যেমন। বলেন আর কী ক্ষমতার আসনের নেতারা!
হরিশঙ্কর হঠাৎ লাফিয়ে উঠলেন, পেয়ে গেছি। পথ পেয়ে গেছি।
ছোটদাদু বললেন, তোমার পরিষ্কার মাথা। পথ তো পাবেই। জানতে ইচ্ছে করছে।
আমরা ডেকরেটরকে দিয়ে এই উঠোনে একটা প্যান্ডাল করাব। রাইট নাও। এখনই।
তাতে লাভ?
সেই প্যান্ডেলে আমরা বসবাস করব। পুরো বাজারটাকে তুলে এনে, বেশ বড় মাপের রান্নাবান্না খাওয়াদাওয়া লাগিয়ে দোব। ঘোর উৎসব। পালা করে প্রতিবেশীদের নিমন্ত্রণ করব।
কী হবে তাতে?
হিংসেয় জ্বলেপুড়ে যাবে সেই মহাসাধক।
তাতে আমাদের কী মঙ্গল হবে হরিশঙ্কর?
পৃথিবীর দুটো দিক। একটা স্পিরিচুয়াল, অন্যটা মেটিরিয়াল। ইট, কাঠ, বালি, পাথর, চুন, সুরকি, দেহবল, অর্থবল, রূপ, যৌবন, ঐশ্বর্য। আমাদের এই লড়াই সেই তামসিকতার বিরুদ্ধে। এখানে। তামসিক ঐশ্বর্যের স্রোত বইয়ে চোখ ঠিকরে দেব। যেখানেই অর্থ সেখানেই লোভীদের ভিড়। মানুষ তো ঐশ্বর্যের পদানত। ক্ষমতার পদানত। এখানে হরিনাম সংকীর্তনে কোনও কাজ হবে না। টাকা, ক্ষমতা, রাজসিক অহংকার।
তারপর! শেষটা কী হবে?
শেষে আমরা এই তালুক, মৌজা সব কিনে নোব।
অত ঘুরপথে না গিয়ে সরাসরি এখনই সেই শয়তানটাকে ডেকে কিনে ফেলো না।
না, ওকে আমি স্যান্ডউইচ করে মারব। চারপাশ থেকে ঘিরব। মামলায় জড়াব। এখান থেকে উৎখাত করবার জন্যে দাঙ্গা করবে। আমি ইচ্ছে করে আহত হব। মার খাব, ডায়েরি করব, মামলা ইকব। নোকটার শেষ দেখে আমি ছাড়ব। আমি ওর সঙ্গে সাংঘাতিক একটা কনফ্রন্টেশনে যেতে চাই। তার মধ্যে পাওয়ার থাকবে, বুদ্ধি থাকবে, কূটনীতি থাকবে, আইন থাকবে, দাঁচ থাকবে। লোকটাকে একেবারে জেরবার করে মারতে হবে।
মশা মারতে কামান দেগে কোনও লাভ আছে? ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ!
হরিশঙ্কর বড় বড় চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, সাবেক আমলের এইরকম একটা যুক্তিই আমি আশা করেছিলুম। পাশকাটানো পরামর্শ। এইভাবেই আমরা লোজ্জা ক্রিমিনালদের বাড়ার সুযোগ করে দিই। জেনে রাখ মহামানবদের মারতে কয়েক সেকেন্ড লাগে, কারণ এক অর্থে তারা নির্বোধ, তারা মানুষকে বিশ্বাসের ব্ল্যাঙ্ক-চেক দিয়ে রেখেছেন।
