দুজনে মেতে উঠেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আলোচনায়। নেতাজি, আই এন এ, হিটলার, ব্লিৎসক্রিগ। দু’জনের আলোচনা শুনলে মনে হবে, দু’জনে এইমাত্র যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরলেন। দোকানের মালিক তিন-তিনবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন শুনে হরিশঙ্করের ভীষণ দুঃখ। সেইভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি তিনি কেন হতে পারলেন না! বহুবার বহুভাবে চেষ্টা করেছেন। সেই সুযোগ একবারই এসেছিল বেনারসে। ছাত্রজীবনে। কাশীর বাড়ির তিনতলার ছাদে বাঁদরের সঙ্গে যুদ্ধ। একটা নয়, একদল। সুগ্রীব ভার্সাস হরিশঙ্কর। পাথরের সিঁড়ি দিয়ে হরিশঙ্কর আর বানরাধিপ জড়াজড়ি করে গড়াতে গড়াতে সোজা একতলায়। জয়পরাজয়ের মীমাংসা হয়নি রেফারির অভাবে। হরিশঙ্করকে তিন দিন হাসপাতালে কাটাতে হয়েছিল। ফিরে এসেছিলেন নাকের ওপরে কপালের মাঝখানে নিখুঁত অর্ধচন্দ্রাকৃতি একটি ক্ষতচিহ্ন নিয়ে। সেই চিহ্নটি স্থায়ী হয়ে আছে। সকলেই বলেন, শুভ চিহ্ন। শিবের দান।
ভদ্রলোক প্রয়োজনীয় কিছু নির্দেশ দিলেন। আমরা যেখানে যাচ্ছি, সেখানে একটি আশ্রমে আধুনিক থাকার ব্যবস্থা আছে। আমরা ইচ্ছে করলে থাকতে পারি। ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা পথে নামলুম।
পাকা রাস্তার সুখ বেশিক্ষণ সহ্য হল না। নেমে আসতে হল কাঁচা পথে। ধানখেত, গমখেত, আমবাগান। পুকুর। এ দেশ হল পুকুর-থানার দেশ। বেশ কিছুটা হাঁটার পর আমরা এসে গেলুম সেই গ্রামে। অজ গাঁ নয়। বড়মানুষের বসবাস আছে। বেশিরভাগ শিক্ষিত মানুষই কলকাতায় চাকরি করেন। পাকা বাড়ির সংখ্যা কম নয়। বড় স্কুল, হাসপাতাল আছে।
রাধাবিনোদবাবুর বাড়ি বলতে সকলেই চিনতে পারলেন। সুপুরুষ আলাপী মানুষ ছিলেন তিনি। উপকারী, দাতা। তবে? এই তবেটাই মারাত্মক। ছোট ভাইটা একটা জানোয়ার। যাবতীয় বদগুণের অধিকারী। কালীসাধকের ভেকধারী অকৃত্রিম এক শয়তান। বিয়ে করেননি। একজন ভৈরবী আছেন। সেই ভৈরবীই ওঠ-বোস করায়। সে দৃশ্য জীবনে ভোলার নয়। মানুষের হাতে মানুষের নির্যাতন। একটা উঠোন। উঠোন পেরিয়ে দাওয়া। চারজন প্রাণী হতাশ হয়ে বসে আছে। ছোট ছোট দুটি মেয়ে একটি ছেলে আর আমার পিসিমা। পিসিমার মাথায় পুরু একটা ব্যান্ডেজ। চারজন বসে আছেন, যাঁদের কাছে সবদিনই একরকম। কোনও আশার বাণী বহন করে আনে না। শুধু যন্ত্রণাই। যন্ত্রণারই রকমফের।
পিসিমা আমাদের দেখে তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলেন, ছোড়দা তোমরা? ছোটমামা তুমিও এসেছ? পিসিমাকে অবিকল শ্ৰীশ্ৰীসারদামায়ের মতো দেখতে।
ছোটদাদু বললেন, আশা, মাথাটা ফাটালি কী করে?
আমাদের আগমন যেন ভোরের সূর্যের আলো। সেই আলো খেলছে আমার পিসিমার মুখে। কোনও উত্তর নেই। নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন। ইতস্তত করছেন। বড়মেয়ে জবাব দিল, ওই জানোয়ারটা চেলা কাঠ মেরে মায়ের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। সাতটা সেলাই পড়েছে।
পিসিমা মেয়েকে ধমক দিলেন, ছিঃ, কাকাকে জানোয়ার বলতে নেই কাঁদু।
না, বলবে না! মেয়ে যেন মা দুর্গা! কথায় সাংঘাতিক তেজ।
হরিশঙ্কর দপ করে উঠলেন, কোথায় সেই সোয়াইন? আমি আজ কীচক বধ করব।
ছোটদাদু বললেন, অতটা উত্তেজিত হোসনি। মাথা ঠান্ডা রাখ। আগে দেখতে হচ্ছে ওর শক্তি কতটা? দলবল কতটা ভারী?
হরিশঙ্কর বললেন, দল! যে নারীর গায়ে হাত তোলে সে কাওয়ার্ড। তার দলে যদি একশোজনও থাকে, মেরে ছাতু করে দেব। সে শক্তি আমার আছে। আই ক্যান ফাঁইট।
ছোটদাদু বললেন, আমি জানি তুমি তা পারো। তবে আমাদের আইনের কথা ভাবতে হবে। ফৌজদারি মামলায় জড়িয়ে পড়লে চলবে না।
মামলা? এই মাথা ফাটানোর মামলা হবে না? তাকে তো এখনই অ্যারেস্ট করানো যায়।
না, যায় না। এখন আর যায় না। কারণ সঙ্গে সঙ্গে থানায় ডায়েরি করা হয়নি। তা ছাড়া এটা তার এলাকা। সাক্ষীসাবুদের প্রশ্ন আছে। হঠকারিতায় ফল ভাল হবে না। ব্যাপারটা আমার হাতে ছেড়ে দে।
তুই কী করবি? লবঙ্গ খাওয়াবি? কুলকুণ্ডলিনী জাগাবি?
কী করব তা জানি না। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।
শোন, ধর্ম হল শৌখিন জিনিস। ফুল বেলপাতায় শয়তান সন্তুষ্ট হয় না। শয়তানের প্রয়োজন বেধড়ক ধোলাই।
প্রয়োজন হলে তাই হবে। তার আগে ভাবা দরকার আমাদের প্ল্যানটা কী? আমরা এখানে এসেছি কী কারণে?
এসেছি আমার বোনকে উদ্ধার করতে।
এই তো সামনেই দাঁড়িয়ে আছে, উদ্ধার করো।
তার আগে এই মারের আমি বদলা নোব। হরিশঙ্করের একটাই মন্ত্র, টিট ফর ট্যাট।
উত্তেজনায় তুই ভুলে গেছিস, আশাকে আমরা এখানে প্রতিষ্ঠিত করতে এসেছি। ওর বিষয়সম্পত্তি পাওনাগণ্ডা আমরা বুঝে নিতে এসেছি।
পিসিমা বললেন, সে তো আর হবার উপায় নেই ছোটমামা। সবই তো সই করিয়ে নিয়েছে।
কে সই করেছে?
এদের বাবা।
হরিশঙ্কর বললেন, তা হলে তো হয়েই গেছে। ফিনিশড্।
ছোটদাদু বললেন, তোরা দাওয়ায় বসে আছিস? ঘরে তালা? ব্যাপারটা কী?
কাল রাতে মেরে বের করে দিয়েছে আমাদের। ঘরে ঢুকতে দেবে না।
হরিশঙ্কর বললেন, তোদের জিনিসপত্তর?
পিসিমা করুণ হেসে বললেন, কী-ই বা আছে ছোড়দা! যা আছে সব ওই ঘরে বন্ধ।
সারারাত এইখানে আছিস?
কী করব ছোড়দা? আর তো কোনও উপায় নেই।
গ্রামের আর সব মানুষ কি মরে গেছে?
তাদের হাত করে ফেলেছে। সবাই ভয় পায়। তন্ত্রমন্ত্র তুকতাক করে তো, হাতে খাঁড়া নিয়ে। ঘোরে।
