হরিশঙ্কর গলাটাকে সামান্য বিকৃত করে বললেন, ভালবাসা, প্রেম, বিশ্বপ্রেম, অমৃতস্য পুত্রাঃ! লিভিং ইন এ ফুলস প্যারাডাইস। পণ্ডিতমশাই ঠিকই বলেছেন, পৃথিবীটা শয়তানের। মশা-মাছির মতো মহামানব মরেন, মহাত্মা গান্ধি, লিঙ্কন, মার্টিন লুথার। শ্রীচৈতন্যকে সমুদ্রে ঠেলে ফেলে দিলে, না জীবন্ত পাঁচিল তুলে দিলে আনারকলির মতো, সে রহস্য আজও রহস্য। অত প্রেম! যিশুখ্রিস্টকে কোলে করে ক্রুশে তুলে দিলে তোমার এই মানুষ শয়তানের দল! বিদ্যাসাগরের গায়ে কাদা ছেটালে। নন্দকুমারের গলায় ফাঁসির দড়ি লটকে দিয়ে এল এক ব্রাহ্মণ। মশা মারা খুবই কঠিন কাজ রে! মশারাই থাকে, সহজে নির্মূল হয় না। তোর আর আমার রক্তেই তাদের প্রজনন, বংশবৃদ্ধি। ঝাকে ঝাকে এই মশাটিকে মারার জন্যে আমি সর্বশক্তি নিয়োগ করব। আমার এক ফোঁটা রক্ত ইজ ইকুইভ্যালেন্ট টু হিজ ওয়ান বাকেট। এই জেলার এই মাটিতে আমি একটা ইতিহাস সৃষ্টি করে যাব। ফর এজেস টু কাম, মানুষ মনে রাখবে নারী হল শক্তি। শক্তির অপমানে নির্যাতনে ধ্বংস হতে হয়। একথা তোমার শাস্ত্রে আছে। শাস্ত্রেই আছে, হয় না কিছুই। নির্বিচারে নারী-নির্যাতন হয়েই চলেছে। ভাগ্য নিয়ে দেহ নিয়ে খেলা। সেই শাস্ত্রবাক্যের একটা উদাহরণ আমি রেখে যাব। মুরগির মতো সেই জানোয়ারের পালক ছাড়াব। হরিশঙ্কর এখন বিষধর কেউটে। সেই কেউটের লেজে পা পড়েছে।
অশান্ত হরিশঙ্কর পায়চারি শুরু করলেন আবার। ব্যায়াম করা চকচকে শরীর ফুলে উঠেছে। বাঘের মতো বিক্রম। এ সেই ছেচল্লিশের দাঙ্গার সময়ের চেহারা। রাত বারোটার সময় আমাদের পাড়া আক্রান্ত হল। হাতে একটা শোর্ড নিয়ে হরিশঙ্কর বেরিয়ে এলেন। সেইসময় তিনি ডুমার বই খুব পড়ছেন, থ্রি মাস্কেটিয়ার্স, কাউন্ট অফ মন্টিক্রিস্টো, ব্ল্যাক টিউলিপ। সেই শোর্ড ফাঁইটের সুযোগ সেদিন এসেছিল। নেতৃত্ব দেওয়ার কী ক্ষমতা! সমস্ত পাড়া তার পেছনে। ক্লাবের ছেলেরা। হাতে হারোয়া খেলার লাঠি। মরচে-ধরা তরোয়াল। ঘরে ঘরে নারীবাহিনী বঁটি কাটারি হাতে প্রস্তুত। তেমন প্রয়োজন হলে জহরব্রতের জন্যে টিন টিন কেরোসিন মজুত। হরিশঙ্করের নিজের তৈরি মলোটভ ককটেল। বাংলায় বোতল বোমা। স্বদেশি চেতনায় সবাই টগবগ করছে। ইংরেজ দ্বিজাতিতত্ত্বর তরোয়াল চালিয়ে দেশ টুকরো করতে চাইছে। যারা এতকাল পাশাপাশি বসবাস করে এসেছে বন্ধুর মতো, তারাই ধর্মের দোহাই পেড়ে ছুরি ধরেছে। কলকাতায় এক ধর্মের মানুষ স্লোগান দিচ্ছে ঠোঁট মে বিড়ি, মু মে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান।
সেই হরিশঙ্কর আজ বেরিয়ে এসেছেন আবার বাঁকুড়ার মাটিতে। এবার তার স্ট্র্যাটেজি ভিন্ন। ধর্মের নামে কত অধর্ম তিনি দেখেছেন। ধর্মের নামে ব্যভিচার তিনি দেখেছেন। দেখেছেন সাধুর ক্ষমতার লড়াই। দেখেছেন আশ্রমে ভোগের জীবন। দেখেছেন ধনীর খাতির, গরিবের প্রতি অবহেলা, দুঃসহ ঘৃণা। যে কারণে তিনি গুরু গ্রহণ করেননি। পাহাড়ে গেছেন, জঙ্গলে গেছেন, কখনও কোনও আশ্রমে যাননি। কখনও কখনও এই সাধক ছোটমামাকে গুরু হিসেবে মেনেছেন। দীক্ষা গ্রহণ করেননি। অভিমত, কানে ফুসমন্তরে ধার্মিক হওয়া যায় না। ধর্ম মনে গ্রহণ করতে হয়। সেটা একটা টোটাল প্রসেস। কমপ্লিট রূপান্তর। বাঘকে হরিণ হতে হবে। খাদককে হতে হবে খাদ্য। দস্যুকে হতে হবে প্রেমিক। অর্ধমানব অর্ধদানব হলে হবে না।
সেই অশান্ত হরিশঙ্কর সামনে ঘুরপাক খাচ্ছেন। প্রশান্ত ছোটদাদু বসে আছেন ছোটখাটো একটা টিলার মতো। অচঞ্চল। হরিশঙ্কর আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, তা হলে তোমরা আমাকে কেউ সমর্থন করছ না? একলা চলো রে! তাই তো! ছোটদাদু মৃদু হেসে বললেন, ঠিক তা নয়। নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে আছি তোর শান্ত হওয়ার অপেক্ষায়। তোর চিন্তা, বোধ, বুদ্ধি সব আচ্ছন্ন হয়ে আছে এই মুহূর্তে। এই ধোঁয়াটা কেটে গেলেই তুই দেখতে পাবি, তোর পথটা কত জটিল। সময় অর্থ শ্রমের অপচয়। তখন তোর মাথা থেকেই অন্য পথ বেরোবে। যা স্বাভাবিক, যুক্তিপূর্ণ।
হরিশঙ্কর কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে বললেন, আমাদের স্বার্থপরতাই এই পরিবারটাকে অস্তিত্বের শেষ সীমায় নিয়ে গেছে। কখনও সেভাবে খবর নেওয়া হয়নি। বছরে দু-চারটে পোস্টকার্ড চালাচালি। আশা করি ঈশ্বরের কৃপায় সকলে কুশলে আছে। প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাই। উত্তরের অপেক্ষায় রইলুম। হয়ে গেল। কর্তব্য শেষ। পাহাড়ে যাই, সমুদ্রে যাই, লুচি মোহনভোগ খাই। দামোদর পেরিয়ে বোনকে দেখতে আসি না। বিয়ে হয়ে গেছে, আর তার খবর রাখার প্রয়োজন কী? মরল না বাঁচল!
পিসিমা ঝেড়েঝুড়ে উঠে দাঁড়ালেন, ছোড়দা শান্ত হও। ভাগ্য মানতেই হবে। চিরটা কালই তো আমার এইভাবেই কাটছে। তুমি কী করবে! যার সঙ্গে বিয়ে হল, তিনি তো খারাপ ছিলেন না। অসুখেই সব শেষ করে দিলে। ভগবান যাকে মারবেন, মানুষ তার কী করবে! আমি জল আনি, তোমরা হাত-পা ধোও। আমি চা জলখাবারের ব্যবস্থা করি।
হরিশঙ্কর বললেন, সেটা কীভাবে সম্ভব হবে! তোর তো কিছুই নেই। শ্মশানে বসে আছিস ধূমাবতী হয়ে।
তিন দিন আগে গলার চেন বাঁধা রেখে কিছু টাকার জোগাড় করেছিলুম তোমার কাছে যাব বলে। মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে যাই কী করে! তাই অপেক্ষা করছিলুম। এখন তোমরা এসে গেছ, আর ভয় কী! নতুন হাঁড়িতে ভাতেভাত চাপাই। দেখি ঘি পাওয়া যায় কি না! চা চিনি কিনে আনি।
