হরিশঙ্কর প্রায় ছুটে পালিয়ে গেলেন। সাঁওতাল চারজন আমাদের গ্রাহ্যই করল না। একপাশে একটা বাঁশি পড়ে আছে, অদুরেই শুয়ে আছে শ্রান্ত তিরধনুক। সংগীত, হিংসা, ক্ষুধা, অগ্নি, সম্পূর্ণ এক জীবনদর্শন। সেই দর্শনে আতঙ্কিত হরিশঙ্কর বুদ্ধের মতো পলাতক।
ভোর হয়ে আসছে। গাছের পাতায় সামান্য সামান্য রুপোলি আলোর হেঁয়া, যেন রাতের কেশপাশে দিনের বার্ধক্যের স্পর্শ। টিট টিট করে একটা পাখি দামি ঘড়ির অ্যালার্মের মতো বেজেই থেমে গেল।
ছোটদাদু আবার হরিশঙ্করের পাশে চলে গেছেন। দু’জনের বাক্যালাপ কানে আসছে। পায়ের তলায় শুকনো পাতার মচমচ শব্দ।
ছোটদাদু: ছুটে পালিয়ে এলি!
হরিশঙ্কর: সহ্য করা শক্ত। ন্যাচারাল ডেথ স্ট্যান্ড করা যায়, হত্যা অসহ্য। খরগোশ, পাখি, প্রজাপতি, আমার প্রিয় প্রাণী।
ছোটদাদু: জীবই তো জীবের আহার।
হরিশঙ্কর: এ হল মানুষের কথা। মানুষের সব কথাই মানুষের নিজের স্বার্থে।
ঘোটদাদু: আহা! দর্শন থেকেই তো দর্শন।
হরিশঙ্কর: ঠিকই। কিলার্স ফিলোজফি। একদল বুদ্ধিমান, লোভী, ক্ষুধার্ত মানুষ জ্ঞানের কথা ধর্মের কথা দর্শনের কথা বলছে। সবই আপেক্ষিক, রিলেটিভ, সেলফিশ। কোনওটাই আমি বিশ্বাস করি না। নিজের কোলে ঝোলটানা কথা। সময়ের লাইব্রেরিতে ভাবনার সেলফ, দর্শনের পাখির বাসা, উড়ে গিয়ে বসলেই হল। আশ্রয়ের অভাব নেই। খুনিরও যুক্তির অভাব নেই। বুদ্ধই আমার আশ্রয়। নিরীশ্বরবাদী। বুদ্ধ কী বলছেন শোন।
হরিশঙ্কর নিমেষে এক ভাবলোকে চলে গেলেন। বিশাল বিশাল গাছ। মাথায় ভোরের আলো ধরেছে। অন্ধকার চুঁইয়ে চুঁইয়ে নীচে নামছে। ঝিঁঝির কলরোল। পাখির টুইট টুইট। ধ্রুপদের মতো একটা পরিবেশ। হরিশঙ্কর বলছেন, জন্ম এক যন্ত্রণা, ক্ষয় এক যন্ত্রণা, রোগ এক যন্ত্রণা, মৃত্যুও এক যন্ত্রণা, দুঃখ, শোক, কাতরতা, বিলাপ, হতাশা, শুধু যন্ত্রণা আর যন্ত্রণা। যা পছন্দ করি না তার মধ্যে পড়ে থাকা যন্ত্রণা, যা পছন্দ করি তার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াও এক যন্ত্রণা। যা পেতে চাই তা না পাওয়া এক যন্ত্রণা, এই দেহ, পঞ্চভূতের এই পিণ্ড যা শুধু ভোগ করতে চায়, সব যন্ত্রণার উৎস এই। দেহ। তার আবার জীবনদর্শন! দর্শনের কথা আমাকে বলিসনি। যন্ত্রণার কথা বল, বল দুঃখের কথা।
ছোটদাদু প্রসঙ্গ থেকে সরে গেলেন। বললেন, ভোর হল। বেশ তাজা লাগছে। ভোরের ফোঁটা ফুলের মতো। একটা অভাব বোধ করছি, এইসময় এক কাপ গরম চা পেলে বেশ হত।
চল, সামনেই গ্রাম, কিছু মেলে কিনা দেখি।
গরম জিলিপি আর মোটা চা।
আমরা তরতর করে এগিয়ে চললুম। সিনেমা শেষ হওয়ার মতো ঝপ করে জঙ্গল শেষ হয়ে গেল। বিশাল একটা ডাঙা। কোথা থেকে শীর্ণ একটা নদী জেগে উঠেছে। অপূর্ব দৃশ্য। রুপোর মতো আলো। ছোটদাদু মিছরির মতো মিষ্টিগলায় গেয়ে উঠলেন, তব চরণ ধোয়াবে শারদ-শিশির, শেফালি অর্ঘ্য দেবে/ ধরণী শ্যামল আসন বিছাবে, তুমি আসিবে যবে/ রক্ত ঊষাতে সিন্দুরের টিপ পরাবে মা তোর ভালে/ চাঁদিমা আরতি দিয়ে যাবে মাগো সুনীল গগন-তলে ॥ কত শতশত কমল কুমারী তোমারে পূজিতে চাহে। দিকে দিকে তব আগমন-গীতি দোয়েল শ্যামা গাহে ॥
হরিশঙ্করের রাত-জাগা সাত্ত্বিক মুখে অদ্ভুত একটা ভাব খেলা করছে। বিশাল প্রান্তর, শীর্ণ নদী, ভিজে ঘাস আর ওই গান। স্বাভাবিক জগতের। ভেতর থেকে আর একটা অন্য জগৎ বেরিয়ে এল। গানটা যেন ঠিক এই পরিবেশে এই সময়ে গাইবার জন্যেই রচিত হয়েছিল। ভৈরবীর মন কেমন করানো সুরে। জীবনের সব ভোর যদি এইভাবেই হত!
একটা কাজ করা যাক, নদীর জলে মুখ ধুয়ে নেওয়া যাক। হরিশঙ্কর বললেন।
ছোটদাদু বললেন, প্রকৃতির বড় কাজ কি সারার প্রয়োজন আছে কারও?
হরিশঙ্কর বললেন, আমার ডাক আসেনি।
ছোটদাদু আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার?
ফাঁকা মাঠে প্রকৃতির ডাক? অসম্ভব ব্যাপার। ভাবাই যায় না। আমরা নদীর কিনারে চলে এলুম। টলটলে জল। অসম্ভব ঠান্ডা। দূর আকাশে ধূসর হয়ে আছে শুশুনিয়া। চানটা করে নিতে পারলে মন্দ হত না। ছোটখাটো একটা আলোচনাও হল। অবশেষে সিদ্ধান্ত হল, অতটা সময় দেওয়া যাবে না। লটঘট ব্যাপার। এইবার আমাদের এগোতে হবে মিলিটারি কায়দায়, দ্রুত পায়ে। মনে রাখতে হবে, আমরা চলেছি একটা পরিবারকে উদ্ধার করতে। বেড়াবার বিলাসিতা করতে নয়।
ডাঙাটা পেরিয়ে আসতেই একটা গ্রাম পাওয়া গেল। একটু শ্রীহীন। গাছের তলায় উনুন। উনুনে সাতসকালেই গুড় জ্বাল দিচ্ছে একদল নারী-পুরুষ। তালের গুড় তৈরি হচ্ছে। জায়গাটা পেরিয়ে এসে আমরা একটা পিচের রাস্তায় উঠলুম। হেলেদুলে কাঁচকোঁচ শব্দে একটা গোরুর গাড়ি। চলেছে। মনে হয় একটু পরেই গঞ্জের মতো কোনও জায়গা পাওয়া যেতে পারে। পাকা বাড়ি দেখতে পাচ্ছি। একটা ফুটবল খেলার মাঠ। উচ্চ বিদ্যালয়। সাইকেল আরোহী। সরকারি দপ্তর।
দোকানও পাওয়া গেল। পাওয়া গেল গরম জিলিপি আর মোটা চা।
ছোটদাদু বললেন, জিলিপি কিন্তু জোলাপের কাজ করে। সেই বুঝে খেয়ো।
হরিশঙ্কর বললেন, জিলিপির লোভ আমার নেই। চা হলেই হবে।
ছোটদাদু বললেন, এনার্জির জন্যে প্রয়োজন। সারারাত আমরা হেঁটেছি। রেলের ইঞ্জিন হলে এতক্ষণে কতটা কয়লা খেত!
বাইরে খাওয়া হরিশঙ্কর একেবারে পছন্দ করেন না, কিন্তু উপায় নেই। সেই জিলিপি আর চা। বাবু-খদ্দের দেখে দোকানদারের খুব খাতির। গরমজলে তিন-তিনবার গেলাস ধোয়া হয়ে গেল। বেশ মজবুত চা এসে গেল। পাকা রাস্তা গঞ্জের বুক ফেঁড়ে দৌড় মেরেছে বিহারের দিকে। তারই পাশে এই দোকান। বেশ পরিচ্ছন্ন। দোকানের মালিক একসময় সেনাবাহিনীতে ছিলেন। হরিশঙ্করের সঙ্গে জমে গেল খুব। শ্রম, নিষ্ঠা, নিয়মানুবর্তিতা, এই তিন হল মন্ত্র। পৃথিবীতে কেউ কারও নয়। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারা যেমন অদৃশ্য আকর্ষণে ঘুরছে, মানুষ মানুষের চারপাশে ঘুরছে স্বার্থের টানে। যতক্ষণ স্বার্থ ততক্ষণই প্রেম, প্রীতি, ভালবাসা। স্বার্থ ফুরোলেই তুমি কে? কে তোমার! বিবেক আর কর্তব্য ভুলো না। প্রত্যাশায় জলাঞ্জলি। সুখের চাবিকাঠি।
