হরিশঙ্কর হঠাৎ থেমে পড়ে হাসতে লাগলেন।
ছোটদাদু জিজ্ঞেস করলেন, হাসির কারণ?
উলটোটা যদি হয়!
মানে?
আমাদেরই ডাকাত ভেবে গ্রামের লোক যদি পেটায়!
হুঁ, কথাটা তুই মন্দ বলিসনি। সে সম্ভাবনা অবশ্যই আছে।
তার মানে, ডবল রিস্ক। ডাকাতেও মারতে পারে, গ্রামের লোকও পেটাতে পারে। কিন্তু এতটা পথ চলে এলুম, এখনও একেবারেই নিরামিষ। ভেবেছিলুম ফাঁকা মাঠে অন্তত একটা ভূতও দেখতে পাব। সাধারণত খেজুরগাছের তলায় দর্শন হয়। সাদা কাপড় পরা মেয়েছেলে।
তোকে আমি বলিনি, এক-একবার আমরা চারজন হয়েছি। চতুর্থজন কে আমি বলতে পারব না। ঘাড় ঘোরালেই অদৃশ্য। এইবার বুঝে নে।
আমার বুক ঢিপঢিপ। পৃথিবীর যতরকম ভয় আছে সবই আমার আছে। কী পাল্লায় পড়া গেল! একজন ডাকাত হ্যান্ডল করবেন, আর একজন ভূত নাচাবেন। এইবার আমরা গভীরতর জঙ্গলে ঢুকলুম। হরিশঙ্করের কী আনন্দ! এই হল মানুষটির চরিত্রের অনন্য এক দিক। যত বিপদ তত আনন্দ। বল্লভভাই বলেছিলেন, ডেঞ্জার ইজ দি ব্রেদ অফ মাই লাইফ। এই আর একজন তার দোসর। আমাদের সামনে হাতে একটা গাছের শুকনো ডাল নিয়ে নেচে নেচে চলেছেন।
ছোটদাদু বললেন, আমি যখন টেররিস্টের দলে ছিলুম স্বদেশি আন্দোলনের সময়, তখন এই জঙ্গলে তিনটে রাত কাটিয়েছিলুম। তখন বুঝেছিলুম, বিদেশি পুলিশের চেয়েও মারাত্মক হল দিশি মশা। এই জঙ্গলের ভেতরেও একটা ধ্বংসাবশেষ আছে। সেইটাই হয়েছিল আমাদের আশ্রয়। বাড়িটার চারপাশ ভেঙে গেলেও মাঝখানটা আস্ত ছিল। সাদা পাথরের মেঝে। অবাক কাণ্ড, ছোট্ট একটা ঘরে এক দেবীমূর্তি, সিংহবাহিনী। মনের আনন্দে তিন দিন পুজো করলুম। বহু দূরে একটা আগুন দেখা গেল। হরিশঙ্কর বললেন, যাক মনোবাসনা পূর্ণ হল। ডাকাতে আগুন পোহাচ্ছে, এইবার আমাদের জীবনে একটা নতুন অভিজ্ঞতা হবে। নিজেদের একটু প্রস্তুত করে নাও।
২.৪৫ কোথায় পালাবে তুমি
হরিশঙ্কর হনহন করে এগোচ্ছেন। ডাকাতদের সভা তাকে টানছে। একটা অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেয়েছেন। আমাকে প্রায়ই বলেন, নিজেকে বিপদের মধ্যে ফেলবে, কষ্টের মধ্যে ফেলবে, ঝুঁকি নেবে, বেরিয়ে আসবে লড়াই করে। একটু ক্ষতবিক্ষত হবে, হয়তো মরতে মরতে বেঁচে যাবে; কিন্তু বাঁচাটা শিখবে। পাখির মা বাচ্চাকে ওড়া শেখায়, দেখেছ নিশ্চয়? ডানার জোর নেই, কাক তাড়া করছে, পাখি উড়তে শিখছে। একটা-দুটো মরেও যেতে পারে। তবু এইটাই নিয়ম। বিপদের চেয়ে বড় শিক্ষক কেউ নেই। আলতো জীবন ওয়ার্থলেস জীবন। লিভ লাইক এ হিরো। স্বামী বিবেকানন্দের ওই ছবিটা দেখেছ? বুকে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন বীর সন্ন্যাসী। জীবনের সামনে ওই হল জীবনের দাঁড়াবার ভঙ্গি দৃপ্ত, বেপরোয়া। লক্ষ লক্ষ ছায়ার শরীর! দুঃখরাশি জগতে ছড়ায়,/নাচে তারা উন্মাদ তাণ্ডবে; মৃত্যুরূপা মা আমার আয়!/করালি! করাল তোর নাম, মৃত্যু তোর নিশ্বাসে প্রশ্বাসে তোর ভীম চরণ-নিক্ষেপ প্রতিপদে ব্রহ্মাণ্ড বিনাশে!/ কালী, তুই প্রলয়রূপিণী, আয় মা গো আয় মোর পাশে।/ সাহসে যে দুঃখ দৈন্য চায়, মৃত্যুরে যে বাঁধে বাহুপাশে,/কাল-নৃত্য করে উপভোগ, মাতৃরূপা তারি কাছে আসে।
সন্ন্যাসী হবার প্রয়োজন নেই, সাহসী হও। হরিশঙ্কর রবীন্দ্রনাথের গলায় গাইতে লাগলেন, ভয় হতে তব অভয়মাঝে নূতন জনম দাও হে ॥ দীনতা হতে অক্ষয় ধনে, সংশয় হতে সত্যসদনে জড়তা হতে নবীন জীবনে নূতন জনম দাও হে । হরিশঙ্কর যা বিশ্বাস করেন, তা প্রতিফলিত করেন নিজের জীবনে। আমি তা পারি না। এক ধাতুতে গড়া হরিশঙ্কর, ছোটদাদু সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ধাতুতে।
ছোটদাদু আমাকে ছেড়ে জোর কদমে হরিশঙ্করকে ধরে ফেললেন। আমি একটু পেছনে। চিরটাকালই আমি একটু গদাইলশকর ধরনের। খুব জোরে হাঁটতে পারি না। ভূত আর ডাকাতের ভয়ে চেষ্টা করছি যতটা সম্ভব জোরে হাঁটার। তবু হাত দুয়েকের ব্যবধান। ভেতরটা হাঁকপাক করছে। স্বপ্নেও আমার একই অবস্থা হয়। ভয়ের পরিবেশে সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমি দৌড়োনার চেষ্টা করছি, কিন্তু পা চলছে না। শেষে হামাগুড়ি দিয়ে এগোবার চেষ্টা করছি চতুষ্পদ প্রাণীর মতো। তাও পারছি না। শেষে কান্না। আর তখনই ঘুম ভেঙে যায়। বিছানায় পড়ে থাকে পাথরের মতো ভারী একটা শরীর।
দুজনের বাক্যালাপ কানে আসছে।
ছোটদাদু: ডাকাতদের কী বলে সম্ভাষণ করবি? গুড মর্নিং।
হরিশঙ্কর: অবশ্যই। সেইটাই তো ফর্মালিটি।
ছোটদাদু: কিছু নজরানা দিবি নাকি?
হরিশঙ্কর: ইনসাল্ট করা হবে। ডাকাতরা গ্রহণ করে না, কেড়ে নেয়। যার যা ধর্ম। সামনে গিয়ে দাঁড়াব। হকচকিয়ে যাবে। না চাইতেই শিকার।
ছোটদাদু: তারপর কী হবে?
হরিশঙ্কর: তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। হয় ঝটপটি, না হয় বন্ধুত্ব।
দেখা গেল চারজন সাঁওতাল শুকনো পাতায় আগুন জ্বেলে কী একটা পোড়াচ্ছে। হরিশঙ্কর ভয়ংকর হতাশ হলেন। আগুনে ঝলসাচ্ছে বুনো একটা খরগোশ। ব্রেকফাস্টের আয়োজন। দৃশ্যটা সহ্য করতে পারলেন না হরিশঙ্কর। মনে হল, পারলে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু নিজেই সিদ্ধান্তে এলেন– খরগোশ ইজ ডেড বাই দিস টাইম। সাদা ধবধবে একটা খরগোশ, গোল গোল উজ্জ্বল। দুটো লাল চোখ, সৃষ্টির সৌন্দর্যশালার শ্রেষ্ঠ নিদর্শনের একটি, লাল আগুনে ঝলসে কালো।
