ছোটদাদু বললেন, শব্দটার সঙ্গে পরিচয় নেই, তাই না!
আগে শুনিনি।
একসঙ্গে অনেক শজারু নাচছে কোথাও। রাতেরবেলা ওদের খুব আনন্দ হয়।
হরিশঙ্কর বলেন, দৃশ্যটা দেখে গেলে হত।
ছেড়ে দে, বিনা নিমন্ত্রণে না যাওয়াটাই ভাল।
আমরা হাঁটছি। একটা ভারী বাতাস বইছে। কষাকষা গন্ধ। জঙ্গলে কত গাছ! কোন গাছের কী গন্ধ। বলা কঠিন। আমাদের হাঁটার গতি একটু কমেছে। ইতিহাস আমাদের ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। হঠাৎ ভীষণ একটা পচা গন্ধ এল নাকে।
ছোটদাদু বললেন, মেরেটেরে এনে ফেলে রেখে গেছে। পচা মড়ার গন্ধ।
জায়গাটা আমরা পেরিয়ে এলুম। জঙ্গল কমে আসছে। সামনেই একটা গ্রাম। মাঝরাতে ঘুমিয়ে আছে। ছোট্ট একটা মন্দির। মাথায় একটা সাদা পতাকা উড়ছে। একটা পথ মাঠের ওপর দিয়ে গ্রামের দিকে চলে গেছে। চালা বাড়ি জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঝুপুর ঝাপুর আমগাছ। খেজুরগাছ। মন্দিরটা আমাদের পাশেই পড়ল। সিমেন্ট বাঁধানো ছোট্ট লাল চাতাল। টগর কলকে আর জবা গাছ। মাঝরাতেই ফুল ফুটিয়ে বসে আছে।
ছোটদাদু বললেন, মিনিট পনেরো বসে গেলে কেমন হয়! জায়গাটা ভারী মিষ্টি। যে-ই করুক তার টেস্ট আছে।
হরিশঙ্কর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ঘড়িতে কটা বাজছে?
কবজির দিকে তাকিয়ে ভেতরটা ঘঁত করে উঠল। ঘড়িটা নেই। কোথায় গেল ঘড়ি! ভাববার চেষ্টা করলুম। হাতেই তো ছিল। সুইশ ঘড়ি। ওই নামের ঘড়ি আর বাজারে পাওয়া যায় না। এভার হার্ড। সোনার ঘড়ি। জ্যাঠামশাই আমাকে দিয়েছিলেন। মিষ্টি রঙের ডায়াল। সোনার কাঁটা। অপ্রচলিত গড়ন। পিতা হরিশঙ্কর হাতঘড়ি ব্যবহার করেন না। বাবু বাবু দেখায় বলে।
হরিশঙ্কর বললেন, কী হল? দেখতে পাচ্ছ না?
ভয়ে গলা শুকিয়ে গেছে। কোনওরকমে বললুম, ঘড়িটা দেখতে পাচ্ছি না।
সময় দেখতে পাচ্ছ না, না ঘড়িটাই দেখতে পাচ্ছ না!
আজ্ঞে, ঘড়িটাই দেখতে পাচ্ছি না।
তার মানে, মোহনের ওখানেই ফেলে চলে এলে!
মনে হচ্ছে পরেছিলুম।
এখন এই মুহূর্তে কী মনে হচ্ছে!
মনে হচ্ছে, ছোটদাদু আমার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসছিলেন, সেইসময় যদি ব্যান্ড ছিঁড়ে পড়ে গিয়ে থাকে।
ছোটদাদু বললেন, ঘড়ি কি তুমি আজকাল ডান হাতে পরছ? তোমার ডান হাতই তো আমি ধরেছিলুম। তন্ত্রে নির্দেশ আছে কারওকে সঙ্গে নিয়ে বেরোতে হলে, ডান হাত ধরে বাঁ পা আগে ফেলতে হয়। এর ব্যতিক্রম তো হবার কথা নয়। ঘড়িটা তুমি ফেলেই এসেছ।
হরিশঙ্কর আর দ্বিতীয় কথা বললেন না। কোনও হাহাকার নেই, হায় হায় নেই। গেলে গেছে। পাওয়া গেলে পাওয়া যাবে। আপন মনে হাঁটতে শুরু করলেন। পথের মন্দির পেছনে পড়ে রইল। আমি আর ছোটদাদু পাশাপাশি হাঁটছি। ঘড়ি হারাবার বেদনায় অতিশয় কাতর, যেন ঘড়িটার জন্যেই বেঁচে ছিলুম এতকাল। কত স্মৃতি! দামও যথেষ্ট। ঘড়ি তো গেলই, সঙ্গে চলে গেল জ্যাঠামশাইয়ের স্মৃতি।
ছোটদাদু বললেন, খুব মন খারাপ?
ঘড়িটা তো খুবই দামি ছিল। সোনার বডি। কোম্পানিও উঠে গেছে। কত সাবধানে ব্যবহার করতুম! অ্যাকিউরেট টাইম দিত।
তুমি কতক্ষণ বেহুঁশ ছিলে?
বেহুঁশ মানে?
মানে নাগরদোলায় চড়লে। দু’পাক মারলে। চিনেবাদাম কিনলে। কদমতলায় কাঠের চাকার ওপর বসলে। তারপর হুশ হারালে। এই অবস্থায় কতক্ষণ কাটালে?
ছাত্রজীবনে প্রথম সিগারেট খেয়ে ধরা পড়ে যাওয়ার পর যে অবস্থা হয়, আমার সেই অবস্থা। ছোটদাদু জিজ্ঞেস করছেন, তখন তোমার হাতঘড়ি ছিল?
খেয়াল নেই দাদু।
কী করে থাকবে? তুমি তো সম্মোহিত ছিলে। তোমার হাতে ঘড়ি ছিল না। তুমি কী খেয়েছ মনে আছে?
না।
তুমি একটা ভয়ংকর পাল্লায় পড়েছিলে। তোমার জন্যেই ছিটকে বেরিয়ে আসতে হল আমাকে। এই দেখো, তোমার ঘড়ি আমার পকেটে।
ছোটদাদু ঘড়িটা বের করে আমার হাতে দিলেন। হারিয়ে পাওয়ার কী আনন্দ! সবচেয়ে প্রিয়জনের মুখের মতো সেই ঘড়ি। তাড়াতাড়ি হাতে পরতে গেলুম। ছোটদাদু বললেন, সকাল না হওয়া পর্যন্ত আমার পকেটেই থাক। পথের বিপদ কাটেনি এখনও।
ছোটদাদু ঘড়িটা আবার পকেটে পুরলেন।
সময়টা বাবাকে তা হলে বলে দিন।
ওর আর সময় জেনে কী হবে! ও কি অফিসে যাবে বলে বেরিয়েছে।
আবার আমাদের হাঁটার গতি বেড়ে গেল। যেন পেছন দিক থেকে অদৃশ্য কোনও শক্তি আমাদের ঠেলে নিয়ে চলেছে। চলার বেগ বাড়লেও আমার প্রশ্ন থামল না।
ছোটদাদু, মেলার ঘটনা জানলেন কেমন করে!
অতি সহজে। তোমাকে অনুসরণ করে।
কই আপনাকে তো দেখতে পাইনি কোথাও!
তুমি যদি আমাকে দেখতেই পাবে, তা হলে আমার গোয়েন্দাগিরির কী মানে রইল! ওটা বোঝার চেষ্টা কোরো না। শোনো, তুমি এমন এক সাধিকার পাল্লায় পড়েছিলে, যিনি ডাকিনী-হাকিনী চ বিদ্যাচতুষ্টয়ে সিদ্ধ। সহজিয়া বৌদ্ধ তান্ত্রিকদের মতোই এঁদের বিশ্বাস,
এত্থুসে সুরসুরি জমুণা এত্থুসে গঙ্গা সাঅরু।
এত্থুসে পআগ বণারসি এত্থুসে চন্দ দিবাঅরু॥
দেহেই সব। সুরেশ্বরী যমুনা, এখানে গঙ্গাসাগর, এখানেই প্রয়াগ বারাণসী, চন্দ্র, সূর্য, ক্ষেত্র, পীঠ, উপপীঠ, তীর্থক্ষেত্র ও সুখভূমি। তোমাকে বিন্দুসাধনার স্বাদ দিয়েছেন ওই শক্তিময়ী, কিন্তু তোমার আধার অন্য। তাই তোমাকে ঝটকা মেরে নিয়ে এলুম। ওই পথে গেলে তুমি পাগল হয়ে যাবে।
পাগল হয়ে যাব কেন?
তোমার কাম বেড়ে যাবে, তুমি ধারণ না করে বর্জন করবে, তোমার শরীর ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হবে। তোমার ক্ষয়রোগ হবে। তোমার মেধা কমে যাবে। তুমি জড় হয়ে যাবে। নিজের ইন্দ্রিয়ের ওপর অসম্ভব সংযম না থাকলে ওই পথ ধর্মের পথ না হয়ে ব্যভিচারের পথ হবে। দেখলে না, তুমি আসতে চাইছিলে না। সামান্য যেটুকু স্বাদ পেয়েছ, তাইতেই অস্থির হয়ে গেছ।
