হরিশঙ্কর আর ছোটদাদুর মুখের ওপর এক ভৌতিক আলো খেলা করছে। দু’জনকেই মনে হচ্ছে আমার অচেনা। হরিশঙ্কর হঠাৎ বললেন, ক্রিস্টাল অফ বীরভানপুর অ্যান্ড দেজুরি।
ছোটদাদু সঙ্গে সঙ্গে বললেন, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, পরীক্ষা করে বিশেজ্ঞরা রায় দিলেন…।
হরিশঙ্কর ধরে নিলেন, প্রাগৈতিহাসিক যুগেও এই জেলায় মানুষের বাস ছিল, আর সে মানুষ অরণ্যচারী কাঁচাখেকো মানুষ ছিল না, ছিল সুসভ্য। শিল্প নিদর্শন যা আবিষ্কৃত হয়েছে সেইটাই তার প্রমাণ। অন্ধকারের এই স্থূপটি কী? এনি আইডিয়া?
আদি রাজা ছিলেন মহারাজা সিংহ বর্মন। এটা তাঁর স্মৃতি নয়। শুশুনিয়া পাহাড়ের একপাশে পাথরের গায়ে বিরাট এক জ্বলন্ত চাকার তলায় নিজের কালকে, নিজের রাজত্বের কাহিনীকে কালজয়ী করে রেখে গেছেন। আমার মনে হয় এটা রাজা গোপাল সিংহের কালের।
কোন গোপাল সিংহ! সেই রাজপুত ব্রাহ্মণ, যাঁর রাজত্বসীমা ঘুরে দেখতে যোলো দিনেরও বেশি সময় লাগত। রাজস্ব থেকে বাৎসরিক আয়ের পরিমাণ ছিল তিরিশ থেকে চল্লিশ লক্ষ টাকা। শত্রু-দমনের কাজে যিনি জলকে ব্যবহার করেছিলেন শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে।
সেই সুজা খাঁ!
ঠিক, ঠিক বলেছিস। হান্ড্রেড আউট অফ হান্ড্রেড।
গোপাল সিংহের রাজত্ব ছিল দুর্ভেদ্য। সুজা খাঁ বিশাল বাহিনী নিয়ে আক্রমণ করেছিলেন। মনে পড়েছে?
পড়বে না! গোপাল সিংহর কী ট্যাকটিকস! এসো। এগিয়ে এসো। আরও এসো। একেবারে হাতের মুঠোয়। তারপরেই খুলে দেওয়া হল ড্যামের গেট। জলের তোড়ে সব হাবুডুবু।
কী রাজাই ছিলেন! হোয়াট এ কিং হি ওয়াজ। জমজমাট রাজত্ব। চুরি নেই, ডাকাতি নেই, চোর-জোচ্চর বাটপাড় নেই। দিগ্বিদিক থেকে বণিকরা আসছেন, ভ্রমণার্থীরা আসছেন। অ্যান্ড হোয়াট এ সিস্টেম! রাজসীমায় ঢোকামাত্রই নিরাপত্তার দায়িত্ব রাজপ্রহরীর। ঘাঁটির পর ঘাঁটি। প্রহরী এক ঘাঁটি থেকে আর এক ঘাঁটিতে এনে আর এক প্রহরীর হাতে দায়িত্ব দিয়ে ফিরে যাবে। রিলে সিস্টেম। শুধু হাতে ফিরবে না, ফিরবে রিসিট নিয়ে। পারসন ডেলিভার্ড। মুখ্য প্রহরী আবার রাজার কাছে নিয়মিত খবর পাঠাতে থাকবেন, অতিথি কেমন আছেন, কোথায় আছেন। গোপাল সিংহের রাজত্বে ঢোকা মানে, তুমি স্টেট গেস্ট। তোমার আর কোনও খরচ নেই। সব ফ্রি। থাকা খাওয়া। এমনকী তোমার সওদা, তোমার সম্পদ বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে বিনা পারিশ্রমিকে একজন বাহক পাবে। যদি তুমি কিছু হারিয়ে ফেলো, ধরো টাকার থলে, তা হলেও চিন্তার কিছু নেই। যিনিই সেই থলি কুড়িয়ে পান না কেন, সবচেয়ে কাছের কোনও গাছের ডালে ঝুলিয়ে রেখে তিনি নিকটবর্তী চৌকিতে গিয়ে সেই খবর দেবেন। চৌকিরক্ষক তেঁড়া পিটিয়ে সেই খবর সমস্ত জেলাবাসীকে জানিয়ে দেবেন।
ছোটদাদু বললেন, এই ধ্বংসাবশেষ হয়তো সেই গ্রেট কিং গোপাল সিংহের রাজত্বকালের।
একটা তোরণের মতো প্রবেশপথ। সময় যেন সলিড হয়ে গেছে। তারপর প্রবল জঙ্গল। টলের মতো জোনাকির আলো, ফুরফুরে বুদবুদের মতো ভাসছে। তারপর ছোট বড় অন্ধকারের টুকরো। ইতিহাসের অন্ধকার।
হরিশঙ্কর বললেন, আমি ভেতরে দু-এক কদম এগিয়ে দেখি। শুধু ইতিহাস নয়। রহস্যের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
ছোটদাদু বললেন, ইদানীং লক্ষ করছি তোর মধ্যে একটা ইনস্যানিটি আসছে। মাঝে মাঝে মনে হয় পাগলামি আসছে। এই অন্ধকারে যেখানে একটা শেয়াল ঢুকতে ভয় পায়, তুই সেখানে কী কারণে ঢুকবি? সাপের ছোবল বিছের কামড় খাওয়ার জন্যে? না কি পড়ে হাত পা ভাঙার জন্যে!
শোন, আদি পৃথিবীটা কেমন ছিল?
তুই আদিম মানুষ নোস!
আমি কিন্তু একেবারে মাথায় এক বিন্দু আলো দেখতে পাচ্ছি।
আমরা তাকালুম। সত্যিই তাই, একটা আলোর ফুটকি জ্বলছে নিবছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে একটা নয় দুটো বিন্দু। গা-টা হুঁত করে উঠল। অবশ্যই কোনও ভয়ংকর ডাকাত। হাওয়া থেকে টঙে চড়েছে। সিগারেটে টান মারছে।
ছোটদাদু হঠাৎ হেসে উঠলেন, ভায়া, ওটি একটি বৃহৎ আকারের পাচা, একটু বাতাস নিচ্ছেন। জানবে শিকারি পাখি শিকারি জন্তুর চোখ রাত্তিরবেলায় আগুনের মতো জ্বলে। হিংসার আগুন।
হরিশঙ্কর বললেন, ইউ আর রাইট। রাত যদি না হত আমি এই রেলিকস দেখে ছাড়তুম। এমন একটা জিনিস না দেখে চলে যেতে হচ্ছে, ভেরি স্যাড। ফেরার পথে আমাকে দেখতেই হবে।
তোর সঙ্গে আমি একমত। অতীতের চেয়ে দর্শনীয় আর কী আছে!
আমার হঠাৎ মনে হল, আমাদের কোনও অদৃশ্য শক্তি এখানে ধরে রেখেছে। যেভাবে দু’জনের কথাবার্তা আলোচনা চলেছে, তাতে মনে হচ্ছে এইখানেই রাত ভোর হয়ে যাবে। একপাশে বসে পড়লেই তো হয়!
হঠাৎ আলোচনা থেমে গেল। গোটাকতক প্যাঁচা চ্যাঁ চ্যাঁ করে ডেকে উঠল। ভয়ংকর ডাক। ছোটদাদু বললেন, একটা প্রহর শেষ হল। চলো, আমরা পা চালাই।
হরিশঙ্কর বললেন, এই সময়টায় আমি পৃথিবীর আহ্নিকগতি যেন অনুভব করতে পারি। পৃথিবী তার নিজের অ্যাকসিসে ধীরে ধীরে রিভম্ভ করছে। রাত থেকে দিন, দিন থেকে রাত। রাতের মতো সময় আছে। এমন ঘন, এমন একান্ত একটা সময়! সবকিছুই রহস্যাবৃত। আচ্ছা চলো। এগিয়ে পড়ি।
হঠাৎ ঝুনঝন শব্দ। যেন অনেক কঙ্কাল একসঙ্গে নৃত্য করছে। এ শব্দ আগে কখনও শুনিনি। হরিশঙ্কর চলতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন, রাজপুরীতে নাচের আসর বসল নাকি?
