ছোটদাদু বললেন, অবশ্যই শুনব একজনের কথা। তিনি বসে আছেন অন্তরে।
পথটা ভাল নয়। কেন অমন করছেন। একবার ইনি বলছেন। ইনি শান্ত হলেন তো আপনি। আর তো কয়েকঘন্টা! তারপরেই তো পোর!
এক মুহূর্তে বিশ্ব জুড়ে কত কাণ্ড হয়ে যায় মোহন! এই মুহূর্তে কত জন্মাল, কত মরল, কত খুন হল, কত সংসার ভাঙল! কত বরফ জল হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়ল। কত মানুষ এগোল, কত মানুষ পেছোল। এই মুহূর্তে একটা ট্রেন গন্তব্যের দিকে কতটা এগিয়ে গেল! সে খবর রাখো মোহন?
সবই ঠিক, তবে এই কষ্ট। আমরা আরামে ঘুমোব, আপনারা হাঁটবেন!
পুরোটাই মনের ব্যাপার মোহন। কেউ ঘুমিয়ে আরাম পায়, কেউ পায় বনের পথে হেঁটে।
খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর হাত ধুচ্ছি, বিমলাদি বললেন, কোনওরকমে আটকাও না! রাতে তোমাকে নিয়ে যে একটু বসব ভেবেছিলুম। এমন একটা ক্রিয়া তোমাকে শেখাব ভেবেছিলুম যা তোমার সংসারপথের সহায় হবে।
কী দিদি!
বজ্রোলি মুদ্রা। এক মহাযোগী আমাকে শিখিয়েছিলেন। তুমি কোনওরকমে বোঝাও।
ছোটদাদু প্রস্তুত হচ্ছেন। হরিশঙ্কর প্রায় তৈরি। ছোটদাদুকে আস্তে আস্তে বললুম, ছোটদাদু, আর তো কয়েকঘণ্টা, একেবারে ভোরবেলা বেরোলে হয় না?
গম্ভীর গলায় বললেন, না হয় না!
এই রাত! এতটা পথ! জঙ্গল! ডাকাত!
তাতে তোমার কী? তুমি কি সঙ্গে মোহরের থলে নিয়ে চলেছ?
বেশ রাগের গলা! বিমলা ওপাশে ছিলেন। গিয়ে বললুম। বিমলাদি বললেন, তুমি বলো, আমি থাকছি। ফেরার পথে আপনাদের সঙ্গে চলে যাব।
আমি একটা ভেড়ার মতো সেই কথা বলার জন্যে ফিরে এলুম। একটা অদৃশ্য শক্তি যেন আমাকে পরিচালিত করছে। একটা ঘোরের মধ্যে আছি।
ছোটদাদুর সামনে দাঁড়ানোমাত্ৰই, তিনি খপ করে একটা হাত ধরলেন আমার। ভয়ংকর একটা ঝাঁকুনি মারলেন। তারপর টানতে টানতে একেবারে রাস্তায়। হরিশঙ্কর অনুসরণ করছেন। ছোটদাদু আমাকে নিয়ে হাঁটছেন হনহন করে।
নিমেষে চলে এলুম পণ্ডিতমশাইয়ের চতুষ্পঠীর কাছে। মিটমিট একটা আলো জ্বলছে ভেতরে। এসে গেল সেই সাঁকো। পথ ঢালু হল। সামনেই সেই মেলার জায়গা। অন্ধকারে দৈত্যের মতো খাড়া হয়ে আছে নাগরদোলা। টিং টিং আলো এখানে ওখানে। সেই মেয়েরা এখন বেরিয়ে এসেছে। অসংলগ্ন কথা, চুটকি হাসি, মাতালের প্রলাপ। আমরা যেন বাতাসে উড়ে চলেছি পক্ষীরাজের মতো। বিশাল একটা ধ্বংসাবশেষ এগিয়ে আসছে। হরিশঙ্কর পেছনে আসছেন সৈনিকের মতো মার্চ করে।
২.৪৪ There is an Eye that never sleeps
পণ্ডিতমশাইয়ের জন্যে আমার খুব দুঃখ হচ্ছিল। ছোটদাদুর ভয়ংকর আক্রমণ, তারপরে অসীম কৃপা, সবই হল, কিন্তু মানুষটি বড় নিঃসঙ্গে আছেন। শাস্ত্র আর পাণ্ডিত্যের ভারে নুয়ে পড়েছেন। বাঁচার ইচ্ছা প্রবল, অথচ সময়ের বালুকণা অবিরত ঝরেই চলেছে। যৌবনে না হয় একটু বেহিসেবি ছিলেন। হয়তো টাকাপয়সার ব্যাপারে একটু হিসেবি। মানুষের সবটাই কি ভাল হতে পারে! মানুষ তো তা হলে ভগবান হয়ে যাবে! দুটো পা, দুটো হাত, দুটো কান, দুটো চোখ, অর্থাৎ পাপ আর পুণ্য। বৃদ্ধ মানুষটি আমার মধ্যে তার সন্তানকে দেখেছিলেন। আর হয়তো দেখা হবে না কোনওদিন। এইসব ঠুনকো সেন্টিমেন্টের অর্থ হয় না কোনও।
হরিশঙ্করের হাতে একটা শুকনো গাছের ডাল। গাছের ডাল, কচি বাঁশ, বেত, কুড়িয়ে পাওয়া পাথর এইসব হরিশঙ্করের প্রাণের জিনিস। প্রকৃতিতে মিলিয়ে যেতে হরিশঙ্কর ভীষণ ভালবাসেন। এত বড় মাপের মানুষকে সংসারে ধরে রাখা যায় না। অসম্ভব। আকাশ মানুষের জানলায় উঁকি দেয় বলে আকাশকে ছোট ভাবা, জানলার আকাশ ঘরের আকাশ ভাবা মূর্খতা। হরিশঙ্কর গুনগুন করে গান। গাইছেন। কেদারার আলাপ। পথ বন্ধুর। খন্দে ভরা। যখন ঝোঁপঝাঁপ গাছের দঙ্গলে ঢুকছি তখন। নিচ্ছিদ্র অন্ধকার। আর টেনিস বলের মতো আলো ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে। চিনতে পারিনি। হরিশঙ্কর বললেন, ভয় পেয়ো না। ভূত নয় জোনাকি। এর আলাদা রূপ।
এক জোনাকি দর্শনেই হরিশঙ্কর যেন সমাধিস্থ। সৃষ্টিবিজ্ঞানের সূক্ষ্মতায় চলে গেলেন। স্রষ্টার বিশাল পরিকল্পনা যে কতটা বিশাল তারই আলোচনা চলল! যেখানে যা প্রয়োজন, যতটা প্রয়োজন, সবই আছে। কিছু আবার রেখেছেন লুকিয়ে, গুপ্তধনের মতো করে। মানুষের অনুসন্ধানী প্রতিভা যাতে বাড়ে। মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান যাতে আরও উন্নত হয়। যেমন অসুখ। অসুখ যেমন দিলেন, সঙ্গে সঙ্গে ওষুধের ব্যবস্থাও করে রাখলেন। খুঁজে নাও। দেহটাকে করে দিলেন ফিজিক্স কেমিস্ট্র কমবাইন্ড। স্টম্যাক একটা ল্যাবরেটরি। স্কেলিট্যান পারফেক্ট ফিজিক্স। হিঞ্জ, ফালক্রাম, গিয়ার, পিনিয়ান। ব্রেন। কম্পিউটার। চোখ ক্যামেরা। হরিশঙ্কর এতটাই অভিভূত যে হাঁটা বন্ধ হয়ে গেল।
অন্ধকারে আমরা দাঁড়িয়ে পড়লুম সেই ধ্বংসাবশেষের সামনে। কোনও এক সময় ছিল বিশাল প্রাসাদ। বাঁকুড়ার ইতিহাস তো সামান্য নয়। একসময় নাম ছিল জঙ্গলমহল। শুধু গণিত? ইতিহাসেও হরিশঙ্কর অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কোথাকার ইতিহাস চাই? গ্রিস, রোম, ইজিপ্ট, অটোমান টার্ক, ভারত, এমনকী পশ্চিমবাংলার প্রতিটি জেলা।
আমরা যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তিন গেরিলা সোলজার। এইমাত্র প্যারাসুট নিয়ে আকাশ থেকে নেমে এসেছি মধ্যপ্রাচ্যের কোনও রণাঙ্গনের পশ্চাৎভূমিতে। সামনেই ফোর্ট নক্স। দুই জেনারেলে যুক্তি হচ্ছে। পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে! ঝিঁঝি পোকার ঐকতান যে কী ভয়ংকর হতে পারে, সে-ই টের পেলুম। দু’কানের পরদা যেন খুলে পড়ে যাবে!
