মুকু ভূপাতিত চেয়ারটিকে খাড়া করেছে। পিতা সাবধানে পেছনে সরে গিয়ে চেয়ারে বসে পড়লেন। এতক্ষণ সব বেসামাল হয়ে গিয়েছিল। আবার হিসেবজ্ঞান ফিরে আসছে। মাতামহ। বিধুবাবুর বসে যাওয়া চেয়ারে বসলেন না। অপবিত্র হয়ে গেছে। পাশের আর একটা চেয়ারে বসলেন। মুখে বেগুনি, মাকালীর লাল জিভের মতো সামনে লকলক করছে।
মেসোমশাই কোমরের কষি কোনওমতে বাগে আনতে পেরেছেন। আর একটা চেয়ারে বসে তারও ওই একই প্রশ্ন, কী টাকা টাকা করছিল ওই স্কাউড্রেলটা!
মাতামহ বেশ সন্দেহের চোখে প্রশ্নকারীর দিকে তাকালেন। চোখ ঘুরে গেল কনক আর মুকুর ওপর দিয়েও। এরা আবার কারা? সংসারটা বেশ শ্মশানের মতো হয়ে ছিল! হঠাৎ শ্মশান জাগাতে এ কাদের আগমন? প্রশ্ন করলেন, আপনাকে তো ঠিক চিনলুম না? সঙ্গে সঙ্গে নিজের পরিচয় দিলেন, আমি হরিশঙ্করের শ্বশুরমশাই।
কী ট্রেনিং! মুকু আর কনক সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে হেঁট হয়ে গড়াগড় তিনজনকে প্রণাম করে ঘরের মাঝখানে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। নৃত্যের একটা ছন্দ চলে গেল চোখের সামনে দিয়ে। মেসোমশাই বললেন, আমার মেয়ে।
মাতামহ একটা হাত বুকের কাছে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে সাপের ফণার মতো তুলে ধরে বললেন, সে তো বুঝলুম, কিন্তু আমিটা কে?
পিতা বললেন, এঁকে আপনি আগে হয়তো দেখেননি, মেজদার ভায়রাভাই। পণ্ডিত মানুষ। ডাকসাইটে উকিল।
মাতামহ সঙ্গে সঙ্গে বললেন, কী, চলবে? বেগুনি, আলুর চপ, আলুর বড়া বা ফুলুরি?
আজ্ঞে, সবই তো সুস্বাদু, মুখরোচক। তবে আমি যে আবার অম্বলের রুগি!
মাতামহ হা হা করে হেসে বললেন, পুরুষমানুষের অম্বল? হরিশঙ্কর, শুনেছ? পুরুষমানুষের অম্বল! ও তো মেয়েদের অসুখ গো! অম্বল, মাথাধরা, গেঁটে বাত, বাধক। গরম তেলেভাজা না, খেলে তোমার ও ব্যামো সারবে না বাপু! সুখদা মোক্ষদা মা, আমার দিকে এসো তো!
কনক আর মুকু এগিয়ে গেল। যাক, দু’জনের আর একজোড়া নতুন নাম হল। মাতামহ ঠোঙাটি কনকের হাতে তুলে দিতে দিতে বললেন, বাঃ, বেশ মেয়েটি তো? একেবারে দুর্গাপ্রতিমা! আমার নাতিটার বিয়ে দিয়ে দিলে হয়। এই ভস্মলোচনের সংসারে একটি অন্নপূর্ণার বড় প্রয়োজন। মাতা চ পার্বতী দেবী পিতা দেবো মহেশ্বরঃ। বান্ধবা শিবভক্তাচ স্বদেশোভুবনয়ম।
ঠোঙাটা বুকের কাছে ধরে, মাথাটাকে তার ওপর গুঁজে, মুকুর পা মাড়িয়ে আমাকে ধাক্কা মেরে মাতা অন্নপূর্ণা ঘর ছেড়ে পালালেন। এই লাজুক লাজুক প্রস্তাবে বাচ্চা মহাদেবটিকেও কামরাঙার মতো মুখ করে, দেয়ালে পিঠ ঘষে ঘষে গুটিগুটি সরে পড়তে হল।
রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়াতেই কনক বললে, যাও! তোমার সঙ্গে কথা বলব না।
আমার তো আবার সবেতেই পাকামো! এই আহ্লাদে আটখানা, এই আবার বিষাদে ফুটিফাটা। এখন ভেতরটা নেত্য করছে।
কনক বসে বসে ঠোঙা থেকে তেলেভাজা বের করছে। চট করে আঁচলটা মাথায় তুলে দিলুম। মন ধমকে উঠেছিল, কী গ্রাম্য রসিকতা! হৃদয় শোনেনি, হাত বশে থাকেনি।
আর মা অন্নপূর্ণা! তিনি কপাত করে আমার হাত চেপে ধরে কটাস করে আঙুল কামড়ে দিলেন। মোস্ট আন-অন্নপূর্ণাসুলভ কর্ম। দৃশ্যটি মুকু দেখে ফেললেন এবং মৃদু হেসে বুঝিয়ে দিলেন, বেশ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে, কোনও মেয়ে যদি কটাস করে আঙুলের মাথা কামড়ে দেয় তা হলে তার কী অর্থ! সুখেন? না সুখেন নয়। আরও পবিত্র কেউ। যে এর ভেতরের রোমান্সটা চটকে বের করে দিয়ে বিশ্রী একটা দেহের স্বাদ ঢুকিয়ে দেবে না। মায়া? না, মায়াও নয়। তা হলে মাতামহকেই জিজ্ঞেস করব। প্রাণের কথা বলার মতো এমন প্রাণ আর কোথায় পাব!
মাছ আনা মাথায় উঠেছে। বসার ঘরে তিন সংসারী আলোচনায় বসেছেন। ব্যাপারটা যেমন আকস্মিক তেমনই কদর্য। পৃথিবীটা বড় অদ্ভুত জায়গা। একদিকে যেমন ভাল, আর একদিকে তেমনই খারাপ।
কী বলছে ব্যাটা? তোমার মেজদা টাকা ধার নিয়েছিল? মাতামহ আলুর চপ খেতে খেতে প্রশ্ন করলেন।
কোনও ডকুমেন্ট আছে? মেসোমশাইয়ের প্রশ্নের ওপর প্রশ্ন।
ওর আস্তিনে কী আছে ওই জানে। মাঝে মাঝে কেবল তড়পে যাচ্ছে। আমার পরামর্শ ছাড়া মেজদা জীবনে কোনও কাজ করেনি। সে এই লোফারটার কাছে টাকা ধার করতে যাবে, আমি বিশ্বাস করি না। অসম্ভব। ইমপসিবল। আর টাকা তাকে ধার করতে হবে কেন? তার কোনও অভাব ছিল? সে তো ধার দিয়েই ফতুর। ওই রাসকেল আমাকে বলে গেল, মেজদার মেরে আমি বড়লোক! ছি ছি কানে যেন গরম সিসে ঢেলে দিয়ে গেল। মেজদা যা রেখে গেছে, আমি কাকে দোব? দোবটা কাকে? কেউ তো নেই। মেজদার বংশই তো লোপাট হয়ে গেছে। আমি কি পার্সেল তার ওপরে পাঠাব!
মাতামহ বললেন, মেজকত্তা একটু খরচে ছিল। দানধ্যানও ছিল প্রচুর। তুমি সে তুলনায় বেশ হিসেবি।
এই রে, মরেছে রে! আমার মাতামহের এই এক যা দোষ! মনে যা এল, দুম করে বলে ফেললেন। মা ব্রয়াত সত্যমপ্রিয়ম। কে কার কথা শোনে! এইজন্যে যে অপ্রিয় হতে হয়, তা বোঝেন না। পিতা কঠিন মুখে তাকালেন, সংসারী মানুষকে একটু হিসেবিই হতে হয়। দিয়তাম, ভুজ্যতাম করলে আপনার ছেলেটির মতো অবস্থা হবে। আয় একশো, ব্যয় হাজার, পাঁচজনের কাছে হাত পেতে বেড়াও। বাইরে কোঁচার পত্তন, ভেতরে ছুঁচোর কেত্তন।
হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ। ব্যাটা যেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। রোজ মোগলাই খানা চাই। কানে আতর চাই। একপা হাঁটার ক্ষমতা নেই, গাড়ি চাই, সেবাদাসী চাই। বউয়ের কী তোয়াজ। ব্যাটা যেন বিল্বমঙ্গল! পরশুদিন একটা শাড়ি এল, দাম শুনলে চক্ষু চড়কগাছ, দুশো টাকা!
