কতক্ষণ এই অবস্থায় ছিলুম জানি না, যখন সংবিৎ ফিরে পেলুম, তখন মেলা প্রায় ভেঙে এসেছে। স্থির নাগরদোলা সামনের জমিতে। ইন্দ্রজালের চিৎকার নেই। রামায়ণ গান কানে আসছে না। দিদির এখন অন্য ব্যক্তিত্ব। আদেশের কণ্ঠস্বর, চলো, বেশ রাত হয়েছে। বুঝতে পারছ, বাতাস ঘুরে গেছে! হাওয়া দিয়ে সময় ঠিক করা যায়।
দিদি, তোমার কৃষ্ণ?
মাটির কৃষ্ণের আর দরকার নেই। আমি জ্যান্ত কৃষ্ণ পেয়ে গেছি। শোনো তোমাকে একটা কথা বলি, যা হল, যা পেলে, আরও যা পাবে, তোমার দাদু তোমার বাবাকে বলবে না। তোমার কেমন লাগল?
আমি বলতে পারব না। বলা যায় না।
হঠাৎ কী হয়ে গেল! জানো তো অনেকেই এসব বোঝে না। অপবাদ দেয়। দিদি, তোমার শক্তির পরিচয় আমি পেয়েছি। তোমার জীবনে এর দাম আছে। আমার এসবে কী প্রয়োজন।
প্রয়োজন? তোমার কি ধারণা এসব চাইলেই পাওয়া যায়! তোমার মনে হল, আর তুমি পেয়ে গেলে! তোমার মনে হল আমি চাই না, আর সব ফিরে গেল! মানুষের জীবনে না চাইতেই আসে। সকলের জীবনে আসে না। যার আসে তার আসে। এরই নাম কৃপা। করা থাকলে তবেই পাওয়া যায়। করে পাওয়ার নাম কৃপা। ধরো, তোমার চুল পড়ে যাচ্ছে, তুমি চাইলেই কি পড়া বন্ধ হবে? পড়ার হলে পড়বে, থাকার হলে থাকবে। সময় হলে শিশুর দাঁত উঠবে, বয়স হলে পড়ে যাবে, চোখে যখন ছানি আসবে আসবেই, তুমি না চাইলেও আসবে। শোনো, তোমার আগের জন্মে বেশ কিছু করা আছে। তুমি সে খবর রাখো না। তোমার দাদু আজ তোমাকে কিছু দেখিয়েছেন, বলো ঠিক কি না?
হ্যাঁ দিদি।
তোমার বাবার শক্তি তোমাকে ঘিরে আছে। তোমার ভেতরে ভোগ আর যোগ দুটোই সমান সমান মাত্রায় আছে। তোমাকে ভোগের পর্বটা আগে শেষ করে নিতে হবে। তোমার স্ত্রীর শক্তি তোমার চেয়ে বেশি হবে। তোমার স্ত্রীকে ধরেই তোমাকে এগোতে হবে। এইটাই তোমার পথ, কিন্তু আসতে হবে অনেক ঘাটের জল খেয়ে ঘুরপথে।
সেই অদ্ভুত মহিলা আমাকে একটি অসাধারণ গল্প বলেছিলেন। হরিশঙ্কর প্রায়ই বলেন, জ্ঞানের মনোপলি হয় না। তোমার কাছেই সব জ্ঞান। কৃপা করে তুমি ছাড়বে, তবেই আমার বরাতে সামান্য জুটবে, এই একটি ক্ষেত্রে সেই ব্যাবসা অচল। জ্ঞান সকলের। সকলেই জ্ঞানী হতে পারে। যদি ইচ্ছে। থাকে, যদি চেষ্টা থাকে। মানুষের ভেতরে জ্ঞান উদিত হয় সূর্যের মতো। এই মহিলাও সেইরকম জ্ঞানী। শুধু জ্ঞানী নন, সাধিকাও।
দিদি বলছেন, একটা কুঁড়েঘর। একটা লণ্ঠন জ্বলছে। একজন লোক শুয়ে ছিল। হঠাৎ উঠে বসল। এক ছিলিম তামাক খাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে। হুঁকো কলকে বেরোল। এইবার চাই টিকে। খুঁজে খুঁজে কয়েকটি টিকেও বেরোল। এইবার যে একটু আগুন চাই। আগুন না হলে যে টিকে ধরবে না। তার যে চকমকি পাথরটা ছিল, সেটা হারিয়ে গেছে। পাথর আছে প্রতিবেশীর বাড়িতে, কিন্তু এই মাঝরাতে ডাকাডাকি করাটা কি উচিত হবে! সবাই ঘুমোচ্ছে। কিন্তু তামাকের নেশা! একটু না হলে যে প্রাণ ছটফট করছে। লণ্ঠন হাতে লোকটি বেরিয়ে পড়ল রাতের অন্ধকারে। প্রতিবেশীর দরজায় গিয়ে ধাক্কাধাক্কি। বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন বাড়ির কর্তা। কী চাই? বড় তামাক খাওয়ার ইচ্ছে। হয়েছে। টিকে ধরাতে হবে। একটু আগুন চাই। আপনার চকমকি পাথরটা যদি একবার দেন কর্তা! কর্তা বললেন, আগুন ধরাবে? তা তোমার হাতে ওটা কী? আজ্ঞে লণ্ঠন। লণ্ঠনের ভেতর ওটা কী? আজ্ঞে, তাই তো। তোমার নিজের হাতে আগুন, আর তুমি মাঝরাতে প্রতিবেশীর ঘুম ভাঙিয়ে আগুনের খোঁজ করছ?
দিদির বক্তব্য, তোমার ভেতর আছে, তোমার হুশ নেই। সেই হুশটা তোমার করিয়ে দিতে হবে। সেইটা হবে তোমার গুরুর কাজ। ভেতরে থাকলে তবেই তাকে টেনে বের করা যায়। যেমন গান, শিল্প, সাধনা। ভেতরে থাকা চাই। তোমার আছে। প্রকাশ নেই। তীর্থে তীর্থে ঘোরো, সাধুসঙ্গ করো। তা না হলে, তোমার এদিকও যাবে ওদিকও যাবে। সংসার তুমি করবে। শুরুটা ভালই হবে, শেষটা গোলমেলে। নির্জনে একা। তখনই হবে মুখোমুখি।
সারাটা পথ এই ধরনের অদ্ভুত সব কথা বলতে বলতে দিদি এসে ঢুকলেন বাড়িতে। ঢুকেই হরিশঙ্করের গলা, এই নে কিস্তি। সামলা।
দাওয়ায় বসেছে দাবার আসর। হ্যারিকেনটা ঝুলছে বাঁশের বাতায়। গাওয়া ঘিয়ে একটা কিছু ভাজা হচ্ছে। গন্ধে আকাশ বাতাস ভরে গেছে। মোহনদা নেমে পড়েছেন রান্নায়।
ছোটদাদু টুক করে একটা খুঁটি সরিয়ে বললেন, এই নাও বন্ধনমুক্ত করে দিলুম, কিন্তু এইবার তোমার বিপদ।
হরিশঙ্কর চালটার খুব তারিফ করলেন। আমি একপাশে বসলুম। ছক থেকে মুখ না তুলেই ছোটদাদু বললেন, কেমন হল মেলা?
আমার উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে একটা খুঁটি চেলে বললেন, কিস্তি।
হরিশঙ্কর বলছেন, এ একেবারে জীবনমরণ লড়াই চলেছে। একবার এদিক যায় তো একবার ওদিক।
ছোটদাদু হাসছেন, রাজারাজড়ার ব্যাপার। রাজ্যপাট সামলানো কি মুখের কথা! আচ্ছা নে এইবারও সামলে দিলুম, কিন্তু তোর মন্ত্রী ইন ডেঞ্জার।
খেলার কোনও সমাধান শেষ পর্যন্ত হল না। খাওয়ার ডাক পড়ে গেল। হরিশঙ্কর আসনে বসতে বসতে বললেন, কাল শেষরাতেই কিন্তু আমরা বেরিয়ে যাব।
ছোটদাদু হঠাৎ বললেন, শেষরাত নয়। এই রাতেই বেরোব। অদৃশ্য নির্দেশ।
মোহনদা পরিবেশন করছিলেন। বললেন, কিছুতেই কি কারও কথা শুনবেন না?
