এত রাতে বাদাম খাবে দিদি? পেট ভরে যাবে।
তোমার মাথা! একমুঠো বাদাম থেকে বড়জোর পঞ্চাশটা পুঁচকে পুঁচকে দানা বেরোবে। এইতে যদি পেট ভরে যায়, পেট কেটে বাদ দাও। মেলায় এসে হিসেব করতে নেই। যা প্রাণ চায় তাই করতে হয়। বালির খোলায় চিনেবাদাম নাড়ার গন্ধটা কী সুন্দর লাগে! মনে হয় মেলার গন্ধ। বছরে তো এই একবারই মেলা বসে গো। তাও তুমি এইরকম করছ!
দিদি ছেলেমানুষ হতে হতে একেবারে ছেলেমানুষ হয়ে গেছেন। মুখচোখের চেহারা পালটে গেছে। আমরা নাগরদোলার দিকে এগোচ্ছি। পরপর এক সার চট-ঘেরা খুপরি। অনেকে এদিক ওদিকে তাকাচ্ছে। চটের পরদা তুলে টুপ টুপ ঢুকে পড়ছে। দিদি আমার হাত চেপে ধরলেন;
সাবধান।
কেন দিদি?
অনেক সময় হাত ধরে টেনে নেয়।
কে টেনে নেয় দিদি?
ওই যে ওর মধ্যে যারা আছে, সেই মেয়েরা। পা চালাও পা চালাও।
ওদের এখানে কেন আসতে দিয়েছে দিদি?
মেলায় আসে অমন। ওদেরও তো খেয়ে পরে বাঁচতে হবে।
মাঝে মাঝে খিলখিল হাসি আসছে কানে। অল্প অল্প ঘুঙুরের শব্দ। আমরা প্রায় ছুটে জায়গাটা পেরিয়ে এসে এমন এলাকায় পড়লুম, যেখানে শুধুই কাঁচের জিনিসপত্র। আলোয় ঝলমল করছে। যেন কোনও মুঘল রাজার শিশমহলে এসে পড়েছি।
দিদি, দেখো কী সুন্দর! কিছু কিনবে?
কাঁচের জিনিস থাকে না। একদিন-না-একদিন ভেঙে যায়। কাঁচ পাথর খুব সাবধানে রাখতে হয়। একটু পরেই কত পাথরের কাজ দেখবে। শুশুনিয়ার পাথর কেটে তৈরি। লোভ লেগে যাবে। কিনতে ইচ্ছে করবে। আমাদের ঘরে কাঁসার জিনিসই ভাল।
আমরা নাগরদোলার কাছে চলে এলুম। দাঁড়ানোমাত্রই একটা পালা শেষ হল। দিদি বললেন, আমাদের ভাগ্যটা ভীষণ ভাল। একটুও অপেক্ষা করতে হল না।
নাগরদোলা কোম্পানির লোক আমাদের একটা দোলায় বসিয়ে দিলে। একটু না ধরলে তো বসা যায় না। আমরা যেটায় বসলুম সেটা এক ধাপ ওপরে উঠে গেল। পরেরটা ভরে গেল। আমরা আর। একটু ওপরে উঠে গেলুম, শেষে একেবারে টংয়ে। শুরু হল ঘুরপাক, আর কাঁচ ক্যাচ শব্দ। প্রথম নাগরদোলায় চড়া। যখন হুস করে নীচের দিকে নামছে, মনে হচ্ছে আছড়ে মাটিতে ফেলে দেবে। আমার ভয় দেখে দিদি ডান হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন। কাঁধে কাধ ঠেকে আছে। যখন সবেগে নীচের দিকে নামছে, দিদি সুরেলা গলায় চিলের মতো শব্দ করছেন। বাঁইবাই করে ঘুরছে দোলা। মনে হচ্ছে ছিটকে আকাশের দিকে উঠে যাব। শরীরের কোনো ওজন আছে বলে মনে হচ্ছে না। দিদির কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুজিয়ে ফেললুম। দোলা ঘুরছে। নিবিড় স্নেহে জড়িয়ে রেখেছেন দিদি। এইসময় মনে হল নাই বা থামল এই দোলা। কিন্তু থামল।
দিদি বললেন, নামবে? না আর একপাক ঘুরবে?
ঘুরব। আমার ঘুম এসে গেছে।
দেখেছ তো অভ্যাস হয়ে গেলে কেমন ভাল লাগে!
আমি হাসলুম। আবার শুরু হল ঘোরা। এইবার দিদিকে আমি দুহাতে জড়িয়ে ধরলুম। ধূপ ধুনোর গন্ধ শরীরে। তুলোর মতো নরম। পাথরের মতো শীতল। অদ্ভুত একটা ভাব আসছে মনে। আনন্দের হিমপ্রবাহ নেমে আসছে অদৃশ্য উৎস থেকে। এইবার শেষ পাকে আমাদের দোলাটা থামাল সবার ওপরে। শূন্যে ঝুলে রইলুম বেশ কিছুক্ষণ!
মাটিতে নেমে এলুম। শরীর টলছে। নেশা লেগে গেছে। পাইপাঁই করে ঘুরলে খিদে পায়। আমরা চিনেবাদামের কাছে গেলুম। বাদাম কিনে আমরা একটা কদমগাছের তলায় গিয়ে বসলুম। সেখানে আমাদের জন্যে কেউ একটা গোরুর গাড়ির চাকা ফেলে রেখেছিল। আমরা পাশাপাশি সেই চাকার ওপর বসলুম। চিনেবাদামের খোলা ভাঙার পুটুসপুটুস শব্দ। দিদির সাদা শাড়ি অন্ধকারে আরও সাদা দেখাচ্ছে। আমাদের পেছন দিকে একটু দূরে লোহার জিনিসের স্টল। কড়া, চাটু, হাতা, খুন্তি। সামনের দিকে একসঙ্গে অনেক কিছু চলছে। ইন্দ্রজালের তাবুর সামনে দাঁড়িয়ে। একটা লোক ভয়ংকর চিৎকার করছে।
দিদি বললেন, ভীষণ ভাল লাগছে। আরও ভাল লাগছে তুমি আছ বলে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে তুমি আমার কৃষ্ণ। সংসারের বাঁধাধরা আমার একদম ভাল লাগে না। কী ছাই হাতা-খুন্তি-বেড়ি! মাঝে মাঝে মনে হয় বাউল হয়ে যাব। কেমন দেশে দেশে ঘুরব গান গেয়ে। অত দূরে বসেছ কেন? কাছে সরে এসো, গায়ে গা লাগিয়ে বোসো। দাঁড়াও বাদামগুলো আমার কোলে ঢালি। নাও এইখান থেকে তুলে তুলে নাও। আজ আকাশের রং দেখেছ? একেবারে শ্রীকৃষ্ণের গায়ের রং।
আমার শরীরে দিদির শরীর ঠেকে আছে। আকাশের রং শ্রীকৃষ্ণের মতো বলার সঙ্গে সঙ্গে দিদির শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। ফিসফিস করে বললেন, শিগগির শিগগির, আমাকে নামিয়ে আনন।
ভয় পেয়ে গেলুম। কোথা থেকে নামাব! কোথা থেকে নামাব দিদি? তুমি তো আমার পাশেই রয়েছ।
দিদির কাঁপুনি আরও বেড়ে গেছে। ম্যালেরিয়া রোগীর মতো কাঁপছেন ঠকঠক করে। কোনওরকমে বললেন, আমার মন ওপরে উঠে যাচ্ছে। আমি অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি। শিগগির আমার বুকে হাত রাখো।
অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গেলুম। কোনও চিন্তার অবকাশ নেই। খুব ভয়ে ভয়ে বুকে হাত দিলুম। সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনার অতীত। মেলার নেশা-ধরানো রাত। শ্যামকৃষ্ণ আকাশ। স্ফটিকের টুকরো তারা। ঝাপুর ঝুপুর কদমের পাতায় বাতাসের হিমসিম শব্দ। ইন্দ্রজালের চিৎকার। নাগরদোলার। ছুঁচোর ডাক। আমার হাত। দিদি আমাকে পাগলের মতো জড়িয়ে ধরলেন। এই প্রথম একটা। অনুভূতি হল, দেহ দিয়ে দেহের বাইরে যাওয়া যায়। আমার অস্তিত্ব মন্দিরচূড়ার পতাকার মতো পতপত করে উড়তে লাগল। আমার এমন কিছু দর্শন হল, যা অতীন্দ্রিয়। অলৌকিক। দিদি আমার । শরীরের সর্বত্র হাত বোলাচ্ছেন। সাধারণ কোনও মানুষ আড়াল থেকে দেখলে ভাববে অশ্লীল একটা। কিছু হচ্ছে। একমাত্র আমিই জানি কী হচ্ছে! ইন্দ্রিয়ের জট খুলে বেরিয়ে আসছে নিরাসক্ত বিশুদ্ধ অনুভূতি। সমস্ত শরীরে যেন অমৃতক্ষরণ হচ্ছে। সারাশরীর মধুর মতো চটচটে। মাথার ঢাকনা যেন খুলে গেছে। সেখানে কে যেন একখণ্ড বরফ বসিয়ে দিয়েছে। কানে শুনতে পাচ্ছি ঠিঠিন খঞ্জনির শব্দ। দেখতে পাচ্ছি সামনে জমিতে চূর্ণ চূর্ণ চাঁদের টুকরো। নাকে আসছে পদ্মের গন্ধ। কখনও মনে হচ্ছে আমি বিশাল, কখনও মনে হচ্ছে বিন্দুর মতো ক্ষুদ্র প্রসারিত হচ্ছি, সংকুচিত হচ্ছি। কখনও মনে হচ্ছে আমি জমাট বরফ, কখনও তরল নদী।
