ছোটদাদু এমন লোভ দেখিয়েছিলেন, লোটাকম্বল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি আর কী! মহাজীবনের লোভে ভেতরটা খচরমচর করে উঠল, তারপরে একসময় নেতিয়ে পড়লুম। মনে পড়ে গেল এক মহাত্মার অদ্ভুত কথা; বোল সবহি ঢোল বরাবর,/পোল সবহি মে পুরা। /অবোল তত্ত্ব কো। সমঝাওতনহি/জো সমঝাওত সো কুরা ॥ ঢোলের মধ্যে যেমন ফাঁক বা শূন্য থাকে, সেইরকম বোল বা বাক্যের মধ্যেও ফাঁক থাকে। বাণীর অতীত তত্ত্বকে প্রকাশ করা যায় না। যা প্রকাশ হয় তা মিথ্যা। সার নেই। শ্রীরামকৃষ্ণকে একজন বলেছিলেন, মহাশয় আমাকে সমাধিটা শিখিয়ে দিতে পারেন? শুনে সবাই হেসেছিলেন। সমাধি শেখানো যায় না। শিরোদেশ হল সপ্তমভূমি–সেখানে মন গেলে সমাধি হয়। ব্রহ্মজ্ঞানীর ব্রহ্মের প্রত্যক্ষ দর্শন হয়, কিন্তু তখন আর শরীর থাকে না। সবসময় বেহুশ, কিছু খেতে পারেন না, মুখে দুধ দিলে গড়িয়ে যায়। ওই ভূমিতে একুশ দিনে মৃত্যু।
বাস্তববাদী হরিশঙ্কর এই প্রসঙ্গে সুন্দর একটি গল্প বলেছিলেন:
এক শহরে এক সিঁদেল চোর বাস করত। সিঁদ কেটে লোকের বাড়িতে চুরি করাই তার পেশা। লোকটির বয়স হল। যুবক ছেলে হঠাৎ একদিন এসে বললে, বাবা, তোমার তো যাওয়ার সময় হল, বিদ্যেটা আমায় শিখিয়ে দিয়ে যাও, আমাকে তো করে খেতে হবে। বাবা বলল, ঠিক আছে, আজই তা হলে চলো আমার সঙ্গে।
গভীর রাতে একটা বাড়ি বেছে নিলে। বড় চোর নিপুণ একটি সিধ কেটে ছেলেকে নিয়ে ঢুকে গেল। ঘরে এসে দেখলে বিশাল এক সিন্দুক। বড় চোর সিন্দুকের তালা খুলে দিয়ে ছেলেকে বললে, ঢোক। সব মালপত্র বেছে বেছে বাইরে ফেল।
বাবার আদেশ। ছেলে ভেতরে ঢুকল। সঙ্গে সঙ্গে বড় চোর সিন্দুকের ডালা বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দিল। নিঃশব্দে গর্ত দিয়ে বেরিয়ে এল রাস্তায়। তারপর করল কী! বাড়ির গেট ধরে নাড়া দিয়ে চিৎকার করে বলে গেল, তোমাদের বাড়িতে চোর পড়েছে গো।
বাড়িসুদ্ধ সবাই উঠে পড়ল। আলো নিয়ে খোঁজাখুঁজি। স্টোর রুমে গিয়ে দেখলে সবই ঠিক আছে। সিন্দুকও তালা বন্ধ। কোথায় চোর! ঘর ছেড়ে সবাই বেরিয়ে গেল। সব শেষে দাসী। তার হাতে বাতি। সিন্দুকে বন্ধ চোরের ছেলে ভাবছে, সর্বনাশ! বেরোতে না পারলে তো দম আটকে মরতে হবে। সে তখন বারকয়েক খুডুর খুডুর শব্দ করল। দাসী:যেতে গিয়েও ফিরে এল। মরেছে, ইঁদুর ঢুকেছে। সে তখন তাড়াবার জন্যে যেই ডালা খুলেছে, চোরের ছেলে এক লাফে বেরিয়ে এসে, দাসীকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে আলো নিবিয়ে অন্ধকারে দে চম্পট। দাসীর চিৎকার, চোর চোর! বাড়ির সবাই রাস্তায় নেমে চোরের পেছনে ছুটছে। চোর দেখলে, সে আর পারছে না ছুটে। প্রায় ধরা পড়ে যায় আর কী! পথের পাশেই মস্ত এক ইদারা। চোর দু’হাতে বেশ বড় একটা পাথর তুলে তার মধ্যে ফেলে দিয়ে, আবার ছুটতে লাগল। যারা অনুসরণ করছিল, তারা বোকা বনে গেল। ভাবলে চোর ইদারায় ঝাঁপ মেরেছে।
ভোর হচ্ছে, ছেলে বাড়ি ঢুকল। দেখলে বাবা আয়েশ করে বসে চা খাচ্ছে। ছেলের রাগ অভিমান দুটোই হয়েছে। বাবাকে বললে, তুমি আমার সঙ্গে এইরকম একটা ব্যবহার করতে পারলে?
বাবা হেসে শান্ত গলায় বললে, বোস, আগে বল, তুই কীভাবে ফিরে এলি?
ছেলে সব বললে।
বাবা বললে, পুত্র, তুমি তো সবই শিখে গেছ। এ তো শেখানো যায় না, নিজেকে শিখতে হয়।
হরিশঙ্কর বলেছিলেন, ধর্ম, পথ, নিরাসক্তি, মায়ামুক্তি, সংসার থেকে বেরিয়ে আসার কায়দা শেখানো যায় না, নিজেকে শিখতে হয়।
ছোটদাদুর ভিজে ভারী হাত আমার কাঁধে এসে পড়ল, চলো আমার হয়ে গেছে।
এইবার পট পরিবর্তন। আমি আর বিমলাদি মেলায়। বিমলাদির ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে। একটা জায়গায় গ্রামের সব মানুষ এসে জড়ো হয়েছে। আলোয় আলো। কাঁ কোঁচ নাগরদোলা, পুতুল নাচ। মহাভারতের পালা। দিব না দিব না সূচ্যগ্র মেদিনী। দুই মাতাল টলছে। একজন বলছে, আমি নিমাইচন্দ্র। আর একজন বলছে, চিনি রে শালা। আমি যে নিতাইচন্দ্র। বিমলাদি কাঁধ ধরে বললে, সরে এসো, জাত মাতাল।
২.৪৩ Every man is a volume
রাত হয়েছে, তাও কী জমজমাট মেলা। প্রায় দামোদরের তীর পর্যন্ত চলে গেছে। মানুষ ঘুমোবে না। ঘুম তো আছেই। তিনটে দিন না হয় জাগল। এত আনন্দ একসঙ্গে এক জায়গায় এসে জড়ো হয়েছে। একপাশে একটু নিরালা জায়গায় রামায়ণ হচ্ছে। বাঁকুড়ার বিখ্যাত পাঠক হারমোনিয়ম বাজিয়ে রামায়ণ গান করছেন। বেশ ভিড় হয়েছে। এক ছাউনির তলায় এসেছে কৃষ্ণনগরের পুতুল। পুতুলের কী আকর্ষণ! বিমলাদি আর আমি দুজনেই দাঁড়িয়ে পড়েছি। জীবন্ত সব চরিত্র। কৃষ্ণ। গোপাল হামা দিচ্ছে। কলসি কাঁখে মহিলা। জাল কাঁধে জেলে। সাপুড়ে সাপ খেলাচ্ছে। কী নেই! হ্যাঁজাকের জোরালো আলোয় কল্পনার জগৎ।
বিমলাদি বললেন, কিনতে ইচ্ছে করে, কিন্তু ভীষণ দাম।
আমি আপনাকে কিনে উপহার দিই। বলুন, আপনার কোনটা পছন্দ?
আমি নোব কেন?
ভাই দিচ্ছে বলে।
আপনি আপনি করলে বোন হয়!
এই কথা? বেশ তুমি বলছি। বলো দিদি তোমার কোনটা পছন্দ!
বাঁশি হাতে কৃষ্ণ। এখন কিনো না, আগে সবটা ঘুরে আসি। নাগরদোলায় চড়ব। ভীষণ মজা লাগে! মনে হয় ছোট হয়ে গেছি।
আমার যে ভীষণ ভয় করে দিদি।
দুর! তুমি আমার পাশে বসবে, আমি তোমায় দু’হাতে শক্ত করে ধরে থাকব। চিনেবাদাম খাবে? গরম চিনেবাদাম খেতে ভীষণ ভাল লাগে।
