গোরু অমনি আমুদে চোখে ছোটদাদুর দিকে তাকিয়ে গদগদ একটি ডাক ছাড়ল, হাম্বা।
ছোটদাদু বললেন, হ্যাঁ মা।
গোরু বললে, হাম্বা।
মা আর হাম্বা এই চলতে লাগল। সে এক অপূর্ব ঐকতান। সন্ধ্যার মগ্ন পরিবেশ চনমন করে উঠল। মহামায়ার পূজার ঘণ্টার টিংলিং শব্দ। বিমলাদির উনুনের ধোঁয়া পাকিয়ে পাকিয়ে আকাশমুখী। পাতার ফাঁকে ধকধকে সন্ধ্যাতারা। আমরা নিঃস্তব্ধ। মানুষে আর পশুতে অদ্ভুত বাক্যালাপ।
বিমলাদি ছুটে এলেন, ব্যাপারটা কী? তাঁদের গোরু তো কোনওদিন এমন উল্লাসে ডাকাডাকি করে না। আজ কী হল?
তার বিস্ময় প্রশ্ন হবার আগেই ছোটদাদু বললেন, তোমরা বুঝবে না মা, আমাদের অন্তরের কথা। কিছু হল। ওর সবটাই তো মা। দুগ্ধবতী জননী আমার। যাও দুধ দোয়ার ব্যবস্থা করো। তারপর ভরতি এক গেলাস চা।
ছোটদাদু গোরুকে বললেন, যাও মা, আজ একটু বেশি দুধ দিয়ে, বাড়িতে অনেক অতিথি। গোরু আহ্লাদের শেষ ডাকটি ডেকে গোয়ালের দিকে চলে গেল হেলতে দুলতে, ভার-ভরন্ত চালে।
এই ঘটনা দেখে পণ্ডিতমশাই মুগ্ধ হয়ে বললেন, আপনি অবশ্যই সাধনজগতে অগ্রসর হয়েছেন। শ্রবণ, দর্শন, আস্বাদন ইত্যাদি হয়েছে। আচ্ছা বলতে পারেন, কাম কি জয় করা যায়? কামই তো বড় শত্রু।
হরিশঙ্কর সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আজ্ঞে না, যায় না। ঈশ্বর যদি কোথাও থাকেন, তিনিও তা চান না, কারণ তা হলে তাঁর যাবতীয় পরিকল্পনা ভেস্তে যাবে। কামই মানুষের জাগ্রত অবস্থা।
পণ্ডিতমশাই সঙ্গে সঙ্গে বললেন, হল না। নিদ্রাতেও কাম। কিছু করতে চাওয়াটাই কামনা। স্বপ্ন কামোথিত।
হরিশঙ্কর বললেন, মানুষের জাগ্রত অবস্থা ও নিদ্রিত অবস্থার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। চেতনা নিদ্রিত হয় না। ঢেউ থাকলেও সমুদ্র, না থাকলেও সমুদ্র। জল আর বরফে যে তফাত তা আমাদের দৃষ্টিতে। বুদ্ধিতে দুই সমান। জলই বরফ, বরফই জল। একমাত্র মৃত্যুতেই চিরনিদ্রা, চেতনার মৃত্যু। আমাকে জাগতে হবে এই কামনা নিয়েই মানুষ নিদ্রিত হয় আর ঠিক সময়ে জেগে ওঠে। কেন জাগতে হবে? সে এক কামনাপুঞ্জ, জীবিকা অর্জন করতে হবে, আহার করতে হবে, শরীরের চর্চা করতে হবে, শরীর রক্ষা করতে হবে। নিজের নিরাপত্তার তাগিদেই জাগরণ। এইবার আপনি খণ্ডন করুন।
পণ্ডিতমশাই স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। অবশেষে বললেন, মহাশয়, আপনি তো প্রকারান্তরে আমাকেই সমর্থন করলেন। আমি শুধু মানুষের দুটি অবস্থাভেদের কথা বলেছিলুম, জাগ্রত সচল অবস্থা, নিদ্রিত অচল অবস্থা। আপনি সে দুটিকে এক করে দিলেন। বেশ দিন। কিন্তু মূল প্রশ্ন, কাম কি জয় করা যায়? তা রয়েই গেল।
না যায় না। অসাধ্য।
পণ্ডিতমশাই ছোটদাদুর দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি মহাসাধক। আপনার অভিমত?
ছোটদাদু বললেন, তার আগে সমাধান করুন নিদ্রা কাকে বলে, জাগরণ কাকে বলে?
পণ্ডিতমশাই বললেন, চেতনার আচ্ছন্ন অবস্থাই হল নিদ্রা। নিদ্রার দুটি ভেদ, ক্লান্তিতে নিদ্রা আবার মোহনিদ্রা। বিচার যেখানে অবসিত। এ সবই হল তামসিক নিদ্রা। এর পাশেই আছে যোগনিদ্রা। অর্থাৎ চেতনা জাগ্রত অবস্থা থেকে অধোগমন করলে তামসিক, উধ্বগমন করলে যোগারূঢ়। অর্থাৎ সমুদ্রে যদি তলিয়ে যাই তা হলে এক, আর যদি মহাকাশে উড়ে যাই, তা হলে। আর এক। অর্থাৎ দুটি অবস্থাই বাস্তবচ্যুত অবস্থা। একটি অন্ধকার, অন্যটি আলোকিত। একটিতে তামসিক অভিজ্ঞতা অন্যটিতে সাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা। অর্থাৎ নিদ্রা হল দেহগত চেতনার নিমজ্জন অথবা অতিজাগরণ। অর্থাৎ…।
হরিশঙ্কর বললেন, অর্থাৎ নিদ্রা হল স্লিপ। একটা বিছানা, একটা বালিশ, এক গেলাস জল খেয়ে পা তুলে শুয়ে পড়ো। নিদ্রা দু’রকমের, এক নাক ডাকিয়ে ঘুম, আর এক নিঃশব্দে ঘুম। পেট গরমে স্বপ্ন, পেট ঠান্ডায় নিঃস্বপ্ন? মিটে গেল ঝামেলা।
ছোটদাদু বললেন, শয়ন, অর্থাৎ শ-এ অন। অর্থাৎ অন শ শ মানে চিতা। অর্থাৎ চিতায় ওঠার নাম শয়ন। শয্যা হল অস্থায়ী মৃত্যুর চিতা। আর শ্মশানে মহানিদ্রার চিতা। আমাদের তন্ত্রে শয্যা হল শ্মশান। সেই কারণে শয্যায় সাধনের বিধান।
হরিশঙ্কর বললেন, আমাদের কর্মতন্ত্রে নিদ্রা হল তামসিকতা। নিদ্রা হল আলস্য। ব্যাড হ্যাবিট। অনেকে জেগেও ঘুমোতে পারে।
এইবার এসো বৎস, কামনা বাসনার নিদ্রার অর্থ হল যোগভূমিতে জাগরণ, সাধকের উঠে বসা। ছোটদাদু বললেন।
পণ্ডিতমশাই বললেন, এই কামনা বাসনার নিদ্রা কেমন করে সম্ভব?
হরিশঙ্কর বললেন, খুব সহজ, একটা ল্যাঙোট পরুন। দুটো থান ইট একহাত এক বিঘত দূরে স্থাপন করে পঞ্চাশবার ডন, দরজার একটি পাল্লা ধরে একশোবার বৈঠক। এতেও যদি মন উসখুস করে তা হলে পঞ্চাশবার মুগুর ভাজুন, মনের তামসিকতা দূর হয়ে যাবে। এতেও যদি না যায়, কুড়ুল দিয়ে কাঠ চেলা করুন।
পণ্ডিতমশাই বললেন, অতিশয় দানবীয় পদ্ধতি। বুদ্ধিমান মানবীয় পদ্ধতির কথা জানতে চাই।
ছোটদাদু বললেন, সে পথ হল বিচারের পথ। বিচার করুন। প্রথম বিচার, কে চায়?
পণ্ডিতমশাই: আমি চাই।
ছোটদাদু: কোন আমি?
পণ্ডিতমশাই: অহং, অর্থাৎ যে-আমি দেহবোধ জাগায়।
ছোটদাদু: তা হলে ভোগ করতে চায় দেহ। দেহের ক্ষমতা কতটুকু! এইখানেই বিচারের শুরু। দেহের পক্ষে কতটুকু কতদিন ভোগ করা সম্ভব?
হরিশঙ্কর: অর্থহীন আলোচনা। এই আত্মা-প্রশ্ন মানুষের সামনে ঝুলিয়ে রেখেছেন মহামানবেরা অনাদিকাল ধরে। সো হোয়াট, তাতে আমাদের বয়েই গেল। যতটুকু ভোগ সম্ভব, ততটুকুই করব, যতটুকু করা যাবে না, তার জন্য আক্ষেপ করব। লালচ বড় বালাই, জেনেও লালসায় ঘি ঢালব। তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই ॥ মনোহরণ চপলচরণ সোনার হরিণ চাই। এই হল সাধারণ মানুষ, কিন্তু অসাধারণ রবীন্দ্রনাথ কোথায় গেলেন? শোনো তা হলে, তোরা পাবার জিনিস হাটে কিনিস, রাখিস ঘরে ভরে। যারে যায় না পাওয়া তারি হাওয়া লাগল কেন মোরে ॥ এই হাওয়াটা কে লাগাবে ভাই? যে- হাওয়া গায়ে লাগলে রবীন্দ্রনাথের মতো বলা যায়, আমি আছি সুখে হাস্যমুখে, দুঃখ আমার নাই। আমি আপন-মনে মাঠে বনে উধাও হয়ে যাই । নিজের ভেতর থেকে কামনা বাসনার অন্ধ প্রকোষ্ঠ থেকে নিজেকে বের করে এনে উধাও করে দাও। সিনেমার হিরো-হিরোইনের মতো টুলুলুলু করে গাছের ফাঁকে ফাঁকে নাচানাচি নয়, মনে মুক্তি। মহামান্য নৈয়ায়িক পাত্ৰাধার তৈল কি তৈলাধার পাত্র এবংবিধ বিচারে অশ্বডিম্ব হবে। বসে বসে নিতম্ব ভারী করে আসুন নৃত্য করি। ফক্সট্রট ট্যাঙ্গো, কোনটা আপনি জানেন?
