দামোদরের তীরে এই সন্ধ্যা একে একে আমাকে সেই অতীত ফিরিয়ে দিতে লাগল। একটি মানুষের একক সংগ্রামের ইতিহাস। আমার অতীত কিছু নেই। অজগরের পৃষ্ঠে আরোহণ করে পিন্টু নামক ভেকের ভ্রমণবৃত্তান্ত। একেবারে অর্থহীন একটা জীবন। ঝকঝকে মানিব্যাগ। খোলো, একটাও নোট নেই। একটা বাসের টিকিট। চালক হরিশঙ্কর। জানলার ধারে বসে-থাকা আমি এক সুখী যাত্রী মাত্র।
ভাবালুতা চটকে গেল। হঠাৎ হরিশঙ্কর সেনানায়কের মতো হুংকার ছাড়লেন, উঠাও গাঁঠরি। ছোটদাদু চোখ বুজিয়ে বসে ছিলেন। চোখ না-খুলেই প্রশ্ন করলেন, কী বলতে চাইছিস? বাংলায় বল।
হরিশঙ্কর বললেন, ভীষণ ঘাস-ঘাস লাগছে। একটা আইডিয়া খেলে গেল। শুধুই কর্তব্য আকর্ষণ শূন্য। আমরা একটা জায়গায় যাব। এর মধ্যে বাড়তি কোনও আকর্ষণ আছে?
ছোটদাদু বললেন, কেন নেই? নতুন জায়গা, নতুন দৃশ্য, নতুন মানুষ।
এর বেশি কিছু আছে?
না।
আমি আরও কিছু আকর্ষণ ঢোকাতে চাই।
কীভাবে?
আমি এই যাওয়াটাকে করে তুলব আকর্ষণীয় এক অ্যাডভেঞ্চার। এখনই আমরা বেরিয়ে পড়ব। এই অন্ধকার রাত, বনের পথ, ডাকাতের ভয়। সারারাত আমরা হাঁটব। ভয়ে একজনের বুক ঢিপঢিপ করবে।
কার, আমার?
তোর বুক? ওটা তো পাথরের বেদি। ভয় করবে আমার পুত্রের। ভাগ্য প্রসন্ন হলে ডাকাতের কবলেও পড়তে পারি। ডাকাত, ডাকাতি, চিরকাল শুনেই এসেছি। একটা অভিজ্ঞতা হোক না! ইংরেজিতে একটা কথা আছে হ্যান্ডলিং। ব্যবহারবিধি। স্টোভ, বন্দুক, ক্যামেরা, টেলিস্কোপ, ঘড়ি, এক-একটা জিনিস এক-এক কায়দায় নাড়াচাড়া করতে হয়। ডাকাতকে কীভাবে হ্যান্ডল করতে হয়, সেটা আমরা শিখতে পারব। তুই কোনওদিন ডাকাতের পাল্লায় পড়েছিস?
না, উলটোটা হয়েছে। ডাকাত আমার পাল্লায় পড়েছে। তারাপীঠে আমার আস্তানায় এসে কান্নাকাটি। বাবা ভাল করে দাও। ডাকাত বলে তো পির নয়! আমরা ডাকাতকে ভয় পেতে পারি, ব্যাধি তো আর ডাকাত-পুলিশ মানে না। দু’পক্ষকেই ধরে। একপাশে থানাদার বসে আছে, পেটে ক্যান্সার। আর একপাশে ভৈরব ডাকাত, ডান অঙ্গে প্যারালিসিস।
হরিশঙ্কর বললেন, নে উঠে পড়। রাতের জঙ্গল একটা দেখার জিনিস। শজারুর নাচ দেখেছিস?
কী শজারু দেখাচ্ছিস! শেষরাতে চাঁদের আলোয় শেয়ালের নাচ দেখেছিস?
তুই হনুমানের ধ্যান দেখেছিস?
তুই রাতচরা রাজহংস দেখেছিস?
উতোর-চাপান আরও কতদূর এগোত কে জানে? সামনে এসে দাঁড়ালেন পণ্ডিতমশাই। একেবারে রাজবেশ। গরদের ধুতি-পাঞ্জাবি। ভুরভুর আতরের গন্ধ। চোখে কাজল। মুখে পাউডার। সবিনয়ে বললেন, এই আমার অভিসারের সময়। নিজেকে প্রস্তুত করে রাখতে হয়। বলা তো যায় না, দেখা তো হয়ে যেতে পারে। প্রস্তুত ছিলাম না বলে ফিরে চলে গেলে দুঃখের সীমা থাকবে না।
হরিশঙ্কর বললেন, কার অভিসারে চলেছেন? শ্রীরাধিকা?
পণ্ডিতমশাই বসতে বসতে বললেন, গণিতজ্ঞ হয়ে ধরতে পারলেন না? আমি বৈদান্তিক, জ্ঞানমার্গী। মধুর রসের পথ আমার পথ নয়। মৃত্যুর অভিসার। ভোলানাথ আমার চোখ খুলে দিয়েছে।
ছোটদাদু বললেন, কোন ভোলানাথ? উমার স্বামী?
না মহামান্য। গোয়ালা ভোলানাথ, যে আমাকে নিত্য আধসের করে দুধ সরবরাহ করত। সেই ভোলানাথ সদাসর্বদাই এই জেলার বিখ্যাত গামছা পরিধান করে থাকত। অর্থের অভাব ছিল না, কিন্তু কৃপণ। বারবার বলেছিলুম, ভোলা ব্যাটা, তোর টাকা খাবে কে? সন্ধেবেলায় একটা ধুতি পরার মতো দয়ালু হনা। দিবা দ্বিপ্রহর পর্যন্ত গামছা সহ্য করা যায়। তারপর নৈব চ। ভোলা গামছা পরেই মারা গেল। কী অগৌরবের কথা! গামছা, ফতুয়া, পকেটে বিড়ির ডিবে। পুষ্পক রথে আরোহণ করে স্বর্গে যায় কে? ভোলা গোয়ালা। স্বর্গের সিংহদুয়ারে অপ্সরাগণ লজ্জায় অধোবদন।
বিষ্ণুপদ মাঠে প্রাতঃকৃত্য করতে করতে চলে গেল। কী অগৌরবের কথা! মানুষ বলে কি আমাদের কোনও মানসম্মান থাকতে নেই মৃত্যুর কাছে! তাই আমার এই রাজবেশ। রজনীতেই আমার মৃত্যু হবে। তারকারাজির পথ বেয়ে চলে যাবে আমার স্বর্গীয় শকট।
ছোটদাদু বললেন, কেমন বৈদান্তিক! মৃত্যুর কথা ভাবছেন?
ভাবব না? মৃত্যুই যে আমাকে ঝকঝকে নতুন সুন্দর পোশাক দেবে। এই শততালি প্রাচীন পোশাক তো আর চলে না। জীর্ণ হয়েছে। আমি এখন তাম্বুলসেবা করব। আমার বিমলা মা কোথায়?
পণ্ডিতমশাই ডাকলেন, বিমলা মা। উত্তর এল, যাই বাবা।
পণ্ডিতমশাই বললেন, আসুন সুধিজন, আমরা বিচারে বসি। বিষয় আপনারাই নির্বাচন করুন।
হরিশঙ্করের মুখেচোখে বুদ্ধির বিদ্যুৎ আভাস। এতক্ষণ বড় বোদা হয়ে ছিলেন। গণিত জ্যামিতি পরিমিতি থেকে দূরে। একদল সহজ-সরল মানুষের অতি সাধারণ জগতে। এখন সামনেই ন্যায় ও দর্শনের এক পণ্ডিত। বুদ্ধির ঘষাঘষির অপূর্ব সুযোগ উপস্থিত। জন্ম আর মৃত্যুর মাঝখানে এই জীবন উপত্যকায় মানুষ কী দর্শন করে? কাকে দর্শন করে? হঠাৎ রবীন্দ্রনাথ আমাকে ছুঁয়ে গেলেন। এই মুহূর্তে কেউ যদি আমাকে গাইতে বলতেন, আমি গেয়ে উঠতুম :
তার হাতে ছিল হাসির ফুলের হার কত রঙে রঙ করা।
মোর সাথে ছিল দুখের ফলের ভার অশ্রুর রসে ভরা ॥
২.৪১ If you ever need a helping hand
অতিশয় ভরসার কথা। বনপথে গভীর রাতে আতঙ্ক বুকে নিয়ে সেই অচেনা গ্রামের দিকে আর যেতে হবে না। পণ্ডিতমশাই হঠাৎ কামজয়ের প্রসঙ্গ পেড়েছেন। একটু আগে বেশ একটু মজা হল, দুগ্ধধবল একটি গাভী কোথা থেকে হটরপটর করে উঠোনে এসে দাঁড়াল। ছোটদাদু দেখেই বললেন, এই যে এসেছ, তোমাকেই আমি স্মরণ করছিলুম মা।
