পণ্ডিতমশাই: মহামান্য! আমি আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না। আপনি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করছেন?
ছোটদাদু: অবশ্যই নয়। যত মত তত পথ। মূল কথা হল ভুলে থাকা। ভাবে থাকা। ঘোরে থাকা। ও ওর নিজের ভাবে, নিজের ঘোরে আছে। পথ খুঁজে পেয়েছে। ওর কোনও কামনা বাসনা নেই। মায়ামুক্ত অঘোর।
হরিশঙ্কর: মোটেই না। কামনা বাসনায় জরজর হয়ে আছি। সবচেয়ে বড় কামনা, ছেলেটা যেন আমার মানুষ হয়। ছোট কামনা, এখনও কেন চা আসছে না!
ছোটদাদু: ওটা কামনা নয় আকাঙ্ক্ষা। দুটোই তোমার আত্মিক চাওয়া। না পেলে তুমি পাগল হবে না, পেলে তোমার একটাই লাভ, আত্মিক তৃপ্তি। যাকে আমরা ভোগ বলি তাতে তৃপ্তি নেই, শুধুই অতৃপ্তি। আত্মিক সুখে তৃপ্তি, দেহসুখে অতৃপ্তি।
বিমলাদি একটা থালার ওপর চারটে গেলাস সাজিয়ে আসরে প্রবেশ করলেন। প্রায় নাচের ভঙ্গিতে। ছোটদাদু বললেন, এসেছে এসেছে। বহু প্রতীক্ষিত সেই চা এসেছে। হরিশঙ্কর তাড়াতাড়ি উঠে থালাটা ধরে নিলেন। ছোটদাদু বললেন, পিন্টু, কাজটা তোমারই করা উচিত ছিল।
বাবা এত তাড়াতাড়ি উঠলেন যে আমি হেরে গেলুম।
হরিশঙ্কর বললেন, একেই বলে রিফ্লেক্স। ওর একটু তানানানা স্বভাব। স্লাগিশ।
বিমলাদি বললেন, আপনি আমার ভাইটাকে কেবল বকেন!
হরিশঙ্কর বললেন, যুবক হবে চিতাবাঘের মতো। তিরের মতো, ইস্পাতের মতো। স্প্রিংয়ের মতো। সনি লিস্টনের মতো।
ছোটদাদু চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, চমৎকার। তারপর হরিশঙ্করকে বললেন, সনি লিস্টনকে টানলি কেন?
হরিশঙ্কর গেলাসের গোলে পড়ে গেছেন। একটা গেলাসে সাদা দুধ। বিমলাদি বললেন, ওটা পণ্ডিতমশাইয়ের দুধসাবু।
হরিশঙ্কর হাসিতে ফেটে পড়লেন, দুধসাবু! রোগীর খাদ্য শিশুর পথ্য! চা খেলে কী হত পণ্ডিতমশাই?
আমি যে চায়ে অভ্যস্ত নই।
ঠিক আছে, আজ যখন হয়েছে খেয়ে দেখুন না, ভেষজ পদার্থ।
যকৃৎ খারাপ হয়ে যাবে।
হায় নৈয়ায়িক! এখনও ভয়! খান, সাবু খেয়ে আরও একশো বছর বাঁচুন!
পণ্ডিতমশাই কাতর কণ্ঠে বললেন, মহাশয়, জীবনের আকাঙ্ক্ষা আমার নেই। আপনার পুত্রের মতো আমার একমাত্র পুত্রটি চলে গেল। স্ত্রী গত। জননী আজও জীবিত। দুটি সেবার কারণে এই অক্ষম জীবন ধারণ, জননীর সেবা ও শাস্ত্রসেবা। এই দুধসাবুটুকুই আমার রাতের আহার। আমার বিমলামায়ের ব্যবস্থা। আরও একটু আছে। যাওয়ার সময় সেইটুকু নিয়ে যাব। আমার মা খাবেন। এর মধ্যে আমার কোনও বাঁচার আকাঙ্ক্ষা নেই। আমি যেতেই চাই।
হরিশঙ্কর কিছুমাত্র অপদস্থ না হয়ে বললেন, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেন পণ্ডিতমশাই।
পণ্ডিতমশাই বললেন, পরীক্ষা? আমাকে আপনি কী পরীক্ষা করছিলেন?
আপনি জীবনের সত্যে উপনীত হতে পেরেছেন কি না! কতটা স্বাবলম্বী আপনি? আপনার ব্যক্তিত্বের ততুটি যথেষ্ট দৃঢ় কি না! দেখলুম না, আপনার মান ও অভিমান দুটিই প্রখর, যথেষ্ট রোমান্টিক। আপনার হরমোন বিভাজনে স্ত্রী হরমোনের প্রাচুর্যই বেশি। ন্যায়, বেদান্ত, স্মৃতি, শ্রুতির পরিবর্তে কাব্য, অলংকার, রসশাস্ত্র প্রভৃতির মধ্যে আপনার বিচরণ বাঞ্ছনীয় ছিল। মানুষের মধ্যে জাতিতে আপনি লতা, বৃক্ষ নন। আপনি অবলম্বন খোঁজেন। আপনি দুঃখবিলাসী। সহানুভূতিভোজী। সর্বোপরি আপনার ভোগবাসনার নিবৃত্তি হয়নি। আপনার উচিত এই সাধক, ওই। যে চায়ের গেলাসে নিরাসক্ত চুমুক দিচ্ছেন, আর মৃদু মৃদু হাসছেন, ওঁর শরণ নেওয়া। জীবনের অবশিষ্ট পথ কোন যষ্ঠি অবলম্বন করে হাঁটবেন, কীভাবে সত্যদর্শন হবে, ওই মহাপুরুষই বলতে পারবেন। হয়তো আপনার কারণেই তাঁর এই আকস্মিক আগমন। আপনি কষ্টে আছেন। পণ্ডিতমশাই। আপনি আপনার কোনও একটি অপরাধ ভুলতে চাইছেন।
ছোটদাদু হাসতে হাসতে বললেন, কাছাকাছি যেতে পেরেছিস হরিশঙ্কর। এক একটা মানুষ হল অনধিত এক একটা বই। শুধুমাত্র মলাটটা আমরা দেখতে পাই। নাম লেখা। ভেতরে অধ্যায়ের পর অধ্যায়, ঘটনার ঘনঘটা। তুমি মলাটের ভেতর কিছুটা ঢুকতে পেরেছ। এঁর জীবনের চারটি অপরাধ, স্ত্রীর প্রতি অবহেলা, কৃপণতার জন্যে পুত্রের মৃত্যু, যৌবনে মাতাকে অসম্মান, অবশেষে এক বিধবার সম্পত্তি গ্রাস। এ ছাড়া কোনও এক সময় গোপনে গণিকাগমন ও মদ্যপান।
পণ্ডিতমশাই কোনওরকমে গেলাসটি নামিয়ে রেখে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। মুখে ভয়ংকর এক যন্ত্রণার ছায়া। ভীষণ খারাপ লাগল। কেন ছোটদাদু এমন করেন! শক্তি আছে বলেই কি, যেখানে সেখানে তার অপপ্রয়োগ করতে হবে? কী প্রয়োজন ছিল মানুষের ভেতর থেকে মানুষকে টেনে বের করার? বেশ তো হচ্ছিল দাবাখেলার মতো কথার খেলা। মগজের চালাচালি। পণ্ডিতমশাইকে দুহাতে জড়িয়ে ধরলুম। ভীত পশুর মতো কাঁপছেন।
ছোটদাদু বললেন, মন আর মুখ এক করবেন। মা বললে জননীই ভাববেন। শুধু শরীর নয়, মনেও ভোগ হয়। রমণের চিন্তাতেও রমণ হয়। স্বপাকে স্বর্গলাভ হয় না, স্ববশে হয়। জীবনদীপ নির্বাপিত হবার প্রাক্ মুহূর্ত পর্যন্ত নারীসম্ভোগ ইচ্ছা থাকে। জীব যোনিসভৃত। অবচেতনার গভীরে সেই চেতনা সুপ্ত। আপনি কী করবেন আমিই বা কী করব? বারেবারে প্রশ্ন করছিলেন কামজয়ী কি হওয়া যায়? অর্থাৎ ওই রিপুটি প্রৌঢ়কেও পীড়া দিচ্ছে। যায় না মহামান্য। মহাভারতকার কী বলছেন? ইন্দ্রিয়ানাঞ্চ পঞ্চানাং মনস্যে হৃদয়স্যচ। মনে পড়ছে পণ্ডিতমশাই ভীমসেন বলছেন যুধিষ্ঠিরকে! রূপাদি বিষয়ে পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং মন ও বুদ্ধির যে প্রীতি, যে ভাললাগা, তারই নাম কাম। ধর্ম, অর্থ, কাম জীবনে তিনটির উপাসনাই প্রয়োজন। সেইটাই বাস্তব পরামর্শ। শুধু ধর্ম শুধু অর্থ শুধু কাম এক ধরনের অসুস্থতা, অস্বাভাবিকতা। মানুষের একটি দিনকে তিন ভাগ করার পরামর্শ দিয়েছেন বেদব্যাস। ধর্মং পূর্বে ধনং মধ্যে জঘন্য কামমাচরেৎ। দিনের প্রথম ভাগে কর্ম। কর্ম অর্থে ধর্মকর্ম। মধ্যম ভাগে অর্থ, অন্তিম ভাগে কাম। এই হল প্রতিদিনের অনুশাসন। কিন্তু কতদিন? বেদব্যাস বলছেন, আয়ুকেও ভাগ করো। সেখানে কী? কামং পূর্বে ধনং মধ্যে জঘন্যে ধর্মমাচরেৎ। পণ্ডিতমশাই বিধান বদলে গেল। যুবাবস্থায় কাম, প্রৌঢ়াবস্থায় অর্থ, আর বৃদ্ধাবস্থায় ধর্ম। আপনার জীবন কি সেইভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে? আপনি আফিং সেবা করেন কেন?
