বিমলাদি কোথা থেকে এক ধরনের মাটি নিয়ে এলেন। বললেন, বেশ করে সারাশরীরে মেখে পুকুরে মারো এক ডুব। তিনিও মাখতে লাগলেন। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ঝোঁপঝাড় থেকে বেরিয়ে এসেছে বড়-ছোট ব্যাং। থুপুর থাপুর লাফ চলেছে এদিকে-ওদিকে। ভয় করছে। প্রথম হল সাপ। তারপর মনে হল সাপ মানুষকে একবারই কামড়ায়। বজ্রাঘাত একবারই হয়। অর্থাৎ মানুষ মারা যায়। আমি তো বেঁচে আছি। আর একবার কামড়ালে কী হবে!
বিমলাদি আমার পিঠে হাত রেখে বললেন, কী ভাই, ভয় করছে খুব! দেখো, পুকুরের জলটা যেন ঠিক একটা আয়না!
দিদি, আমার বাবাকে তো দেখছেন। তার হাতে মানুষ। ভয় থাকলেও বলার উপায় নেই। করলেও বলা যাবে না। মানুষের তিনটি আদিম ভয় আছে, সর্পভয়, অগ্নিভয় ও জলভয়। তিনটেই আমার কাটিয়ে দিয়েছেন।
কীভাবে? সাপ দিয়ে কামড় খাইয়ে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে, জলে চুবিয়ে?
সাপ আমাকে এমনি নিজে নিজে এসে দয়া করে কামড়ে গেছে এই কদিন আগেই। জানি না বেঁচে গেছি কীভাবে? মনে হয় এক সন্ন্যাসীর কৃপায়। সে এক অলৌকিক কাহিনি। আগুন আমাকে। ঘিরে থাকে। আমি একটা ল্যাবরেটরিতে কাজ করি। এমন সব জিনিস আগুনে ফোঁটাতে হয় যে-কোনও মুহূর্তে আগুন লেগে গেলেই হল। ভীষণ সাহসের দরকার। আর জল? গঙ্গার ধারে বাড়ি। সাত বছর বয়সেই বাবা কোমরে গামছা বেঁধে জলে ভাসিয়ে রেখে সাঁতার শিখিয়েছেন। বর্ষার গঙ্গায় নৌকো করে এপার ওপার করিয়েছেন। মাঝগঙ্গায় ভীষণ বাতাসে পালের দড়ি ছিঁড়ে গেল। নৌকোর চরকিপাক। যাত্রীরা গেল গেল করে আতঙ্কে চিৎকার করছে। নৌকো প্রায় ডোবে আর কী! পালের দড়ি বাঁধা কোণটা ঝোড়ো হাওয়ায় ফটাস ফটাস করে ছইয়ের ওপর আসছে আর ফিরে ফিরে যাচ্ছে। বাবা আর আমি ছইয়ের ওপর বসেছিলুম। দড়িটা বারেবারে এসে ঝাঁপটা মেরে যাচ্ছে। পড়ে যাবার ভয়ে আমি গলুইয়ের একটা বাঁশ প্রাণপণে ধরে আছি। মনে মনে ভাবছি, আজই শেষ। যতই সাঁতার জানা থাক, এই উত্তাল নদীতে পড়লেই সব শেষ। বাবা গুনগুন করে গান। গাইছেন। যেন ফুরফুরে বাতাসে পানসি চেপে বেড়াতে চলেছেন! নৌকোর যাত্রীরা যখন ভয়ে। আধমরা, মড়াকান্না শুরু করে দিয়েছে, বাবা খপ করে ডান হাত বাড়িয়ে দড়িটা ধরে ফেললেন। তখন মাঝিরা চিৎকার করছে, বাবু ছেড়ে দিন ছেড়ে দিন, রাখতে পারবেন না। পাল ততক্ষণে ফুলে উঠেছে ভরা বাতাসে। নৌকো ডান দিকে কাত হয়ে তিরবেগে এগোচ্ছে পাড়ের দিকে। হরিশঙ্কর অক্লেশে ধরে আছেন পালের দড়ি। হেডমাঝি এগিয়ে এসে দড়িটা কোনওরকমে খোটার সঙ্গে বেঁধে দিয়ে বললে, মানুষের এমন শক্তি আমি দেখিনি। বাবু আপনি দেবতা। পরে বাবাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলুম, কী করে এমন করলেন? সোজা বললেন, মনের জোরে। আমার দুঃখটা কোথায় জানেন দিদি, আমি বাবার নখের যোগ্য নই। কিছুই আমি নিতে পারিনি।
দূরে গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। হরিশঙ্কর আর মোহনদা আসছেন। বিমলাদি তাড়াতাড়ি শরীর ঢাকলেন। আমাদের লক্ষও করলেন না। সোজা নেমে গেলেন পুকুরে। হরিশঙ্কর প্রশ্ন করলেন, মাছ ছেড়েছ?
মোহনদা বললেন, আছে কিছু।
কিছু কেন? ভাল করে চাষ করো না কেন? মোহন, তোমার সবই আছে, প্ল্যানিংয়ের অভাব। ইচ্ছে করলে তুমি রুপোর থালায় ভাত খেতে পারো।
আমার আপনার মতো একজন গুরু দরকার।
জানো তো কর্তাভজা সম্প্রদায়ে মন্ত্র দেবার সময় গুরু বলবেন, এখন থেকে মন তোর। নিজের মন নিজে সামলাও। মনকে এগিয়ে নিয়ে যাও। মনই সব। মনেই সব। ওই একই কথা তোমাকেও আমি বলছি–মন তোর।
ঝপাঝপ স্নান সেরে উঠে এলেন দু’জনে। যাওয়ার সময় হরিশঙ্কর আমাদের বলে গেলেন, একটু-আধটু তেলকালি থাকে থাক না। তাড়াতাড়ি সেরে নাও। তোমার তো আবার হাঁচিকাশির ধাত।
একের পর এক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান বেজে যাচ্ছে দূরের সেই মেলায়। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। যখন আমাদের পরিবার সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে বসেছে, সেই সময়, যেন চোখের সামনে দেখতে পেতুম। অধ্যবসায়ী এক মালী উবু হয়ে বসে আছে। একখণ্ড জমি। লোমশ হাত দিয়ে খুঁটে খুঁটে একটি একটি করে ঘাস তুলে যাচ্ছে। হরিশঙ্করের অবাক প্রশ্ন, তুমি কে? উত্তর, আমি মৃত্যু। প্রশ্ন, তুমি কী করছ? আমি নির্মূল করে দিচ্ছি। শুধু দুটি মাত্র ঘাসের ডগা থাকবে। পিতা আর পুত্র। কেন? বিধির বিধান। হরিশঙ্কর পাথরের মতো মুখে বলতেন, তবে তাই হোক। সন্ধ্যার ছায়ান্ধকারে, প্রকৃতি যখন দিবসের তীক্ষ্ণ রেখা হারিয়ে ক্রমশই নরম তলতলে হয়ে আসত, হরিশঙ্কর তখন গাইতেন, সন্ধ্যা হল গো–ও মা, সন্ধ্যা হল, বুকে ধরো/অতল কালো স্নেহের মাঝে ডুবিয়ে আমায় স্নিগ্ধ করো। ফিরিয়ে নে মা, ফিরিয়ে নে গো–সব যে কোথায় হারিয়েছে গো…। হঠাৎ একদিন গা ঝাড়া। দিয়ে উঠলেন, তবে রে ষড়যন্ত্র! দয়া! তোমার দয়া কে চায়! কে তুমি! তুমি কার প্রভু! আই চ্যালেঞ্জ ইয়োর অথরিটি। মন্দিরে মন্দিরে অসহায় মানুষের সেবা নিম্, ইউ লাইফলেস গড। মানুষ কেঁদে ভাসাচ্ছে। মাথা ঠুকে ঠুকে ফুলিয়ে ফেলছে। বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার। উত্তরের বারান্দায় পিতা হরিশঙ্কর বিসর্জনের রঘুপতির মতো পায়চারি করতেন আর বলতেন, কোথাও সে নাই। উর্ধ্বে নাই, নিম্নে নাই, কোথাও সে নাই, কোথাও সে ছিল না কখনও। সেইসময় হরিশঙ্করের একটা হাত ধরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, আর একটা হাত শেকসপিয়ার। একদিন আমাদের ঠাকুরঘরে মাতামহের পূজিত তারামূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ আবৃত্তি শুরু করলেন, দেখো, দেখো, কি করে দাঁড়িয়ে আছে, জড়/পাষাণের স্তূপ, মূঢ় নির্বোধের মতো/মূক, পঙ্গু, অন্ধ ও বধির! তোরি কাছে/সমস্ত ব্যথিত বিশ্ব কাঁদিয়া মরিছে!/পাষাণ চরণে তোর, মহৎ হৃদয়/আপনারে ভাঙিছে আছাড়ি। হা হা হা!/ কোন্ দানবের এই ক্রুর পরিহাস/জগতের মাঝখানে রয়েছে বসিয়া/মা বলিয়া ডাকে যত জীব, হাসে তত/ ঘোরতর অট্টহাস্যে নির্দয় বিদ্রূপ। মূর্তি তুলে গঙ্গার জলে ফেলতে গিয়েছিলেন, মাতামহ ছুটে এসে বোঝাতে লাগলেন, মূর্তিতে কিছু নেই, আছে মানুষের বিশ্বাসে। একটা মূর্তি বিসর্জন দিয়ে কী হবে! হাজার হাজার মানুষের মন থেকে যুগসঞ্চিত বিশ্বাস কি উৎপাটন করতে পারবে? হরিশঙ্কর ভাবলেন, হরিশঙ্কর শান্ত হলেন। অ্যালকোহলিকের মতো হয়ে উঠলেন ওয়াকোহলিক। কাজ, শুধু কাজ। কতরকমের কাজ আবিষ্কার করা যায় প্রতিভা সেই দিকে খেলে গেল।
