বিধুজ্যাঠা এমনভাবে বসে আছেন, যেন কুচিপুডি নৃত্য দেখছেন। প্রোগ্রাম শেষ হলে হাততালি দেবেন। কাঁচ পরিষ্কার করে নাচের নিরাপদ জমি তৈরি করার জন্যে কনক ঝাটা আনছিল। খেয়াল করেনি। সেই রাতের আরশোলা-পেটানো ঝাটা। একটা আধমরা প্যান্তাখাঁচা মাল কাঠির মধ্যে ঘাপটি মেরে ছিল। মেঝেতে নিচু হয়ে বোল কাটা জোড়া জোড়া পা বাঁচিয়ে যেই এক টান মেরেছে, আরশোলা ক্যাতরাতে ক্যাতরাতে হাত বেয়ে একেবারে সেই মোম আশ্রয়ে ঢুকে পড়ল যেখানে বিবাহের আগে কোনও পুরুষের হাতের প্রবেশ নিষেধ। কনক ঝাটা ফেলে মেঝেতে কুমড়ো গড়াগড়ি। ওদিকে কুচিপুডি, এদিকে হিন্দি সিনেমার সুঁই নাচ। শেম শেম বলতে ইচ্ছে করছে। বিধুজ্যাঠা ছাড়া সকলেরই অবস্থা মত্ত মৃদঙ্গের মতো। খ্যাচাখাই খ্যাচাখাই করে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে বেজেই চলেছে। গেট আউট বললেও কেউ যদি গেড়ে বসে থাকে, তা হলে তাকে চ্যাংদোলা করে বাইরে ফেলে দিয়ে আসতে হয়।
মেসোমশাইয়ের হঠাৎ বোধহয় আদালতের কথা মনে পড়ল, বাজখাই গলায় চেঁচাতে লাগলেন, পুলিশ পুলিশ। ওদিকে সাহসী মুকু বক্ষলগ্ন আরশোলা সমেত কনককে বাইরে টেনে নিয়ে গেছে, সেদিক থেকে নানা রকমের কাতর চিৎকার ভেসে আসছে। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, আমার ভীষণ সাহস। আরশোলা ফারশোলায় আর কোনও ভয় নেই। হাত ঢুকিয়ে খপাত করে ধরেই ছুঁড়ে বাইরে ফেলে দোব। অসাধারণ বীরত্ব। সেভিয়ার অফ ম্যানকাইন্ড, উওম্যানকাইন্ড। আহা, মানিক আমার। একটা উটকো লোক এসে পিতাকে অপমান করছে, সন্তান হয়ে গায়ে লাগছে না, রুখে দাঁড়াবার সাহস হচ্ছে না, মজা দেখছ, এরই মধ্যে আবার আরশোলা উদ্ধারের শখ। এই শোন, রোজই তো কথামৃত পড়িস, তা হলে মন অত চুলবুল করছে কেন রে! সন্ন্যাসী স্ত্রীলোকের চিত্রপট পর্যন্ত দেখবে না। সন্ন্যাসীর পক্ষে স্ত্রীলোক, থুথু ফেলে থুথু খাওয়া। স্ত্রীলোকদের সঙ্গে সন্ন্যাসী বসে বসে কথা কবে না–হাজার ভক্ত হলেও জিতেন্দ্রিয় হলেও আলাপ করবে না।আরে সে তো পড়েছি। আরশোলা ঢুকেছে যে!
বিধুজ্যাঠা পায়ের ওপর থেকে পা নামিয়ে বললেন, সামান্য ক’টা টাকার জন্যে এত নাচানাচি, ভাঙাভাঙি!
যোলোকলা পূর্ণ হল। দরজার সামনে মাতামহ। কয়েকদিন অদর্শনের পর আজ উপস্থিত। বুকের কাছে দু’হাতে ধরা একটি বিশাল ঠোঙা। কাগজ ফুড়ে তেল ফুটে উঠেছে। তার মানে রসদ সহ অভিযানে বেরিয়ে পড়েছেন। মুড়ি আর তেলেভাজা। পরিমাণ দেখে মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ চালাবার ইচ্ছে ছিল। ঘরের লন্ডভন্ড কাণ্ড অবস্থা দেখে বললেন, কী ব্যাপার! বেড়াল ঢুকেছে নাকি? বেড়ালও চোর, তবে তার জন্যে আবার পুলিশ কেন?
আজ্ঞে বেড়াল নয়, বিধুজ্যাঠা।
মাতামহ টর্পেডোর মতো সামনে ঝুঁকে পড়ে দেখলেন, তারপর দু’পা এগিয়ে গিয়ে বললেন, আরে আরে, এটা যে দেখছি সেই সিন্ধুঘোটক জুট মার্চেন্টটা। আঁটকুড়োর ব্যাটা? তুই এখানে সাতসকালে কী করছিস! ফুটবল খেলছিস। ব্যাটার মুখ দেখলেও অযাত্রা।
ক্রোধে শরীর কেঁপে কেঁপে উঠলেও পিতার শালীনতা জ্ঞান নষ্ট হয়নি। মাতামহকে বললেন, এ আপনি কী বলছেন? আঁটকুড়োর ব্যাটা? আরও অনেক ভাল ভাল গালাগাল আছে, যেমন পিগ, রাসকেল, সান অফ এ বিচ, হতচ্ছাড়া, জানোয়ার। সেসব ছেড়ে আপনি চলে গেলেন বস্তির ল্যাঙ্গোয়েজে। ওই আপনার দোষ। মুখের ফিল্টার নষ্ট হয়ে গেছে।
মাতামহ একগুঁয়ে ছাত্রর মতো বললেন, যা বলেছি, বেশ বলেছি। তুমি ওকে কতটা চেনেনা হরিশঙ্কর? ও একটা চিট। দ্যাটস রাইট। হি ইজ এ চিট। শুধু তাই নয়, ওই আগেরটাও। তুমি ওর জন্মবৃত্তান্ত জানো? ওর মা ছিল নন্দলালের রক্ষিতা। সমাজের যে শাসন নেই, তাই আজ সিল্ক চড়িয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরছে। চুলে আবার পমেটম। তুই কোন সাহসে আমাদের সামনে চেয়ারে পা তুলে বসে আছিস? ওঠ। উঠে দাঁড়া। কান ধরে উঠে দাঁড়া।
মাতামহকে দেখে বিধুবাবু একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। এখন যেন জোকের মুখে নুনের ছিটে পড়ল। বাধ্য ছেলের মতো উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, সামান্য ক’টা টাকার জন্যে তা হলে কোর্ট কাছারিই করতে হচ্ছে।
আবার টাকা! কীসের টাকা? কার টাকা? পিতা তেড়ে আসতে চাইছেন। হাতের মুঠো আবার পাকিয়ে উঠেছে। আমরা আবার কোরাসা ধরেছি, বাবা কাঁচ, মেসোমশাই কাঁচ।
১.০৯ Dark idolatry of self
টাকার কথা আসছে কেন হরিশঙ্কর? তুমি কি এই দালালটার কাছে টাকা ধার করেছিলে?
মাতামহ ব্যাপারটা বুঝতে চাইলেন। রঙ্গমঞ্চে আপাতত চরিত্ররা স্থির। চেয়ার পা উলটে পড়ে আছে যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত অশ্বের মতো। থানইটের মতো কিছু কেতাব ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। উত্তেজনায় মেসোমশাইয়ের ভুঁড়ি ইঞ্চিখানেক চুপসে যাওয়ায় কাপড়ের কষি আলগা হয়ে গেছে। টাইট করে বাঁধার চেষ্টা করছেন। কনক আর একটা ঝাড়ু এনে উবু হয়ে বসে কাঁচের কোয়া ঠেলে ঠেলে এক জায়গায় জড়ো করছে। পিঠের দিকে খোলা অংশে শাড়ির আঁচল লাগলে আরশোলা ভেবে চমকে চমকে উঠছে। মুকু চেষ্টা করছে বইয়ের র্যাকটাকে সোজা করার। বিধুজ্যাঠা শাসিয়েটাসিয়ে, কোর্টকাছারির ভয় দেখিয়ে পালিয়েছেন। মাতামহ বুকের কাছে ঠোঙাটি তখনও ধরে আছেন। অনেকক্ষণ লোভ সামলেছেন। আর পারলেন না। বেশ বড় সাইজের একটি বেগুনি বের করে সযত্নে দাতে কাটলেন। মুচুড় করে শব্দ হল।
