মোহনদা বললেন, আমার অবস্থাটাই দেখুন না। কোন ঘরের ছেলে আজ কোথায় নেমে কী কাজ করছি!
হরিশঙ্কর একটু অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, তাতে কী হয়েছে? সৎপথে সত্তাবে উপার্জন করার জন্যে যে-কোনও জীবিকাই গ্রহণ করা যায়। এতে অসম্মানের কিছু নেই।
মোহনদা বললেন, না, আমি বলছি ভাগ্যের কথা। মানে আমার ভাগ্যটা চিরকালই তেমন সুবিধের নয়। আমার জীবনে কিছুই তেমন হতে চায় না। কত লোকের কত কী হয়!
শোনো, ভাগ্যে বিশ্বাস করো শুধু শব্দটা পালটে নাও। ভাগ্যের জায়গায় বসাও কর্ম। যত খাটবে ততই তোমার বরাত ফিরবে। আমিও ভাগ্য বিশ্বাস করি। যত খাঁটি ততই আমার ভাগ্য ফিরে যায়। খাটলে খাঁটিয়া, আরও খাটলে খাট, আরও খাটলে সিংহাসন।
মোহনদা বললেন, আমিও তো কম খাঁটি না!
হরিশঙ্করের স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে ওঠা দেখে ছোটদাদু ভয় পেয়ে গেলেন, কী হল?
হরিশঙ্কর কোনও কথা না বলে সোজা চলে গেলেন দাওয়ার উত্তরপ্রান্তে। সেখানে দাঁড়িয়ে মোহনদাকে ডাকলেন। মোহনদা বেশ থেবড়ে বসেছিলেন দেয়ালে পিঠ দিয়ে। ভয়ে ভয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকাতে তাকাতে এগিয়ে গেলেন। হরিশঙ্কর মোহনদার কাঁধে হাত রেখে বললেন, এটা কী?
ছোটদাদু বললেন, দেখে এসো তো, ওখানে মোহনের কোন ভাগ্য খেলা করছে? সৌভাগ্য না। দুর্ভাগ্য! খোলার চাল। বাঁশের বাতা। বাঁশের খোটা বেয়ে পুরু হয়ে উইপোকা নেমেছে। যেন উইয়ের নদী। মূলধারা থেকে শাখা-প্রশাখা খেলে গেছে। কিছু শুড় আবার হিলহিলিয়ে মাথা তুলেছে, অশুভ অঙ্গুলি-সংকেতের মতো। দেখলেই গা শিউরে ওঠে।
হরিশঙ্কর বললেন, এটা কী মোহন?
মোহনদা চমকে উঠলেন, এ তো উই ধরেছে।
এটা উই নয় মোহন, এ তোমার আলস্য। আর এই আলস্যই তোমার ভাগ্য তৈরি করছে। আরও দেখবে?
হরিশঙ্কর মোহনকে নিয়ে তরতরিয়ে আরও কিছুটা উত্তরে এগিয়ে গিয়ে বললেন, ওপরে তাকাও।
মোহন ওপরে তাকালেন, ভাল করে দেখে বললেন, ঘুণপোকা ধরেছে।
এরপর কী হবে? একদিন আচমকা ভেঙে পড়বে। ওই বাচ্চা ছেলেটাই এখানে বেশি খেলা করে। পড়লে তার মাথাতেই পড়বে। সেটা ভাগ্য? না তোমার আলস্য?
মোহন মুখ কাচুমাচু করে বললেন, আজ্ঞে বাঁশ তো, ঘুণ আর উইপোকা ধরে ধরে আনে!
একটা টুল নিয়ে এসো।
টুল কী করবে?
তোমাকে যা বলছি তাই করো।
হরিশঙ্কর আমাকে বললেন, বিমলাকে ডেকে আনে।
আমি জানি পিতা হরিশঙ্কর কী করতে চাইছেন! উেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। বিমলাদি বাড়ির পেছন দিকে বাসন মাজছিলেন। পিঠে ছড়িয়ে আছে এলো চুল। গুনগুন করে গান গাইছেন আর একটা লোহার কড়া শালপাতা ছাই দিয়ে ঘসঘস করে ঘষছেন। ঝকঝকে হয়ে গেছে, তবুও ঘষে যাচ্ছেন।
বিমলাদি!
চমকে ফিরে তাকালেন, বলল ভাই। জল খাবে বুঝি?
আজ্ঞে না, বাবা আপনাকে একবার ডাকছেন।
বিমলাদি বললেন, আমার হাতে একটু জল ঢেলে দেবে ভাই?
সামনেই বালতি আর মগ। ফরসা গোল গোল হাতদুটো সামনে এগিয়ে দিলেন। সাবধানে জল ঢালতে লাগলুম। আমার পেছনেই একটা চালতা গাছ। ছায়া ছড়িয়ে আছে। একটা দোয়েল বেলা শেষের গান গাইছে। একটু পরেই উজ্জ্বল একটা দিনের মৃত্যু হবে। সেই দুঃখ পাখির ঠোঁটে গান হয়ে ঝরছে।
বিমলাদি বেশবাস ঠিক করে হরিশঙ্করের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, কাকাবাবু!
আমাকে একটা খুন্তি এনে দাও। কেরোসিন তেল আছে?
বিমলাদি একটু অবাক হয়ে বললেন, ঘি-ও আছে।
এইবার হরিশঙ্করের অবাক হবার পালা। তিনি বললেন, ঘি কী হরে মা?
রাতে লুচি খাবেন তো!
তুমি কি ভাবলে কেরোসিন তেল দিয়ে লুচি ভাজব বলে খুন্তি চাইছি?
আমি ঠিক ধরতে পারছি না কাকাবাবু।
তোমাকে ধরতে হবে না, যা চাইছি নিয়ে এসো। সময় নষ্ট কোরো না।
মোহনদা বীর হনুমানের মতো একটা টুল মাথায় করে এলেন কোথা থেকে। মালকোচা মারা ধুতি। টুলটা বেশ বড় আর ভারী। হরিশঙ্করের সামনে নামিয়ে রেখে হাঁপাতে লাগলেন। যে-টুল দু’হাতে তুলেও মোহনদা কাপছিলেন, সেই টুল হরিশঙ্কর এক হাতে অক্লেশে তুলে ঠিকমতো জায়গায় নিয়ে গেলেন। এই হলেন হরিশঙ্কর! কখন যে কোন শক্তি প্রকাশ পাবে! কখনও মেধা, কখনও দেহ! কখনও সূক্ষ্ম দেহ-বোধ। একেবারে পূর্ণমানব।
মোহনদা বললেন, এক হাতে তুললেন কী করে! আমি যে দু’হাতে ধরেও কেঁপেছি।
হরিশঙ্কর বললেন, তোমার ব্লাড সুগার হয়েছে মোহন। তাই ক্রমশই দুর্বল হয়ে পড়ছ। তোমার চিকিৎসার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। অঙ্কটা কী দাঁড়াচ্ছে জানো, আলস্য থেকে সুগার, সুগার থেকে আলস্য, আলস্য থেকে উই আর ঘুণ, ভাগ্যের কাঠামো বিধ্বস্ত।
হরিশঙ্কর টক করে টুলে উঠে পড়লেন। বিমলাদি বললেন, সাবধান সাবধান, টুলে উঠছেন কেন? হরিশঙ্কর কোনওরকম উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না। খুন্তি দিয়ে উইপোকা চাঁচতে শুরু করলেন। চাবড়া চাবড়া উইমাটি ঝরে ঝরে পড়ছে। মোটা মোটা সাদা সাদা উইপোকা।
বিমলাদি বললেন, আপনি নেমে আসুন কাকাবাবু, আমি করছি।
নীচের দিক থেকে হরিশঙ্করের মুখ অন্যরকম দেখাচ্ছে। স্পার্টানদের মতো। কাজ করতে করতেই বললেন, দীক্ষা দেওয়ার মতো তোমাদের লজ্জা দিয়ে যাই। ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা ঠাকুরঘরে বসে ভগবানের পায়ে ফুল চড়ালে, ভগবান এসে তোমার এইসব কাজ কোনওদিন করে দেবেন না।– ওই দিকটা একটু কম করে এই দিকটা একটু বেশি করে করো। বাড়িতে কোদাল আছে?
