মোহনদা বললেন, পণ্ডিতমশাইয়ের টোলে যাবেন না? বললেন যে, খুব তর্ক হবে!
হরিশঙ্কর উদাস মুখে বললেন, কী হবে অহংকারের কাঠি-নৃত্য করে? যুগ বদলে গেছে। শ্রীচৈতন্যের প্রেমের যুগ, শঙ্করের মেধার যুগ, বুদ্ধের বিচারের যুগ, প্রসাদের ভক্তির যুগ শেষ হয়ে গেছে। এখন চলেছে শিশ্নোদরের যুগ। খাও-দাও শুয়ে পড়ো কাঁথা মুড়ি দিয়ে।
ঘোটদাদু বললেন, বিকেলটা তো কাটাতে হবে! পণ্ডিতমশাইয়ের আশ্রমটা ভারী সুন্দর। তর্ক না হোক দুদণ্ড বসা তো যাবে।
হরিশঙ্কর কী ভাবলেন, চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, আজই আমাদের চলে যাওয়া উচিত ছিল। একটা কাজের জন্যে আমরা অনেকটা সময় খরচ করে ফেললুম।
ছোটদাদু বললেন, আমরা কি আর করলুম! যাঁর ইচ্ছায় জগৎ-সংসার চলছে, তিনিই করাচ্ছেন।
মোহনদা বললেন, আপনারা যে-দিকটায় যাবেন, সেদিকে বিশাল একটা জঙ্গল পড়বে। দুর্গাপুর হওয়ার পর, যত ডাকাত ছিল সব চলে এসেছে ওই তল্লাটে। কী দরকার, রাত্তিরবেলা ঝুঁকি নিয়ে! কাল সকালে যাবেন। একটা রাতের তো ব্যাপার। আপনারা মহাপুরুষ। একদিনের জন্যে আপনাদের একটু সঙ্গ করি। সকালে বলেছিলেন, লুচি-কুমড়োর ছক্কা খাবেন, রাতে সেইটাই হবে মহামায়ার ভোগ। একটু পুজো হবে, আরতি হবে। আমাদের দুঃখের জীবনে আর কী আছে! একটা আশা নিয়ে বেঁচে থাকি।
ছোটদাদু বললেন, মহামায়া?
মোহনদা বললেন, সে এক কাহিনি! সেবার বন্যা হয়ে গেল জোর। জল নেমে গেল। আমরা নেমে এলুম ডাঙা থেকে। ভিজে ভিজে তিন জ্বর। বাড়িঘর মাটি ভরতি। কোনওরকমে একটুখানি পরিষ্কার করে পড়ে আছি একপাশে। চোখ খুলতে পারছি না, পাশ ফিরতে পারছি না। রাত প্রায় ভোর হয়ে এসেছে। সে আমার স্বপ্ন, না আপনারা যাকে দর্শন বলেন, তা-ই বুঝতে পারলুম না। কুচকুচে কালো এক দেবীমূর্তি। আমার মাথার শিয়রে দাঁড়িয়ে বলছেন, হাত ধর। ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলুম। ভোরবেলা ঘুম ভাঙল। দেখি হাতের পাশে বালিমাটির ওপর ছোট্ট এক দেবীমূর্তি শুয়ে আছেন। পণ্ডিতমশাই দেখে বললেন, মহামায়া। সেই থেকে সংসারে বেশ যেন একটা আঁট এসেছে। মনটা আর আগের মতো টলে না। সহ্য করার শক্তি অনেক বেড়ে গেছে। পুজো আমি। শিখিনি। যা পারি তা-ই করি নিজের মতো করে।
ছোটদাদু বললেন, এসব কথা কারওকে কোনওদিন বলবে না। চেপে রাখবে নিজের ভেতর। চারপাশে কত অবিশ্বাসী আছে, তোমার সহজ সরল বিশ্বাস ভেঙে দেবে।
মোহনদা বললেন, আপনারা মহাপুরুষ, তাই আপনাদেরই বললুম।
কৃপা দয়া এইসব অযাচিত আসে। হয়তো পূর্বজন্মের কর্মফল। ছোটদাদু বললেন।
হরিশঙ্কর বললেন, ওই একটা জিনিস আমি মানি, কর্মফল।
এক খিলি পান মুখে ফেলে ছোটদাদু বললেন, কেন মানো? তুমি কি পুনর্জন্মে বিশ্বাস করো?
হরিশঙ্কর বললেন, কর্মফল হল চাষবাসের ব্যাপার, এগ্রিকালচার, সেই কারণেই মানি। বীজ যেমন বুনবে সেইরকম ফসল তুলবে। যেমন কর্ম তেমন ফল। এ জন্মে না পেলে পরের জন্মে সেইটাই হবে তোমার ভাগ্য, ডেস্টিনি। তুমি বুঝতেই পারবে না কোথা দিয়ে কী হয়ে যাবে!
ছোটদাদু বেশ আঁকিয়ে বসলেন। তাকিয়াটা টেনে নিলেন কোলে। মজলিশি মানুষ। দুঃখ, সুখ কোনও কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারে না। জ্ঞাতি শত্রুর অভাব নেই। তারা যা-তা অপবাদ রটায়। ভণ্ড বলে। বিষয়সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে অশান্তি করে। ছোটদাদু গ্রাহ্যই করেন না। কী সব ঘেউ ঘেউ করছে, কান না দিলেই হল। তুলসীদাসের মতো, হস্তী চলে বাজারমে কুত্তা ভুখে। হাজার/সাধুনকে দুর্ভাব নহি যও নিন্দে সংসার ॥ সবসময় একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব। মানিকজোড় বলে। হরিশঙ্কর আর ছোটদাদু সেই মানিকজোড়।
তাকিয়াটা কোলে টেনে নিয়ে ছোটদাদু বললেন, সেই গল্পটা শোনো। গভীর বন। মাঝরাত। এক তান্ত্রিক জবরদস্ত আয়োজন করে শবসাধনায় বসেছেন এক গাছতলায়। কারণবারি, ফুল, ছোলাভাজা। শব জাগলে তাকে ভোলাভাজা খাওয়াতে হবে। শবকে স্নান করিয়ে সাধক তার বুকে চেপে বসে খুব জপ করছেন। ওদিকে গাছের ডালে একজন উঠে বসে আছে। সে পথিক। রাত হয়ে গেছে দেখে বাঘের ভয়ে ডালে উঠে বসে আছে। শবসাধনায় সাধক অনেক বিভীষিকা দেখে। সাহস করে বসে থাকতে হয়। সাহস থাকলে সিদ্ধি, ভয় পেলেই মৃত্যু। শবই ঘাড় মটকে দেবে। সাধক সেই বিভীষিকা দেখতে শুরু করেছেন। ভয়ে এমন অবস্থা, ভাবছেন নেমে পড়ে দৌড় লাগাবেন কি না! এমন সময় কোথা থেকে বিশাল এক বাঘ এসে তন্ত্রসাধকের ঘাড় কামড়ে ধরে তুলে নিয়ে চলে গেল। পথিক বসে আছে গাছের ডালে। সে সব দেখছে। নীচে শুয়ে আছে শব। পূজার উপকরণ। প্রস্তুত। সে তখন আস্তে আস্তে নেমে এল গাছ থেকে। খুব ইচ্ছে হল, দেখাই যাক না, বসে কী হয়। আচমন করে বসে গেল শবের ওপর। একটু জপ করতে করতেই মায়ের দর্শন। সামনেই মা ভগবতী। তিনি বললেন, আমি তোমার ওপর প্রসন্ন হয়েছি, তুমি বর নাও। মা’র পাদপদ্মে প্রণত হয়ে সে বললে,, একটা কথা জিজ্ঞেস করি, তোমার কাণ্ড দেখে অবাক হয়েছি! যে-সাধক এত খেটে, এত আয়োজন করে, এতদিন ধরে তোমার সাধনা করছিল, তাকে তোমার দয়া হল না! আর আমি কিছু জানি না, শুনি না, সাধনহীন, ভজনহীন, জ্ঞানহীন, ভক্তিহীন, আমার ওপর এত কৃপা হল মা? ভগবতী হাসতে হাসতে বললেন, বাছা! তোমার জন্মান্তরের কথা স্মরণ নেই, তুমি জন্ম জন্ম আমার তপস্যা করেছিলে, সেই সাধনবলে তুমি বসতেনা-বসতেই আমার দর্শন পেলে। এখন বলল, কী বর তুমি চাও? এই হল কর্মফল। একটা বোকা, নিরেট, গাধামাকা লোক সিংহাসনে বসে। সবাইকে হুকুম করছে, আর বুদ্ধিমান বিচক্ষণ জ্ঞানী গুণী মানুষ হা অন্ন হা অন্ন করে পরের দাসত্ব করছে। বাংলায় একটা সুন্দর প্রবাদ আছে, কপালগুণে ঘি-ভাত, কপাল দোষে কী ভাত।
