মোহনদা বললেন, আজ্ঞে আছে। একজোড়া আছে।
রেডি করে রাখো। এরপরই লাগবে।
হঠাৎ হরিশঙ্কর টুল থেকে টুক করে নেমে এলেন। নেমে এসে বললেন, মোহন, এইবার তুমি ওঠো। তোমার কাজ তোমাকেই করতে হবে। ঠিক আমি যেভাবে চাচছিলুম তুমিও সেইভাবে চাচো। আমি ততক্ষণ একটা নুটি তৈরি করি, কেরোসিন লাগাতে হবে। বিমলা, বেশ মোটা দেখে একটা কাঠি জোগাড় করে আনেনা।
মোহনদা বললেন, কাকাবাবু, আমাকে যে দোকানে যেতে হবে!
এক ঘণ্টা পরে যাবে। বিকেলের দিকে তেমন খদ্দের হয় না, তুমি না বললেও আমি জানি।
মোহনদা থমথমে মুখে টুলে উঠে পড়লেন। ছোটদাদু বসে বসে হাসছেন। আমি কাছে যেতেই বললেন, তোমার বাবা একটা চরিত্র! কেমন নজর দেখলে! বসে বসেই লক্ষ করেছে। মোহনের আজ দফারফা।
ছেলেবেলায় রবিবার হলেই আমার ভয় করত। খাটতে খাটতে শেষবেলায় মনে হত আমি একটা গাধা।
কেরোসিনের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ হরিশঙ্কর আমাকে ডাকলেন, কেমিস্ট্রির ছাত্র তো! বলতে পারো বিমলার রান্নাঘরের ভেতর দিকের চালের বাঁশে কী আছে?
প্রথমে মনে হল বলি, টিকটিকি, গিরগিটি, হেলে সাপ। তারপরেই মনে হল ওটা কেমিস্ট্রি নয়। ঝট করে মাথায় এসে গেল, বললুম, কোলটার।
কেউ কিছু পারলে ঐশ্বরিক আনন্দে হরিশঙ্করের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মোটা টাকার লটারি পেলেও তার এত আনন্দ হবে না। আমার উত্তর শুনে তিনি ছেলেমানুষের মতো চিৎকার করে উঠলেন, গুড, ভেরি গুড। যাও, তুমি আর বিমলা গিয়ে কিছুটা কালেক্ট করে আনেনা।
মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, কীভাবে?
মাথা খাটাও মাথা। নেসেসিটি ইজ দি মাদার অফ ইনভেনশন।
২.৪০ When a man is wrapped up in
বিমলাদির রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ মাথা ঘামালুম। এমনই মাথা, শরীর ঘেমে গেল মাথা ঘামল না। বিমলাদি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন পাশে। আমার অসহায় অবস্থা দেখে বললেন, এক কাজ করো ভাই, আমি একটা গামলায় কেরোসিন তেল আর খানিকটা ন্যাকড়া নিয়ে আসি। তেলে ন্যাকড়া ভিজিয়ে বাঁশ মুছলেই যা চাইছ তা উঠে আসবে। ভেজাব আর মুছব। তেলটা কালো হয়ে যাবে। যখন একবারে ঝুল কালো হয়ে যাবে তখন নিয়ে গেলেই হবে। এটা আমার মেয়েলি বুদ্ধি। তোমার মাথায় কী এল!
এর চেয়ে ভাল বুদ্ধি আমার মাথায় আসত না দিদি। আমার বাবাকে আপনার কেমন লাগছে? বিমলাদির চোখে জল এসে গেল। বললেন, আমার যদি এইরকম বাবা থাকতেন! তোমার কী ভাগ্য! বাবার গর্বে নিজের বুকটা দশ হাত হয়ে গেল। শুরু হল আমাদের দিশি বিজ্ঞান। দু’জনেই মোছা শুরু করলুম। কেরোসিন আর কয়লার ঘামের গন্ধে ঘর ভরে গেল। বাঁশ তার পুরনো বর্ণ ফিরে পাচ্ছে ক্রমশই। বিমলাদির ডান হাতের ওপর বাহুতে একটা তাগা। বুকে একটা সোনার হার দুলছে। চমৎকার ঢলঢলে শরীর। ওদিকে ভয়ংকর কাণ্ড চলেছে। হরিশঙ্করের নানা নির্দেশ চাবুকের মতো মোহনদার ঘাড়ে আছড়ে পড়ছে।
বিমলাদির ফরসা হাত কুচকুচে কালো হয়ে গেল। একবার বোধহয় ভুলে গালে হাত দিয়েছিলেন। কালো ছোপ। আমার হাতের অবস্থা তো আমি দেখতেই পাচ্ছি। কাজের সঙ্গে গল্পও চলেছে আমাদের। আমাদের ছেলেবেলার গল্প। ঘুড়ি ওড়ানোর গল্প, লাটু খেলার গল্প। বকুনি খাওয়ার গল্প। ওদিকে বেলা পড়ে আসছে। রান্নাঘরের বাইরে ওপাশে একটা বেড়াল ডাকছে ম্যাও ম্যাও করে। আমরা দুজনেই চলে গেলুম আমাদের শৈশবে। মনেই হচ্ছে না, মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে আমাদের পরিচয়। মনে হচ্ছে দুই সমবয়সি বন্ধু বিকেলে নয়নতারা আর কেষ্টকলি ফুলে ঘেরা। উঠোনে খেলা করতে এসেছি। সেই ছেলেবেলার দিনগুলিতে যেমন হত। শরৎ শেষ হয়ে হেমন্ত আসছে, শিশিরের কাল। মাটি থেকে ভিজেভিজে একটা গন্ধ উঠছে। শিশুমনকে অবাক করে দিয়ে ঘাসের পাড় ধরে ধরে একটা শামুক চলেছে তার বিশাল বাসস্থানটিকে পিঠে নিয়ে। শম্ভকাকার আটচালায় মা দুর্গা। সব মূর্তি বায়না অনুযায়ী বিক্রি হয়ে গেছে, পড়ে আছে এই একটি মা। রায়েদের। বাড়ির পুজো হল না। বিদেশে বড় ছেলে মেমের প্রেমে পড়ে আত্মহত্যা করেছে বোধনের দিন। অসময়ের মা দুর্গার দিকে আমরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকতুম। ওই মুখ, ওই চোখ। নন্তু কিছু ফুল তুলে এনে ভয়ে ভয়ে মায়ের পায়ের ওপর রাখত। আমাদের মনে হত সিংহ জ্যান্ত হয়ে গেল, অসুর যাত্রার দলের জীবনবাবুর মতো হাহা করে হাসছে। পরেশ যেই বলত, ওই দেখ মা দুর্গা কাঁচা তুলছে, আমরা অমনি ভয়ে তিরবেগে মাঠময়দান ভেঙে ছুট লাগাতাম। শঙ্করী আমাদের সঙ্গে তেমন ছুটতে পারত না। নাকি সুরে বলত, আমাকে ফেলে যাসনি ভাই। ছুটতে ছুটতে আমরা গঙ্গার ধারের উঁচু ঢিবিতে সেই বহু প্রাচীন বটগাছের তলায় গিয়ে দাঁড়াতুম, যে-গাছের তলায় অনেক অনেক আগে শ্রীচৈতন্যের নৌকো ভিড়েছিল। তখন এমন শহর তো ছিল না। গ্রাম, একটা-দুটো চালাবাড়ি। সেদিন যে-গ্রামবাসী তার সেবা করেছিলেন নিমাই তাকে যে কথাটি দিয়েছিলেন, সেই পবিত্র গাত্রবাস ঘিরে ছোট্ট একটি মঠ হয়েছে। সন্ধ্যার গঙ্গায় প্রদীপ ভাসানোর মতো শৈশবের একটি দিন ভাসিয়ে দিয়ে যে-যার গৃহে। সঙ্গীদের মধ্যে কেউ বড়লোক, কেউ মধ্যলোক, কেউ নিম্নলোক। এই ভূলোক, দ্যুলোক, খেলার মাঠে সব একাকার। বাড়ি গিয়ে যে-যার অবস্থা ফিরে। পাবে। কেউ খাবে শুকনো রুটি, কেউ খাবে গরম লুচি, কেউ শোবে ভুয়ে, কেউ খাটে নরম বিছানায়। আমরা দুজনেই চলে গেছি শৈশবের ঘোরে। হঠাৎ বহু দূর থেকে একটা গান ভেসে এল। বাতাসের ওঠা-পড়ায় কখনও স্পষ্ট কখনও অস্পষ্ট। সুর খুবই চেনা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলা। আমাদের দু’জনেরই কাজ বন্ধ হয়ে গেল।
