হরিশঙ্কর সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ আগ্রহে বললেন, তার মানে বন্যা! বন্যা হলে আমি কিন্তু থেকে যাব! দুর্ভিক্ষ দেখেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখেছি, দাঙ্গা দেখেছি, ভূমিকম্প দেখেছি, মহামারী দেখেছি। দুটো জিনিস দেখা হয়নি, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত আর বন্যা।
মোহনদা বললেন, সে ভারী সুন্দর! কোনওরকমে বেঁচে গেলে অভিজ্ঞতার মতো অভিজ্ঞতা। শুধু জল আর জল। সব সমান। এ পাড়া ও পাড়া নেই সব একাকার। গাছপালা সব ছোট ছোট, ঝোঁপের মতো। বাড়ির চালগুলো শুধু জেগে আছে। সেই চালে বসে আছি আমি। শুধু আমি একা নই, আমার সঙ্গে গোরু আছে, ছাগল আছে, হাঁস-মুরগি আছে, সাপ আছে। ঘরে ঘরে মানুষ নেই, শুধু জল কলকল করছে। এরই মধ্যে ঘর ভাঙবে। ঝুপ করে দেয়াল ধসে পড়ে চালাটা ভাসতে ভাসতে চলে যাবে। না খাদ্য, না জল। এরই মাঝে আসবে নৌকো, হয় সেনাবাহিনীর না হয় মিশনের। অনেক দিন না-খাওয়ার পর খাওয়া, মরতে মরতে বেঁচে ওঠার কী আনন্দ। মরে না গেলে একটা অভিজ্ঞতা। বিহারে খুব বৃষ্টি হচ্ছে, বন্যা হলেও হতে পারে। আপনাদের ভাগ্যে থাকলে দেখা হবে। বন্যা আমাদের গা সওয়া। হলেই হল।
হরিশঙ্কর বললেন, একবার নদীর ধারটা ঘুরে এলে হয়!
ছোটদাদু বললেন, তুই কোনওরকমে আগে খাওয়াটা শেষ কর। নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা হবে তো! সে অভিজ্ঞতাটা খুব সুখের হবে না। আমার সাধারণ বুদ্ধি যা বলে। যতটা পারো পেটে নিয়ে নাও। এমনও হতে পারে সাতদিন কিছু জুটল না।
বিমলাদি পরিবেশন করতে করতে বললেন, এখন বন্যা হবে না। আরও পরে হলেও হতে পারে। মাসখানেক পরে। এ জল আমাদের বাগান পর্যন্ত এসে সরে যাবে। বড়জোর এই উঠোনটা। ভরে যাবে। এ দাওয়া থেকে ও দাওয়া জল ভেঙে ভেঙে যেতে হবে।
পিন্টু বলল, দেখবে কত মাছ আসবে। সাপ আসবে সুন্দর সুন্দর।
ছোটদাদু বললেন, অপূর্ব আহার হল। বিমলা মা আমার চমৎকার বেঁধেছে। এতসব করলে কখন?
মোহনদা বললেন, বিমলা ভীষণ ভাল রাঁধে। ওর রান্নার জন্যেই আমার খদ্দের। মানুষকে খাইয়ে আনন্দ পায়।
পিতা হরিশঙ্করের কানে কানে বললুম, কিছু তো কেনা হল না! উপহার!
হরিশঙ্কর চুপিচুপি বললেন, ব্যবস্থা হয়েছে একটা।
আমি আরও ফিসফিস করে বললুম, কী ব্যবস্থা?
ছোটমামার পকেটে একটা সোনার মাদুলি ছিল তারা মায়ের চরণের ফুল ভরা। এর চেয়ে ভাল জিনিস আর কী হতে পারে! ধর্মের সংসার, বেশ মানিয়ে গেছে।
ছোটদাদু ভীষণ পান ভালবাসেন। দাওয়ায় মাদুর বিছিয়ে বসেছেন। পেছনে পরিষ্কার ওয়াড়ে-ঢাকা বেঁটে মোটা তাকিয়া, সামনে পানের ডিবেতে সাজা পান। পাশে গোল ছোট্ট ডিবেতে চুন। আর একটা কৌটোয় জরদা। ছোটদাদু চারপাশ আলো করে বসে আছেন। হরিশঙ্কর কবি হয়ে গেছেন। গাছ, আকাশ, নদী, পাখি। সামনেই বাঁশঝাড়। হরিশঙ্কর বাঁশঝাড় ভীষণ ভালবাসেন। কচি, মসৃণ, তেলা বাঁশ তার কাছে কবিতার মতো সুন্দর।
হরিশঙ্কর বললেন, একটাই অভাব। একটা ছোট পাহাড় থাকলে বেশ হত।
ছোটদাদু বললেন, বাকি জীবনটা এখানে কাটালে কেমন হয়? আমাদের তো কোথাও কোনও বন্ধন নেই। বড় শান্তির জায়গা। একটা পঞ্চমুণ্ডীর আসন পেতে বসে পড়ো কাজের কাজে।
হরিশঙ্কর বললেন, বসতে হলে হিমালয়ের কোলেই বসা ভাল।
হিমালয় হল শিবের, বিষ্ণুর। তারার সাধনা গরম ছাড়া হয় না। কঁকুরে মাটি, জলের অভাব, ফোঁসকা পড়ানো ভীষণ গরম, একটা বেলগাছ, পাশেই মহাশ্মশান, হোমের আগুন, তবেই না তার। আবির্ভাব! বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া এই হল পীঠস্থান। চল না, আমার সঙ্গে একদিন শ্মশানে বসবি।
হরিশঙ্কর বললেন, শ্মশান করেছি হৃদি, শ্মশানবাসিনী শ্যামা, নাচবি সেথা নিরবধি। আমি আর শ্মশানে গিয়ে কী করব? আমার জীবনটাই তো শ্মশান। প্রহরে প্রহরে স্মৃতির শৃগালের হুক্কাহুয়া। হরি বাঁচ, আরও বাঁচ। প্রতিদিন মরে মরে বাঁচ। মৃত্যুর হায়না রবীন্দ্রনাথের মতোই আমার জীবন নিয়ে খেলা করেছে। তার সেই অপূর্ব গান নিজেকে গেয়ে শোনাই, গরব মম হরেছ, প্রভু, দিয়েছ বহু লাজ/কেমনে মুখ সমুখে তব তুলিব আমি আজ। মুখুজ্যেমশাই, এর দাদু প্রেমিকের একটা গান। গাইতেন। গেঁথে আছে আমার মনে। সুরটাও ছিল অসাধারণ, পরজবাহার। মন দিয়ে শোন, তুই তো গান লিখিস। বিশাল বিশ্বফলকে আঁকিছু প্রতিপলকে/সীমা করি লোকালোকে, মহামোহ রাগ সারে ॥ আশারূপ মহাহ্রদে পড়ে যায় ধরিতে চাঁদে/কেহ কাঁদে মনের খেদে, মত্ত কেহ অহংকারে/ কেহ আনন্দে মগন পেয়ে তনয়-রতন/কেহ অশ্রু বিসর্জন করে মৃত সুত হেরে ॥ কল্পনা-পাদপতলে বসেছে কেউ কুতূহলে। কেহ ভাসে সকল ফেলে অকালে কাল-স্রোতনীরে/এ আকৃতির এমনি রীতি অসত্যে সত্য প্রতীতি। দেখ, আমি নাস্তিক। দেবদেবীতে আমার বিশ্বাস নেই। জীবন হল যাপনের জিনিস। যেমন কম্বল। গায়ে দাও। ছাতা মাথায় দাও। জুতো পায়ে দাও। মানুষ হল বদ্ধ উন্মাদ। একটা মাছি তৈরি করার ক্ষমতা নেই, ডজন ডজন দেবতা তৈরি করে বসে আছে। আমি নিৎসের মতোই মাঝে মাঝে প্রশ্ন করি নিজেকে, মানুষ ভগবানের মারাত্মক ভুল, না ভগবান মানুষের মারাত্মক ভুল। বিশ্বাস মানুষের মনে ঢোকানো যায় না, বিশ্বাস মানুষের মনে তৈরি হয়। ফুলের মতো ফুটে ওঠে। ঘাসের মতো অনায়াসে গজায়।
হরিশঙ্কর অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, কেন অকারণে এত বকছি! প্রত্যেকেই প্রত্যেকের পথে হাঁটবে। পথের শেষে খুঁজে পাবে বেঁচে থাকার উপলব্ধি। এত যুক্তিতর্কের কী প্রয়োজন! কুকুরের লেজ বাঁকা, বাঁকাই থাকবে। ঘোড়ার লেজ সোজা ঝুলে থাকবে চামরের মতো। শত চেষ্টাতেও তার পরিবর্তন হবে না। বাজে না বকে, যাই দেখে আসি প্রকৃতির খেলা। দামোদরের জল কত দূর এল! পথে উঠে পড়েছে কি না?
