তিনি কাঁপতে কাঁপতে একপাশে হেলে পড়ছিলেন, ছোটদাদু এসে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, যো জিসকো শরণ লিয়ে সো রাখে/উসিকো লাজ/উলট জলমে মছলি চলে/বহি যায় গজরাজ। পণ্ডিতমশাই কার কথা?
প্রশ্ন? আর যায় কোথায়, পণ্ডিতমশাই কিছুটা ধাতস্থ হয়ে বললেন, মহামান্য, এ তো তুলসীদাস!
ছোটদাদু বললেন, তবে? অর্থ যথা পদধুলি হোয়, যৌবন নদী কর বেগ/মানুখ জলখে বিন্দু হোয়, জীবন ফেন করি লেখ ॥ এর অর্থ কী পণ্ডিতমশাই?
ছোটদাদুর আলিঙ্গনমুক্ত পণ্ডিতমশাই বললেন, ধন পদরজের ন্যায় অতি তুচ্ছ, যৌবনদশা বেগবৎ চঞ্চল, নরগণের শরীর জলবিন্দু সদৃশ; অতএব ক্ষণভঙ্গুর দেহের জন্য আপাতত সুখকর সংসারসুখে কেন মুগ্ধ, মোক্ষলাভের নিমিত্ত ধর্মোপার্জনই কর্তব্য।
তবে আপনি এমন বিচলিত হচ্ছেন কেন?
মহাশয়, মানুষের ধর্মই হল বিচলিত হওয়া। কারণ মনই মানুষের কর্তা। আমার আমি যতদিন এই দেহকে ঘিরে আছে, ততদিনই আমার দুঃখ, সুখ, জরা, ব্যাধি। তেষু বিনষ্টেষু সসু স্বয়ং বিনশ্যতি। ধর্ম হল দুর্বল মানুষের হাতিয়ার। ঈশ্বর হলেন জ্বরের রোগীর কপালের জলপটি। রোগারোগ্য হয় না, সাময়িক উপশম হয় মাত্র। আপনাদের তত্ত্বকথা অনুলেপন মাত্র। আমি ভক্ত নই। আমি বিচারশীল এক মানব। ইহলোকাৎ পরো নান্যঃস্বর্গোহস্তি নরকা ন চ। ইহলোকের পর। স্বর্গও নেই, নরকও নেই মহামান্য। সবই এইখানে। ভস্মীভূতস্য দেহস্য পুনরাগমনং কুতঃ। আমার দুঃখ-বেদনা-অনুশোচনার কোনও প্রলেপ নেই। সহ্যই আমার শক্তি।
হরিশঙ্কর সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে করমর্দন করতে করতে বললেন, এই তো চাই, এই তো চাই। এতদিনে একজন বীর মানব খুঁজে পেয়েছি। এঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করা চলে।
পণ্ডিতমশাই বললেন, অনুমান সঠিক, আপনি আমার জয়রামের পিতা।
আজ্ঞে, জন্মদাতা।
উপযুক্ত উত্তর। আপনি অতিশয় জ্ঞানী। আর ইনি এক বিশ্বাসী সাধক। মাতৃ উপাসক। মানবের পাঁচটি পিতা, পঞ্চপিতা, জন্মদাতা ভয়ত্রাতা কন্যাদাতা বিদ্যাদাতা অথবা দীক্ষাদাতা ও অন্নদাতা।
মোহনবাবু আমার কানে কানে বললেন, হয়ে গেল। আজ সাড়ে সর্বনাশ। তিন জ্ঞানী একত্র হয়েছেন।
পণ্ডিতমশাই আবার শুরু করলেন, জগৎকারণের মূল হল অহংকার। অহংকার দু’রকম, জীবের অহংকার, মানবের সমবেত অহংকার। সমবেত অহংকার সভ্যতার চাকা। আর যে-শক্তিতে পশু লেজ নাড়ে, সেই শক্তিই ব্যক্তির অহংকার। তর্জনগর্জন আস্ফালনাদি ইত্যাকার লাঙ্গুল সঞ্চালনাদি কর্ম, উপনিষদোক্ত, উত্তিষ্ঠত জাগ্রত। অহংকারশূন্য মানব কর্তিতলাল বৃহন্নলাবৎ।
হরিশঙ্করের চোখমুখ উজ্জ্বল। সার-পাওয়া লতার মতো। তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন, শাবাশ, শাবাশ।
এমন সময় ভাতের ফেন উথলাল। মোহনবাবু বললেন, পণ্ডিতমশাই অন্ন প্রস্তুত। আপনি আহারাদি সেরে নিন, আমরা আবার আসছি।
হরিশঙ্কর বললেন, শাক আপনি কীভাবে প্রস্তুত করবেন?
অতি সহজ। পাত্রে জল, জলে কিঞ্চিৎ হলুদ, কালো জিরা ও লবণ। তাইতে শাক ছেড়ে দোব। সুসিদ্ধ হলে নামিয়ে নোব। অতিশয় সুস্বাদু।
ছোটদাদু জিজ্ঞেস করলেন, এই আপনার দিবসের আহার? রাত্রিকালে?
আমি একাহারী!
শরীর দুর্বল হয়ে পড়বে না?
মহাশয়, মেধাই আমার বৃত্তি। শরীর নয়। আমার কায়িক-শ্রম নেই বললেই চলে। আমার কোনও ক্ষয় নেই। কোনও দুশ্চিন্তা নেই। একেবারে গণিতের নিয়মে শরীর চলছে।
গণিত! গণিত হরিশঙ্করের ঈশ্বর। মেধা হরিশঙ্করের ইষ্ট। তিনি লাফিয়ে উঠলেন, এই তো চাই। গণিত আপনার জীবন। আপনি সিদ্ধ মহাপুরুষ!
২.৩৯ He that looks not before
শিশুকে যেভাবে ভুলিয়ে শান্ত করে তার আকর্ষণের ক্ষেত্র থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়, মোহনবাবু ঠিক সেইভাবে হরিশঙ্কর ও ছোটদাদুকে নিয়ে এলেন। বিমলাদি দাওয়ায় বসে আছেন আপনার ভাবে বিভোর হয়ে। পিন্টু লাল মেঝের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে, দু’হাতের ভরে চিবুক রেখে গভীর মনোযোগে কী একটা বই পড়ছে। পেছনের পা দুটো হাঁটুর কাছ থেকে মুড়ে ওপরে তোলা।
আমাদের ফিরতে দেখে বিমলাদি তাড়াতাড়ি উঠে এগিয়ে এসে বললেন, আপনাদের ভারী দেরি হয়ে গেল আজ। কত বেলা হয়ে গেছে!
ছোটদাদু বললেন, কিচ্ছু ভাবিসনি মা, আমরা সব চারটের পার্টি। সকাল সকাল খায় রোগীরা।
পিন্টু অদ্ভুত কায়দায় গড়িয়ে মেঝে থেকে ঝপ করে উঠে বললে, ছোটমামা, তুমিও ছোট ছেলের মতো হারিয়ে যাও! হারিয়ে গেলে কী করতে হয় জানো? মামার নাম বলবে, আর বাড়ির ঠিকানা। তোমার মামা আছে তো?
বিমলাদির দিকে তাকাতেই করুণ মুখে একঝলক হাসি এনে বললেন, ছেলের পাকাঁপাকা কথা শোনো।
ব্যাপারটা খুবই দুঃখের। বাবার পরিচয়ে পরিচিত হবার উপায় নেই। মামার পরিচয়ই সব। শিশু জানে না তার জীবনের দুর্ভাগ্যটা কোথায়! যখন জানবে তখন সে একটা বেদনারই উত্তরাধিকারী হবে। পুরো ইতিহাস আমার জানা হবে না। তবে যদি ধর্মের কারণে বিচ্ছেদ হয়ে থাকে, তা হলে বিমলাদির কাছে আমার নিরুচ্চার প্রশ্ন, সংসার করতে গিয়েছিলেন কেন? এমন সুন্দর এক শিশুর জীবন কেন নষ্ট করলেন! পণ্ডিতমশাই ঠিক, পৃথিবী শয়তানের। এখানে ভগবানও সময় সময় শয়তানের রূপ ধরেন। না কি শয়তান ধরেন ভগবানের রূপ!
আমরা লাইন দিয়ে খেতে বসেছি। এমন সময় মোহনদার এক পরিচিত এসে জানিয়ে গেলেন, দামোদর ভয়াবহ চেহারা ধারণ করেছে। জল বাড়তে বাড়তে একেবারে টইটম্বুর। যে-কোনও সময় কূল ছাপিয়ে যাবে।
