আমি মৃত্তিকা ছেড়ে উঠেই পড়েছি। বিদ্যুৎগতিতে দরজার বাইরে থেকে জুতোজাড়া তুলে। নিয়ে দে ছুট। কোন দিকে দৌড়োচ্ছি খেয়াল নেই। একটা কালভার্টের ওপর এসে জুতো গলাবার ফুরসত হল। ওরে সর্বনাশ, কী পাল্লায় পড়েছিলুম! এক সাঁওতাল রমণী পাশ দিয়ে চলেছে। খোঁপায়। একটা কাঠি গোঁজা। এক থোকা সাদা ফুল। বয়স তেমন বেশি নয়। তবু সাহস করে জিজ্ঞেস করলুম, দোকানবাজার কোন দিকে বলতে পারেন ভাই! বেশ সাহসের দরকার হল। শুনেছি, সাঁওতাল যুবতীদের সঙ্গে কথা বললেই বন থেকে তির ছুটে আসে। মেয়েটি চিৎকার করল না, বরং হেসে জবাব দিল, সে-ও ওই দিকেই যাচ্ছে। তাকে অনুসরণ করলেই বাজার। আমি ভয়ে ভয়ে একটু পেছিয়ে গেলুম। ভয়ংকর শক্তিশালী চেহারা। পালিশ করা শরীর। উঁচু, নিচু, বর্তুল, যাবতীয় জ্যামিতির ছড়াছড়ি। অসহনীয়। কিছুক্ষণ অনুসরণের পর মনে হল, মন মহাভারত হয়ে যাচ্ছে। পণ্ডিতমশাইয়ের আর কী? তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে। এখন তিনি দিবসের অষ্টমভাগে। শাকান্ন খাবেন। যুবকের মন কী বুঝবেন! এই যে আমি পশ্চাৎগামী আর ওই যে বনবালা পুরোগামী, ষাট বছর আগের পণ্ডিতমশাই হলে কী করতেন? এখন তো তার চর্পট-পঞ্জরিকা অবস্থা–অঙ্গং গলিতং পলিতং মুণ্ডং, দশনবিহীনং জাতং তুণ্ডম। এখন তো ভজ গোবিন্দং হবেই। হরিশঙ্কর বলেন, নিরামিষাশী কেন, না দাঁত আর পারমিট করছে না হাড় চিবোনো।
হঠাৎ পেছনে হইচই, ওই তো, ওই তো যাচ্ছে।
হরিশঙ্করের গলা, পাতাল প্রবেশ করেছিল।
থেমে পড়ে পেছন ফিরে তাকালুম। তিনজন হন্তদন্ত হয়ে আসছেন, পিতা হরিশঙ্কর, ছোটদাদু, মোহনবাবু। তিনজনে এসে পড়লেন। হরিশঙ্কর বললেন, কী কায়দায় অদৃশ্য হয়েছিলে! গ্রামাঞ্চলে ভুলভুলাইয়া বলে একটা ভূত আছে, তুমি কি সেইরকম কোনও ভূতের পাল্লায় পড়েছিলে? তুমি জানো সবাই তোমার অপেক্ষায় থাকবে না খেয়ে। কবে যে তুমি একটু মানুষ হবে! মাছ ধরছিলে, না পাখি দেখছিলে?
আজ্ঞে, ওসব কিছু নয়, আমাকে বলরাম পণ্ডিতমশাই ধরেছিলেন।
মোহনদা বললেন, সর্বনাশ, তুমি ছাড়া পেলে কী করে! মহাপণ্ডিত, তবে ইদানীং মাথার গোলমাল দেখা দিয়েছে।
আমাকে ওই চতুম্পাঠীর ভেতরে নিয়ে গিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন, পৃথিবীটা শয়তানের, ভগবানের নয়। তারপর একসময় আমি ছুটে পালিয়ে এসেছি।
হরিশঙ্কর ভয়ংকর উল্লসিত হয়ে বললেন, তাই নাকি? এমন এক পণ্ডিত আছেন এখানে? আমার মতের সমর্থক। তা হলে এক রাউন্ড বসে যাই। এমন সুযোগ আর পাব না। আমি প্রথমে অস্বীকার করব। শুরু হবে তর্ক। কতকাল পরে আবার তর্কযুদ্ধ। প্রতিজ্ঞা, হেতু, উদাহরণ, উপনয়, নিগমন। ন্যায়শাস্ত্রের লন্ডভন্ড। চলো চলো, যাই। এমন সুযোগ আর পাব না।
ছোটদাদুও লাফিয়ে উঠলেন, চল চল, দুই চৈতন্যের লড়াই দেখি।
মোহনবাবু করুণ মুখে বললেন, একেবারে অবেলা হয়ে গেছে, যা হয় কিছু সেবা করে নিন আগে। পিত্তি পড়ে যাচ্ছে। বিমলা বসে আছে পথ চেয়ে। তা ছাড়া দুর্ভাবনা, ছেলেটা দামোদরেই চলে গেল কি না!
হরিশঙ্কর বললেন, তা হলে একবার দর্শন করে যাই। অন্তত জানিয়ে যাই, আমরা আসছি, একঘণ্টার মধ্যে।
আমি বললুম, পণ্ডিতমশাই মোহনবাবুর খুব প্রশংসা করছিলেন। তা তিনি নিজেও অভুক্ত। পণ্ডিতমশাইকে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গেলে হয় না?
মোহনবাবু বললেন, তিনি স্বপাক ছাড়া খান না। আর এক যদি তার মা বেঁধে দেন। চলুন তাঁকে আমরা বলে চলে যাই।
ছোটদাদু বললেন, আর কি আমরা সময় পাব! আমাদের তো যেতে হবে।
মোহনবাবু বললেন, আজ আর যাওয়া হবে না। কাল সকালে বেরোবেন। দূরের পথ। পৌঁছোতে অনেক রাত হয়ে যাবে।
আমরা সদলে চতুম্পাঠীতে প্রবেশ করলুম। জানতুম প্রথম থেকেই হরিশঙ্কর মুগ্ধ বিমুগ্ধ হতে হতে একেবারেই সমাহিত অবস্থায় চলে যাবেন। এত গাছ, ফুল, প্রজাপতি, কঞ্চির বেড়া, মৌচাক, ভ্রমর। আহা ওহো করছেন আর ছোটদাদু তাকে ঠেলছেন, চল, চল এগিয়ে চল এগিয়ে চল।
অবশেষে পণ্ডিতমশাইকে পাওয়া গেল পেছনের বারান্দায়। ইটের মাঝখানে কাঠ জ্বেলেছেন। যত না আগুন তার চেয়ে বেশি ধোঁয়া। মাটির হাঁড়িতে ভাত ফুটছে। আস্ত একটা বেগুন জলচর প্রাণীর মতো হাবুডুবু খাচ্ছে। পণ্ডিতমশাই একপাশে বেশ আরামে বসে শাক বাছছেন। এতই তন্ময় আমাদের উপস্থিতি টের পেলেন না। নিজের ভাবেই মৃদু মৃদু হাসছেন। হঠাৎ বললেন, যাবে যাও। কে তোমাকে ধরে রেখেছে?
মোহনবাবু যেই ডেকেছেন, পণ্ডিতমশাই, অমনি চমকে উঠেছেন, কার সঙ্গে কথা বলছেন?
আরে একটু আগে একটি ছেলে এসেছিল, সে নাকি তোমার ওখানেই অতিথি হয়েছে, তাকে দেখতে ঠিক আমার সেই বড় ছেলেটার মতো, সেই যে গো জয়রাম, টাইফয়েডে মারা গেল, ছেলেটা ছুটে পালাল। অনেকদিন পরে তার সঙ্গে বেশ একটু শাস্ত্র আলোচনা হচ্ছিল, যেমন হত জয়রামের সঙ্গে, আহা বেচারার বোধহয় খুব খিদে পেয়েছিল, বুঝলে মোহন!
পণ্ডিতমশাই, সে আবার এসেছে। সঙ্গে তার পিতা আর মহাসাধক দাদু এসেছেন।
পণ্ডিতমশাই তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর কোল থেকে কিছু শাকপাতা ঝরে পড়ল। তিনি আকুল হয়ে বলতে লাগলেন, কোথায় আমার জয়রাম কোথায়, কোথায় আমার রাম!
রাম রাম বলতে বলতে বৃদ্ধ অঝোরে কেঁদে ফেললেন। বৃদ্ধের চুল সাদা, বৃদ্ধের ভুরু সাদা, সাদা চোখের পাতা। দু’গাল বেয়ে জলের ধারা নেমেছে। ঠোঁটদুটো তিরতির করে কাঁপছে, আর মাঝে মাঝে শব্দ বেরোচ্ছে, রাম, জয়রাম।
