আজ্ঞে না, আমার তো এখনও আহারাদি হয়নি।
সে তো আমারও হয়নি। আমার তো স্বপাক। তুমি ব্রাহ্মণ? আমার তো তাই মনে হয়।
আজ্ঞে যথার্থই।
তবে? ব্রাহ্মণের জীবনধারণের বিধি কী? আমি কীভাবে বললুম তুমি ব্রাহ্মণ? তোমার শরীরে কোথাও লেখা আছে? না, আছে তোমার সূক্ষ্ম শরীরে। আমি সেই সূক্ষ্মের বর্ণ দেখতে পাচ্ছি ব্রাহ্মণানাং সিতো বর্ণঃ ক্ষত্রিয়ানাং চ লোহিতঃ। বৈশ্যানাং পীতকশ্চৈব শূদ্রাণাম অসিতস্তথা ॥ পদ্মপুরাণে একথা বলা হয়েছে। মানুষের ভেতরের বর্ণ দেখা যায়, তোমরা ইংরিজিতে যাকে বললো টাইপ। ব্রাহ্মণের বর্ণ শুক্ল, ক্ষত্রিয়ের লোহিত, বৈশ্যের পীত, শূদ্রের কৃষ্ণ। শুক্ল মানে শ্বেত, মানে সাদা, অর্থাৎ ব্রাহ্মণ হবে সাত্ত্বিক। খাওয়া হল না খাওয়া হল না বলে ছটফট করছ। একদিন আহার না হলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে! এক তো নিজেকে পতিত করে ফেলেছ শবৃত্তি নিয়ে। শবৃত্তির অর্থ বুঝলে?
আজ্ঞে না। তবে ওই ধরনেরই একটা শব্দের অর্থ কুকুর।
কাছাকাছি গেছ। শব্দটার অর্থ দাসত্ব। ব্রাহ্মণের দাসত্ব করা উচিত নয়। মনুর নির্দেশ, নিজের জীবনযাত্রার প্রয়োজন এরূপভাবে সংকীর্ণ করবে যেন কোনওদিন না শবৃত্তির আশ্রয় নিতে হয়। সংস্কৃত শুনলে ভয়ংকর উত্তেজিত হয়ে পড়ছ, তোমার মুখ দেখেই বুঝতে পারছি, তবু আমি বলব যাতে তোমার কান তৈরি হয় ঋতামৃতাভ্যাং জীবেৎ তু, মৃতেন প্রমৃতেন বা/ সত্যান্তাখ্যয়া বাপি ন খুবৃত্ত্যা কদাচন ॥ ব্রাহ্মণ ঋত ও অমৃত দ্বারা, মৃত ও প্রমৃত দ্বারা, সত্য ও অনৃতদ্বারা জীবিকা অর্জন করবেন, কদাচ শবৃত্তি করবেন না। এইবার আমার পিসবাবু পড়েছেন বিপদে। শ্লোকে বহু শব্দ, যার অর্থ তিনি জানেন না। তাকিয়ে আছেন বোকার মতো। ঋতের অর্থ কী? শিলোঞ্ছবৃত্তি। সেটা কী? কৃষকেরা ফসল কেটে নিয়ে যাবার পর ক্ষেত্রে যে শস্যকণা পড়ে থাকে তা সংগ্রহ করে জীবনধারণ। অমৃতের অর্থ অ্যঞা, অর্থাৎ কারও কাছে কখনও কিছু না চাওয়া, মৃতের অর্থ ভিক্ষাচর্য। প্রমৃতের অর্থ কৃষিকর্ম আর সত্যানৃতের অর্থ বাণিজ্য! তুমি এই সবকটি করতে পারো; কিন্তু শবৃত্তি কখনও নয়।
সাহস করে বললুম, যদি অনুমতি করেন তা হলে আমি এইবার নিজকর্মে যাই।
আজ্ঞে না, তোমার এখনও ছুটি হয়নি। বলরাম এখনও তোমাকে ছুটি দেয়নি অবোধ। এই প্রসঙ্গের শেষ কথাটি তোমাকে বলা হয়নি। সেটি মহাভারতের বনপর্বে আছে। মানুষের জীবনের কাম্য কী? সুখ। সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু/অনলে পুড়িয়া গেল/অমিয়া-সাগরে সিনান করিতে/সকলি গরল ভেল।/সখি কি মোর করমে লেখি/শীতল বলিয়া ও চাঁদ সেবি/ভানুর কিরণ দেখি। /উচল বলিয়া অচলে চড়িতে/পড়িনু অগাধ জলে/লছিমী চাহিতে দারিদ্র বেঢ়ল/মাণিক হারানু হেলে ॥ জ্ঞানদাসের পদ। সবই সুখের লাগি। সুখ কোথায়? সুখ মহাভারতের বনপর্বে। যুধিষ্ঠির বলছেন ধর্মকে, পঞ্চমেহহনি ষষ্ঠে, বা শাকং পচতি স্বেগৃহে/অনৃণী চাপ্রবাসী চ স বারিচর মোদতে ।। হে জলচর যক্ষ! যে ব্যক্তি পঞ্চম বা ষষ্ঠ দিনে নিজের গৃহে বসে শাকান্নও পাক করে অথচ সে ঋণী ও প্রবাসী নয়, সে-ই সুখী। অতএব তুমি কী খাওয়ার জন্যে ব্যস্ত হচ্ছ! শবৃত্তির জন্যে তোমাকে তো প্রবাসী হতে হবে।
অবাক হয়ে চেয়ে রইলুম পণ্ডিতমশাইয়ের শীর্ণ কিন্তু উজ্জ্বল মুখের দিকে, আপনি কেমন করে জানলেন?
বৃদ্ধ রহস্যের হাসি হেসে বললেন, সৎ, সাত্ত্বিক, শাস্ত্রসম্মত জীবনযাপন করলে মানুষের মধ্যে একটা শক্তি জাগ্রত হয়! তার প্রমাণ তুমি এইমাত্র পেলে।
আজ্ঞে আমি এইবার আসি হলে। এইবার আমাকে খুঁজতে বেরোবে। বিশ্বাস করুন আমি প্রায় সবই বুঝতে পেরেছি।
তুমি কিছুই যে বোঝোনি তোমার আচরণই তার প্রমাণ। তুমি শুধু জীবিকার দাস নও তুমি সময়ের দাস, পরিবেশের দাস, ঘটনার দাস। তোমার অবস্থা খোটায় বাঁধা গোরুর মতো। তোমাকে অমূল্য কিছু সম্পদ দিতে চাইছি, তুমি নিতে পারছ না। তোমার ভেতরে আধ্যাত্মিক একটা আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল না?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
কোথায় গেল?
মনে হয় চাপা পড়ে গেছে।
তোমার কিন্তু সংস্কার ছিল। কু-চিন্তা আসে? কদাচারে অভ্যস্ত?
আজ্ঞে না।
তা হলে তো তুমি মহাপুরুষ হে! বৃদ্ধ হাহা করে ব্যঙ্গের হাসি হাসলেন। হাসি থেমে গেল। মুখ ভয়াবহ আকার ধারণ করল। চোখ রক্তবর্ণ। হিরণ্যকশিপুর মতো হুংকার ছাড়লেন, অনৃতভাষী। কুচিন্তা আর অবিরত বীর্যক্ষয় ছাড়া কারও এমন মলিন চেহারা হয় না। তোমার। স্মৃতি-মেধা-ধৃতি-পুষ্টি, সবই সছিদ্র পাত্রের জলের মতো বেরিয়ে যাচ্ছে। তুমি পাপাচারী।
আজ্ঞে, বিশ্বাস করুন আমার অসুখ করেছিল।
করেছিল কী? করে আছে। সেই অসুখ সারাতে হবে যুক্তি তর্ক বুদ্ধি দিয়ে। সংকল্প দিয়ে, শ্রম দিয়ে।
বিশ্বাস করুন, আমি খুব চেষ্টা করছি।
কোথায় বসে? জ্বরের রোগী বসে আছ আচারের ঘরে!
আমাকে একজন বলেছেন ডন-বৈঠক মারতে। হাজার ডন, হাজার বৈঠক। তা হলে কুচিন্তা কুভাব কেটে যাবে।
ঠিক, ঠিক বলেছেন। এ তো স্বামী প্রণবানন্দজি মহারাজের দাওয়াই। তা তোমার যা শরীর, পঞ্চাশে উঠতেই হার্টফেল করবে।
একটা কথা বলব? আমার পিতা আপনার চেয়েও ক্রোধী। আমি এখন যাই। ওদিকটা সামলে আবার আসব।
শোনো, যা দিয়ে শুরু সেটা শেষ না হলে যাবে কী করে! পৃথিবী শয়তানের এইটাই তো ছিল আমাদের প্রমেয়। বললেই তো হল না, প্রমাণ করতে হবে। ধরো আমি বললুম আকাশ নীল। তুমি দেখলে। দেখে বললে, আজ্ঞে হ্ৰা, আকাশ নীল। বিজ্ঞানী এসে বললেন, তোমরা দু’জনেই ভুল। করলে, আকাশ কালো, অজস্র ধূলিকণায় সূর্যকিরণ প্রতিফলিত হয়ে নীল দেখায়। বিজ্ঞানের প্রমাণ গবেষণাগারে। মতের প্রমাণ ন্যায়শাস্ত্রে, যুক্তিতে। আমি যদি বলি, মানুষ দেবতা নয় দানব, আমাকে যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। সবার আগে নির্দেশ করতে হবে সংজ্ঞা। দানবের সংজ্ঞা কী? দেবতার সংজ্ঞা কী? আর দেব ও দানবের মাঝে মানবেরই বা সংজ্ঞা কী? দিতি যখন শয্যা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন কশ্যপ তখন বললেন, তোমার চিত্ত অপবিত্র, তুমি কামাতুরা, তোমার দুই অধম পুত্র হবে, তারা হবে অসুর। তিনি যখন অসুর বলছেন, তখন অসুরের একটা সংজ্ঞা আছে। যেমন ধরো। আম। আমের সংজ্ঞা নির্দেশে বিচার্য কী কী? প্রথম আকার, আকৃতি, বর্ণ। দ্বিতীয়, তার অভ্যন্তর, তৃতীয়, তার স্বাদ। চতুর্থ বৃক্ষ। এখন তুমি যদি বলো আমের স্বাদ মিষ্টি, তা হলে হল না। আম ভীষণ মিষ্টিও হতে পারে, ভীষণ টকও হতে পারে। তোমাকে বলতে হবে অম্লমধুর। এইবার এসো জননী বৃক্ষে। আবৃক্ষসকল একইরকম দেখতে হলেও ফল মিষ্ট হতে পারে, অশ্লও হতে পারে, অতঃপর উপমা স্থানান্তর। বৃক্ষ থেকে মানবে। মানব যোনি থেকে দেবতা আবির্ভূত হতে পারে অসুরেরও জন্ম হতে পারে। যেমন, কশ্যপের দুই স্ত্রী, দিতি ও অদিতি। অদিতির পুত্ররা হলেন দেবতা, দিতির পুত্ররা হলেন দানব। সুতরাং আমের সংজ্ঞা নির্ধারণে বৃক্ষের যে ভূমিকা, দেব-দানবের সংজ্ঞা নির্ধারণে যোনিরও সেই ভূমিকা। অতএব ওটি গৌণ। আমাদের বিচার থেকে উৎসকে সরিয়ে রেখে আর একটি বিচার আনব যা ওই বিচার থেকেই উৎপন্ন, সেটি হল বীজ ও মৃত্তিকা। বীজ ও মৃত্তিকাকে ভেঙে আনব উপাদান ও পরিবেশ। পরিবেশকে ভাঙো, খনিজ উপাদান, জলবায়ু। বীজকে ভাঙো, অর্থাৎ বীজের সংস্কার। এখানে একটা ব্যতিক্রম চিহ্নিত করি। এক, ল্যাংড়ার বীজে ল্যাংড়াই হবে। দুই, হিরণ্যকশিপুর বীজে অসুরই হবে। প্রশ্ন, হিরণ্যকশিপুর প্রহ্লাদ হল কেন, কশ্যপের কেন হিরণ্যকশিপু হল? দ্বিতীয় প্রশ্ন, বীজ কি তা হলে মৃত্তিকার গুণে গুণান্বিত! অনুসন্ধান, ল্যাংড়ার কি গুণভেদ হয়? হয়। উত্তরপ্রদেশের ল্যাংড়া অতিশয় সুস্বাদু, আঁটি পাতলা, আঁশ নেই। পশ্চিমবাংলায় সামান্য আঁশ আছে, আঁটি বড়, স্বাদে অম্লমধুর। সিদ্ধান্ত, কশ্যপের বীজ, মূল বীজ, দিতির যোনি ভাল নয়, হিরণ্যকশিপু ও হিরণ্যাক্ষের জন্ম। হিরণ্যকশিপুর স্ত্রী কয়াধুর যোনি ভাল ছিল। তাই কশ্যপের বীজ হিরণ্যকশিপু বাহিত হয়ে কয়াধুর গর্ভে দেবোপম প্রহ্লাদের জন্মের কারণ। অতএব মৃত্তিকাই নিয়ামক। অর্থাৎ পৃথিবী হল অধঃপতনের স্থান। পতিত জায়গা। প্রমাণ…।
