আজ্ঞে, সেইভাবে বলতে গেলে আমি কেউ নই। আমরা সোনামুখি অঞ্চলের এক গ্রামে যাচ্ছি।
সঙ্গে সঙ্গে পণ্ডিতমশাই চেপে ধরলেন, বহুবচন ব্যবহার করলে কেন? তুমি তো এক এবং একক।
আজ্ঞে, আমার পিতা এবং দাদু মোহনবাবুর অতিথি হয়েছেন।
কেমন দাদু? পিতামহ না মাতামহ?
আজ্ঞে পিতার ক্ষুদ্র মাতুল।
ক্ষুদ্র হবে না বাবাজি, বলো কনিষ্ঠ। মোহন অতি সদাশয় চরিত্র। বড় বংশের সন্তান। চন্দ্রচূড়ের সম্পর্কিত। বিমলার ওই বংশে বিবাহ হয়েছিল, সে বিবাহ সুখের হয়নি। বিমলা ঐশী শক্তির অধিকারী। তার ছেলেটি প্রতিভাধর। আমার বিশ্বাস মোহনের পিতামহ পুনর্জন্ম গ্রহণ করেছেন। তিনি ছিলেন বর্ধমানরাজের সভাসদ, সংগীতগুণী। মোহনের বাস্তুভিটে দামোদর নিয়ে গেছেন। মোহনের পিতামহ এক যবনির আকর্ষণে পড়ে সংসারে দুর্যোগ নিয়ে এলেন। মোহনের পিতা ছিলেন সৎ, সাত্ত্বিক। সৎ মানুষের পক্ষে বিত্ত প্রভুত্ব অর্জন করা অসম্ভব। তোমার কী ধারণা? পৃথিবীটা কার?
বেশ একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। আধুনিক ধারণা বলব, না প্রাচীন? মানুষটি যখন প্রাচীন তখন প্রাচীন বিশ্বাসই পছন্দ করবেন, আজ্ঞে, সৃষ্টি তো ভগবানের।
বৃদ্ধ খাঁইখাঁই করে উঠলেন, অর্বাচীন! পৃথিবী শয়তানের। ভগবানের হলে তিনি এখানে বসবাস করতেন। মানুষ হল শয়তানের চেলা। শয়তানের সন্তান। এখানে যারা ঈশ্বরের ভজনা করে তারা। সব বিদ্রোহী। বিধর্মী। কোথায় আছ? তুমি কে? কিছুই খবর রাখো না! ট্যাকোস ট্যাকোস করে এঁড়ে বাছুরের মতো পৃথিবীর পথে হেঁটে মরছ। এসো আমার সঙ্গে।
সামনেই আটচালা। বাইরে বড় বড় করে লেখা–বলরাম চতুষ্পঠী। সামনে একটু বাগানমতো। মাঝখান দিয়ে পথ চলে গেছে। বালিবালি মাটি। প্রচুর সাদা ফুল। সাদা জবা ডালের ডগায় নিশ্বাসের মতো প্রকৃতির ফিকে বাতাসে টুলুর টুলুর দুলে উঠছে। বৃদ্ধ আগে আগে চলেছেন টরটর করে।
চতুষ্পঠীর দরজা খুললেন। মেঝেতে পাটি পাতা আমাকে বললেন, বোসো। পাদুকা বাইরে।
একটু ইতস্তত করে বললুম, আমি যে জামাকাপড়ের দোকান—
বৃদ্ধ খিঁচিয়ে উঠলেন, হস্তীমূর্খ! এই বেলায় তুমি কোন চুলোয় যাবে, কে বসে আছে তোমার জন্যে?
একপাশে বসে পড়লুম। এপাশে ওপাশে কয়েকটা লেখার চৌকি। দোয়াত কলম।
২.৩৮ God, like a gardener
এমন ফাঁপরেও মানুষ পড়ে! বৃদ্ধ পণ্ডিতের অদ্ভুত এক আকর্ষণী শক্তি। বলতেও পারছি না, আমাকে যেতে হবে। আমার জন্যে সবাই অপেক্ষা করে বসে আছেন। দানাপানি পড়েনি পেটে। ঘরের কোথাও বোধহয় চাঁপাফুল আছে। ভুরভুর করে গন্ধ বেরোচ্ছে। বৃদ্ধ আমার সামনে বসলেন। একটা চৌকি টেনে নিয়ে হাতদুটো তার ওপর রাখলেন। আশি বছরের তুলনায় বেশ ভালই স্বাস্থ্য। চামড়ায় সামান্য কুঞ্চন।
বৃদ্ধ প্রশ্ন করলেন, একটা গন্ধ পাচ্ছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ, চাপাফুলের।
ত্রিসীমানায় কোথাও চম্পক নেই। রহস্যটা আজও আমার কাছে পরিষ্কার নয়, তবে এইসময় একটা স্বর্ণগোধিকা আসে বাগানে। তার শরীর থেকে এই গন্ধ বেরোয় কি না জানি না। তোমার জানা আছে?
আজ্ঞে না। আমি তো কলকাতার ছেলে।
ও, তার মানে সর্ব বিষয়ে অজ্ঞ। তোমরা তো দাসত্ব করার জন্যে জন্মাও। তুমি দাস হয়েছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ। একটা চাকরি করি।
ঘোড়া হয়েছ?
আজ্ঞে প্রশ্নটা সবিশেষ বোধগম্য হল না।
মানে লাগাম চড়িয়ে কোনও রমণী পৃষ্ঠদেশে আরোহণ করেছে?
আজ্ঞে না, বিবাহ এখনও করিনি।
আর দেরি নেই এইবার হয়ে যাবে। শোনো, যে কারণে তোমাকে বসালুম, আমি নৈয়ায়িক, তোমাকে আমি বুঝিয়ে দেব কেন পৃথিবী শয়তানের! হিরণ্যকশিপুর নাম শুনেছ?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আর কিছু জানো?
অসুর ছিলেন।
সুর-অসুরের প্রশ্ন ছাড়ো। এই পৃথিবীরই এক সম্রাট ছিলেন। কার সন্তান? না মহাঋষি কশ্যপের সন্তান। বোঝে ঠ্যালা। ঋষিরও কাম আছে। তিনি আবার দুই স্ত্রী রেখেছিলেন দিতি আর অদিতি। আমরা এক বিবাহতেই ভয়ে মরি। ছেলেপুলে বেশি হলে লজ্জা পাই। এইবার কী হল? দিতি একদিন ভরসন্ধ্যাবেলা কশ্যপের কাছে এসে হাজির। পূজা-পাঠ-প্রার্থনার জন্যে নয়। সন্ধ্যার প্রদীপ দিতে বা শাঁখ বাজাতেও নয়। তিনি স্বামীকে বললেন, এসো আমাতে উপগত হও। আমি একটি বলবান পুত্র চাই। মহর্ষিও তেমনি, সন্ধ্যাহ্নিক ভুলে সেই কালবেলাতেই মেতে গেলেন কামকলায়। বলতে পারলেন না, সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হোক, জপাহ্নিক সমাধা হোক, রাত্রি গভীর হোক, তারপর না হয় দেখা যাবে। শাস্ত্রের নির্দেশই আছে, প্রাতে দ্বিপ্রহরে সায়াহ্নে মিলিত হওয়া উচিত নয়। সন্ধ্যায় নিতান্ত সাধারণ মানুষও ক্ষণকালের জন্যে ঈশ্বর চিন্তা করে। যেমন ঋষি তার তেমন পত্নী। কশ্যপ জানতেন কামজ সন্তান সুসন্তান হতে পারে না। তিনি যে সময়ের, সেই সময় হল ভারতের আধ্যাত্মিক উন্মেষের কাল। বেদ, বেদান্ত, উপনিষদ তৈরি হচ্ছে ঋষিদের তপোবনে। প্রজনন কামক্রিয়া নয়, এক মহাযজ্ঞানুষ্ঠান। যোষারূপ অগ্নিতে বীৰ্যাহুতি। ছান্দোগ্য উপনিষদ বলছেন যোষাবাব গৌতম! অগ্নিঃ। তস্মিন্ এতস্মিন্ অগ্নৌ দেবা রেতো জুহুতি তস্যা আহুতেঃ গর্ভঃ সম্ভবতি। বুঝলে কিছু? সংস্কৃতর চর্চা তো উঠেই গেল দেশ থেকে। সায়েবরা সেবা দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, দিশি সায়েবরা এসে সোজা গলায় ঠ্যাং তুলে দিলে। পাতলুন পরা বড় সায়েবের দল। দেশটা তেনাদের বাতকর্মে দুর্গন্ধময়। তুমি অমন ছটফট করছ কেন বাবাজি? প্রকৃতির ডাক?
