কেন থাকবেন না?
এই তো তোমার মা নেই।
সে তো অন্য ব্যাপার গো। আমি যখন তোমার চেয়েও ছোট সেইসময় আমার মায়ের খুব অসুখ করল। সে আর আমি কী করব বলো! ডাক্তাররা কিছুই করতে পারলেন না। শোনো, তুমি বড় হয়ে ডাক্তার হবে কেমন? খুব বড় ডাক্তার। তোমার এই ছপটির মতো। অসুখের গায়ে সপাসপ হাঁকাবে, অসুখ মরে যাবে, রুগি ভাল হয়ে যাবে। তোমাকে দেখামাত্রই সব অসুখ চিৎকার করবে, পালা পালা, পিন্টু ডাক্তার এসে গেছে।
পিন্টুর ভীষণ ভাল লাগল কথাটা। খুব হাসি, আমি তো ডাক্তারই হব। জানো তো, আমার মোহনমামার গলায় কী হয়েছে? ডাক্তারবাবু বললেন, মোহন, তুমি খুব সাবধান হও। খুব শক্ত রোগ। তিন বছরও বাঁচতে পারো, আবার দু’বছরও বাঁচতে পারো, তবে জেনে রাখো মোহন মরতে তোমাকে হবেই। ইস, এই সময়ে যদি আমি তাড়াতাড়ি বড় হয়ে ডাক্তারটা হয়ে যেতে পারতুম!
পিন্টু আবার আকাশের দিকে তাকাল। আকাশ একেবারে স্বচ্ছ নীল। সেই চিলটা আর নেই। পিন্টুর চোখে জল। হঠাৎ হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল, আমার মোহনামা মরে যাবে। আমি তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলুম, তুমি কঁছি কেন? কে বলেছে, মোহনমামা মারা যাবে? কে এক ডাক্তার বললেই হল? জানো তো, আমার যে দাদু এসেছেন, তার খুব শক্তি। আমরা দুজনে মিলে ধরব। মোহনমামার অসুখ ভাল করে দেবেন।
বুক থেকে মাথা তুলে চোখ মুছতে মুছতে পিন্টু বললে, কখন বলবে?
যখন সব কাজ হয়ে যাবে, তখন গিয়ে বলব, দাদু, আমার মোহনমামাকে ভাল করে দিন।
আমরা এসে দাওয়ার একধারে বসলুম। ছোটদাদু ঠাকুরঘরে পুজোর আসনে বসেছেন। তার চওড়া ফরসা পিঠ দেখতে পাচ্ছি। বসে আছেন নিশ্চল ধ্যানে। হরিশঙ্কর এমন এক চেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানেন। একটা হারিকেন নিয়ে পড়েছেন। কল গোলমাল করেছে, পলতে উঠছে না। সেইটাকে চেষ্টা করছেন ঠিক করার। চারপাশে ছড়ানো যন্ত্রপাতি। কোনওভাবে খবর পেয়েছেন কল কাজ করছে না, আর তো তাকে নিরস্ত করা যাবে না। কাজই ঈশ্বর, এই তার বিশ্বাস।
তাঁর পাশে বসে কানে কানে বললুম, আজ বিমলাদির ছেলের জন্মদিন।
ইজ ইট? বেশ, ব্যবস্থা হবে। চলো তা হলে কায়দা করে একবার বাজারে যাই।
এখন তো সব বন্ধ।
ক্যাশ টাকা দেওয়া তো ভাল দেখাবে না, তুমি একবার চুপি চুপি বেরিয়ে দেখো না! গঞ্জে কাপড়ের দোকান, বাসনের দোকান, এসব খোলা থাকে। এটা তো বিজনেস সেন্টার। দুটো জেলার বর্ডার। যাও, বেরিয়ে যাও।
একা পারব? যদি হারিয়ে যাই?
হরিশঙ্কর ভীষণ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন, স্ট্রেঞ্জ! তুমি মেয়েছেলে হলে না কেন? ইউ নিড এ শাড়ি অ্যান্ড পেটিকোট।
আমি তার হাতে সামান্য চাপ দিয়ে বললুম, একটু আস্তে, সবাই শুনতে পাচ্ছেন।
ফিসফিস করে বললেন, এই লজ্জা যাতে পেতে না হয় সেইভাবে চরিত্র সংশোধন করো না! এটা ইউরোপ আমেরিকা নয়, একটা গঞ্জ, এখানে তুমি কোথাও হারাতে পারো?
বেশ উত্তেজিত অবস্থায় পথে বেরিয়ে এলুম। নিস্তব্ধ দ্বিপ্রহরের সমস্ত মহিমায় মণ্ডিত হয়ে পড়ে আছে জনশূন্য পথ। মাঠের পর মাঠ। ছোট ছোট ডোবা। জলে ভাসছে নীল আকাশ। লেজের বহর নিয়ে ডালে বসে শিস দিচ্ছে ফিঙে পাখি। শীর্ণ চেহারার গাভী টুকুস টুকুস করে হেঁটে চলেছে অনিশ্চিত কোনও গন্তব্যে। একটা বাচ্চা মেয়ে এক্কাদোক্কা খেলতে খেলতে চলেছে। হাতে খোলামকুচি, ছেলেবেলায় যাকে আমরা বলতুম চাপ্পা। সেইটাকে দূরে ছুঁড়ে দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এক পায়ে। আবার তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে। রংচটা ফ্রক। পিঠের বোতাম নেই। একটাও। ছোট্ট একটা বিনুনি লাফানোর ছন্দে দুলছে এদিক-ওদিক।
মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলুম, তোমাদের এদিকে দোকানবাজার কোন দিকে?
মেয়েটি ফিক করে একটু হাসল। আমি তার মাথায় হাত রেখে বললুম, বলো, কোন দিকে?
মেয়েটি ঘাড় হেঁট করে জড়োসড়ো হয়ে গেল।
দোকানবাজার নেই?
ফিসফিস করে বললে, আছে।
বলো কোন দিকে?
দিগন্তের দিকে হাত তুলল। এইটুকু একটা হাত। বললে, ওই দিকে।
তুমি কোথায় যাচ্ছ?
লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে বললে, জানি না।
এমন সময় পেছন দিক থেকে এক প্রবীণ মানুষ টুকটুক করে আমাদের অতিক্রম করে গেলেন। দেখে মনে হল পণ্ডিতমশাই। তাঁকেই ধরলুম, অনুগ্রহ করে বলবেন, এদিকে দোকানবাজার কোন দিকে গেলে পাব?
তিনি ঘোর সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, কেন?
আজ্ঞে, আমি কিছু জিনিস কিনতে চাই।
সহজে ছাড়ার মানুষ নন, পালটা প্রশ্ন করলেন, উদ্দেশ্য?
ঘোর সমস্যা। কোনও কিছু কেনার উদ্দেশ্যটা কী? তিনি থামেননি। চলতে চলতেই যাবতীয় প্রশ্নোত্তর। সংকটে নিদানকালে মাগো আমি তোমার শরণ মাগি। পণ্ডিতমশাই বললেন, কী ধরনের বস্তু তুমি কিনতে চাও? তুমি কি নবাগত? নবাগত হওয়াই স্বাভাবিক, তা না হলে প্রশ্ন করবে কেন? তুমি কি চন্দ্রচূড় চৌধুরীর জামাতা?
আজ্ঞে না। তিনি কে?
পণ্ডিতমশাই নিজের মনেই বললেন, বিনীত ও সভ্য। অবশ্যই সদ্বংশোদ্ভূত। আমার চরিত্র বিশ্লেষণের পর তার মনে হল একটু ঘনিষ্ঠ হওয়া চলে। আমরা কিন্তু হেঁটেই চলেছি। পণ্ডিতমশাই প্রশ্ন করলেন, আমার বয়স তোমার অনুমানে কত?
নিজের অজান্তেই শুদ্ধ ভাষা বেরিয়ে এল, আজ্ঞে পঞ্চাশোর্ধ্ব।
তিনি বিজয়ী হাসি হেসে বললেন, অর্বাচীন! তিরিশ বর্ষ পূর্বেই আমি পঞ্চাশ অতিক্রম করেছি। এবং আমার মাতা আজও জীবিত। এই অঞ্চল একদা অতি সমৃদ্ধ ছিল। আজ অতিশয় শ্রীহীন। হেতু দুর্ভিক্ষ, ম্যালেরিয়া। মশককুল নিশ্চিহ্ন করেছে সভ্যতা সংস্কৃতি। শ্রীমান চন্দ্রচূড় ছিলেন এতদ। অঞ্চলের বদান্য ভূস্বামী। ওই দেখা যায় তার প্রাসাদ। কালগর্ভে বিলীন। একটি প্রান্তে তার বংশধরেরা অস্তিত্ব বজায় রেখেছেন এবং মরা হাতি লাখ টাকা। তা বাবাজি তুমি তা হলে কে?
