বিধুজ্যাঠা প্রায় ঠেলেঠুলেই ঘরে ঢুকে এলেন। একটা জ্বলন্ত উনুন যেন পাশ দিয়ে চলে গেল, এত উত্তাপ! চেয়ারে যেন নিজেকে ছুঁড়ে দিলেন। নিজের ডান পা-টাকেই বাঁ পায়ের হাঁটুর ওপর এমনভাবে রাখলেন যেন বন্দুক ঘোরাচ্ছেন! পিতাও প্রায় সেইভাবেই চেয়ারে বসলেন। এঁদের শরীরে এখন খোঁচা মারলে রক্ত বেরোবে বলে মনে হয় না। রেলগাড়ির স্টিম বেরোবে ফাঁস করে।
পিতা বললেন, কীসের দেনাপাওনা! কীসের দেনাপাওনা! আমার কাছে কেউ এক কপর্দকও পায় না।
পায় পায়, হরিশঙ্কর। নেবার সময় লোকে খুব কাঁদুনি গায়, দেবার সময় তিড়িং তিড়িং লাফায়।
শুনুন, শুনুন, আমি আপনাকে হাড়েহাড়ে চিনি। জীবনে আপনার ত্রিসীমানা মাড়াইনি, মাড়াবার ইচ্ছেও নেই। না খেয়ে মরব সেও ভি আচ্ছা, তবু আপনার মতো এক দালালের কাছে কখনও টাকা ধার করতে যাব না, বুঝলেন? আর তা ছাড়া বাপমায়ের আশীর্বাদে আমি ভিখিরি নই। নিজের ম্যাও নিজেই সামলাতে পারি। তার জন্যে দালালের দরজায় যেতে হবে না।
হরিশঙ্কর, অহংকার ভাল, তবে কী জানো, তোমার মেজদা, যার মেরে তোমার এই বোলচাল, তার শেষের দিনে এই বিধুশৰ্মাই তো ম্যাও ধরেছিল। তোমার মেজবউদি যখন মরোমরো, তুমি তো তখন উড়ছ। বাড়িতে আসর বসাচ্ছ, রাজ এস্টেট থেকে ওস্তাদ আনাচ্ছ, বাড়িতে রেখে বিরিয়ানি ওড়াচ্ছ, আর ওদিকে তোমার মেজদা দু’বেলা আমার কাছে এসে হাত পাতছে।
গেট আউট, ইমিজিয়েটলি গেট আউট। লায়ার, শয়তান, রোগ।
পিতা ঘুষি পাকিয়ে চেয়ার ছেড়ে সবেগে উঠতে গেলেন। গেঞ্জি গলে মোটা পইতে ঝুলে ছিল। উত্তেজনার অবসরে পইতে যথাস্থলে চেয়ারের কোনায় জড়িয়ে বসেছিল। পিতা উঠলেন, সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার উঠল, পইতে ছিঁড়ে দু’টুকরো হল, চেয়ার টাল খেয়ে সশব্দে উলটে পড়ল বইয়ের র্যাকের ওপর, র্যাক থেকে দুদ্দাড় করে বই পড়ল, বইয়ের ধাক্কায় চায়ের গেলাস ছিটকে গেল কোনার দিকে। সব ঘটে গেল পরপর, অনেকটা জন্ম বিবাহ মৃত্যুর অর্ডারে।
মেসোমশাই, মুকু, কনক তিনজনেই ছুটে এসেছেন। পিতা পইতে ছিঁড়ে রণক্ষেত্রে দণ্ডায়মান। প্রতিপক্ষ চেয়ারেই বসে আছেন পায়ের ওপর পা তুলে। মৃদু মৃদু হাসছেন। আমার সেই শয়তানের গল্পটি মনে পড়ল। ঈশ্বর বললেন, শয়তান, লোকে বলে তুমি খারাপ ছাড়া ভাল কিছু কখনও করো না। কেন বলো তো? শয়তান বললে, প্রভু আমার ভাগ্য। দু’জনে ছদ্মবেশে এক মুদির দোকানে বসে কথা বলছিলেন। শয়তান গুড়ের নাগরি থেকে আঙুলে এক ফোঁটা গুড় নিয়ে দোকানের বাঁশের খোঁটায় একটি টিপ পরিয়ে দিয়ে বললে, প্রভু, এটা কি কোনও অপকর্ম? ভগবান বললেন, না, এ আর কী এমন অপকর্ম। তবে দেখুন! দু’জনেই স্থানত্যাগ করলেন। এদিকে সেই গুড়ের টানে সারি সারি পিঁপড়ে খোঁটা বেয়ে উঠতে লাগল। পিঁপড়ের লোভে তেড়ে এল গোদা টিকটিকি। টিকটিকি ধরতে এল বেড়াল। বেড়ালের ওপর ঝাঁপিয়ে এল রাস্তার কুকুর। নিমেষে লন্ডভন্ড, লঙ্কাকাণ্ড।
মেসোমশাই মেয়েদের এক এক টানে দরজার সামনে থেকে সরিয়ে দিয়ে দুম করে ডান পা ফেলে ঘরে ঢুকলেন। ড্রয়ারের ওপর পাশাপাশি রাখা কাঁচের ফুলদানি চিন করে বেজে উঠল। চাপা হুংকারে বললেন, কী হয়েছে হরিদা?
নানা জিনিসের যুগপৎ পতনের শব্দে বিভ্রান্তিতে পিতা তৃষ্ণীষ্কৃত হয়েছিলেন। মেসোমশাইয়ের প্রশ্নে ঘোর কেটে গেল। বাজারের পাশে একটা লোক বসে বসে ভেলকি দেখাচ্ছিল, লাগ ভেলকি, লাগ ভেলকি। হঠাৎ টাগরায় জিভ জড়িয়ে লোকটির সমাধি হয়ে গেল। সবাই ধন্য ধন্য করছে। কিছুক্ষণ পরে সেই ভাবটি যেই কেটে গেল, লোকটি অমনি লাগ ভেলকি, লাগ ভেলকি বলে চিৎকার শুরু করে দিল। পিতা সঙ্গে সঙ্গে তেড়ে উঠলেন, গেট আউট গেট আউট, ইউ স্কাউন্ড্রেল।
মেসোমশাই অগ্রপশ্চাৎ কিছুই শোনেননিঃ কিন্তু বীরভাবের একটা স্পর্শদোষ আছে। মালকোচা মারা ধুতিপরিহিত মেসোমশাই বিধুজ্যাঠার চোখের সামনে তিড়বিড় করে নাচতে লাগলেন, আর বলতে লাগলেন, গেট আউট, গেট আউট, ইউ স্কাউড্রেল।
আমাদের তিনজনের এতক্ষণ কোনও ভূমিকা ছিল না। লম্ফঝম্প শুরু হওয়ায় আমরা তিনজনে সমস্বরে চিৎকার করতে লাগলুম, বাবা কাঁচ, মেসোমশাই কাঁচ। বাবাতে, মেসোমশাইতে এমন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে সন্দেহ হচ্ছে, কে কার বাবা, কে কার মেসোমশাই! সাবধানবাণী কেউই গ্রাহ্য করছেন না। এদিকে মেঝেতে লেবুর কোয়ার মতো ফালাফালা কাঁচ পড়ে আছে। একবার পায়ে ফুটলে হয়! আমাদের সুখেন একবার বৃন্দাবনকে খুব ধাঁধায় ফেলে দিয়েছিল। বৃন্দাবনের বাবা বৃন্দাবনের মাসিকে দ্বিতীয় পক্ষ করে আনলেন। সুখেন বোকাসোকা বৃন্দাবনকে বুঝিয়ে দিলে, তোর বাবাকে আর ভুলেও বাবা বলে ডাকিনি। ভীষণ রেগে যাবেন। অপমান করা হবে। তিনবার ফেল করেছিস, এইবার তা হলে বাড়ি থেকে বের করে দেবেন। মেসোমশাই বলবি। মাসির বর মেসো হয় জানিস তো! পরের দিন সকালে দেখা গেল, বৃন্দাবন উদম হয়ে বাইরের রকে বসে আছে। কী হল রে বৃন্দাবন? কী বলব মাইরি, রাতে খাবারটাবার সব বাড়া হয়েছে, যেই ডাকলুম, মেসোমশাই, খাবেন আসুন, এতদিনের বাবা মাইরি জুতো হাতে তেড়ে এলেন। শরীরের অবস্থা দেখ, মেসোতে আর মাসিতে মিলে পেঁদিয়ে বৃন্দাবন দেখিয়ে দিয়েছে রে! সব কেড়ে নিয়ে। ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে। বাবা মাইরি সত্যিই মেসো হয়ে গেছে।
