ডি-শার্পে ধরেছে। আমি পারব কেন? তবু হেরে যাওয়ার ভয়ে ধরতে হল। জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন এসে গেছে। ধরে ফেললুম, আমায় দে মা তবিলদারি। অন্তরায় গিয়ে আর রাখতে পারলুম না। গলা ফেল করল। প্রসাদী গানের যত কেরামতি তো চড়ায়। পিন্টু আর গ্রাহ্যই করল না আমাকে। তার ভাব এসে গেছে। সে গেয়েই চলল প্রাণ খুলে। এত ভাল গাইল, রেকর্ড কোম্পানি শুনলে রেকর্ড করে নিত। গান শেষ করে আবার সে প্রতিযোগিতায় ফিরে এল, তুমি আর কী জানো? গাছে উঠতে পারো?
না গো, গাছে চড়তে ভয় করে।
পিন্টু কিছুক্ষণ ভেবে বললে, ও ভয় করে! তা হলে তো তুমি কোনওদিন পেয়ারা জামরুল খেতে পারবে না। তুমি ক’দিন থাকবে? ওটাও তোমাকে শেখাতে পারি। খুব সহজ। হাত আর পা দিয়ে গাছটাকে জড়িয়ে ধরবে। প্রথমে কিন্তু নম করে নেবে। গাছ তো দেবতা। মনে মনে বলবে, গাছ, তুমি আমাকে ফেলে দিয়ো না। তারপর তো একটু উঠলেই ডাল পেয়ে যাবে। ওগুলো হল গাছের হাত। ডাল ধরে ধরে তুমি কত ওপরে উঠে যাবে। একটুও ভয় পাবে না কিন্তু। এখনই শিখবে নাকি?
ভয়ে ভয়ে বললুম, এখন থাক। কাল সকালে শিখব।
সাঁতার জানো নাকি?
সে একটু একটু।
তা হলে তো ভালই। কাল পুকুরে দু’জনে সাঁতার কাটব।
সাঁই সাঁই করে গাছের ভাঙা ডালটাকে এদিকে-ওদিকে বারকতক দুলিয়ে দিয়ে বললে, কেন এইরকম করলুম বলো তো? একগাল হেসে বললে, করতে হয়। তা না হলে রাগ হয়।
কার রাগ হয়?
ছপটির রাগ হয়। মাঝে মাঝে এটা দিয়ে মারতে হয়।
কাকে?
যাকে হোক। তা না হলে এর মন খারাপ হয়।
তুমি কত কী জানো!
বড় হলে আরও কত কী জানব! তুমি লেখাপড়া করো না?
করি তো। তুমি?
আমিও করি। তুমি ফাস্ট হও?
তুমি?
আমি ফার্স্ট ছাড়া হতেই পারি না। কী যে আমার হবে।
তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?
ফোর। জানো তো আজ আমি একটু পরে পায়েস খাব।
কেন?
পায়েস কেন খায়?
তোমার জন্মদিন।
ঠিক বলেছ। আজ আমার জন্মদিন। তোমার জন্মদিন কবে?
আমার জন্মদিন পুজোর সময়, আশ্বিন মাসে।
তোমাকে কেউ পায়েস করে দেয়?
আমার যে মা নেই।
তা হলে তুমিও আজ আমার সঙ্গে পায়েস খাবে। এখন চলো আমরা বাড়িতে যাই। এখুনি বিমলি মা খুঁজতে আসবে এখানে।
বাগানটাকে আমরা দুজনে মিলে একবার পাক মারলুম। গাছের জটলা। একপাশে একটা পরিত্যক্ত ভিটে। বিশাল বিশাল গাছ। আম, জাম, কাঁঠাল। কিছু ফুলগাছ, আগাছা। হঠাৎ ঝোঁপের আড়াল থেকে টুসটুসে এক বৃদ্ধা বেরিয়ে এলেন, শিশুটির সামনে দাঁড়িয়ে একটু নিচু হয়ে বললেন, এই যে গোপাল আমার! আজ একবারও আসা হল না কেন মানিক?
পিন্টু বললে, আজ আমাদের বাড়ি অনেক লোক এসেছে। দেখছ না, এই যে আমার মামা। আমার পিন্টুমামা।
গোপালের প্রসাদটা তা হলে আমি কী করব?
নিজেই খেয়ে নেবে কুপুর কুপুর। তুমি তো পেটুক।
বৃদ্ধা হাহা করে হেসে উঠলেন, কাল রাতে আমার খুব জ্বর হয়েছিল গো কত্তা।
যাও না, পুকুরে খুব করে চান করো গে না। তোমার তো খুব গরম!
একটু ওষুধ দিবি না?
তোমার ওষুধ আমার এই ছপটি। পিঠটা পাতো।
আমি এমন ডাক্তার চাই না।
তা হলে যাও বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়ো।
বৃদ্ধা কিছু দূর গেছেন, পিন্টু ছুটে গিয়ে পেছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরল, দিদা, আমার চালভাজা রেখো কিন্তু, বিকেলে আসব। বৃদ্ধা আদর করতে করতে বললেন, লুডোটা আনবি। অনেকদিন আমাদের খেলা হয়নি। বেলাবেলি আসবি কিন্তু। বৃদ্ধা সঁড়িপথ ধরে গুটগুট করে চলে গেলেন। কাঁধের পাশে একটা ঝোলা।
পিন্টু বললে, তুমি চালভাজা খেয়েছ কোনওদিন, কুসুমবিচি ভাজা দিয়ে?
শুধু চালভাজা খেয়েছি। পিন্টুকে এখন সমবয়সি বন্ধু মনে হচ্ছে।
তা হলে বিকেলবেলা আমার সঙ্গে যাবে। লুডো খেলতে জানো?
হ্যাঁ তা জানি।
তা হলে ঠিক আছে, আমরা তিনজনে খেলব। তুমি আর কী খেলা জানো? ডান্ডাগুলি?
সে তোমার মতো যখন ছোট ছিলুম।
আচ্ছা পিন্টুমামা, তুমি আমাকে একটা কথা বলতে পারো, বড় হতে ক’দিন লাগে?
বেশ শক্ত প্রশ্ন। উত্তরের বদলে প্রশ্ন করলুম, কেন বলো তো! বড় হয়ে কী হবে, ছোট থাকাই ভাল। পিন্টু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখ কুঁচকে একবার আকাশের দিকে তাকাল। একটা ব্রাহ্মণ চিল উড়ছে। সাদা চিল সহসা দেখা যায় না। আমি তাকিয়ে রইলুম হাঁ করে। পিন্টু বললে, আমাকে খুব তাড়াতাড়ি বড় হতে হবে।
কেন বলো তো?
তুমি জানেন কি, কানপুর বলে একটা দেশ আছে?
হ্যাঁ, জানি তো।
সেই কানপুরে আমার বাবা আছে। বাবার সঙ্গে আমার বিমলি মায়ের আড়ি। ধরো, আমি যদি তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাই, তা হলে একদিন ট্রেনে চেপে কানপুরে চলে যাব। গিয়ে বাবাকে ধরে আনব। বলব, চলো, এক্ষুনি চলো। তুমিই বলো, সব্বাইয়ের বাবা আছে, আমার বাবা নেই। ভাল লাগে! আমার কেবল মামা। সবাই আমার মামা। তুমি আবার কোথা থেকে চলে এলে এক মামা আমার মা কেবল সবসময় পুজো করে আর কাঁদে। কী করে তাড়াতাড়ি বড় হওয়া যায় বলো তো! গাছের গোড়ায় মোহনমামা গোবর দেয়, গাছ বড় হয়। আমি একটু গোবর খাব মামা?
দাঁড়াও, আমি একটু ভেবে দেখি। তবে কী জানো, মানুষ বছরে বছরে বড় হয়। অঙ্কের মতো। যেমন ধরো, এই তো আজ তোমার জন্মদিন, সামনের বছর এই দিনে তুমি আর এক বছর বড় হবে।
কত বছর হলে মানুষ বড় হয়?
তা ধরো কুড়ি বছর।
পিন্টু ভুরু কুঁচকে বললে, আচ্ছা, তখন কি আমার বাবা আর মা বেঁচে থাকবে?
