হরিশঙ্করের ভেতর থেকে সেই মুহূর্তে একজন বড় মাপের মানুষ বেরিয়ে আসবে। মুখের চেহারাটা হয়ে যাবে শ্রীচৈতন্যের মতো করুণাময়। একটা বেদনা, যেন মানুষটির জীবনে নিজে ঢুকে পড়েছেন। ভদ্রলোক চেয়েছিলেন কুড়ি, একশো টাকার একটা নোট হাতে গুঁজে দিয়ে বলবেন, এটা আর আপনাকে শোধ দিতে হবে না। আমার ছেলেকে দিয়ে মাঝে মাঝে আপনার খবর নেওয়াব। আমি বাঁচলে আপনারও বাঁচার অধিকার আছে।
ভদ্রলোক হতভম্ব হয়ে চলে যাবেন। হরিশঙ্করের দিকে অবাক হয়ে তাকাবেন। যেন বিস্ময়কর কোনও বস্তু দেখছেন। হতাশ মুখে একঝলক আশা। বেঁচে থাকার মন্ত্র শুনেছেন কানে।
এক নয়, ছড়িয়ে আছে শত শত উদাহরণ। কত পরিবার নীরবে নিভৃতে স্মরণ করে হরিশঙ্করকে। হরিশঙ্করের দান সেইরকম, বাঁ হাতও জানতে পারে না, ডান হাত কী করছে। কেউ প্রশংসা করলে স্তাবকতা করলে হয় নিজে স্থানত্যাগ করেন, নয় তাকেই দূর করে দেন।
সেই হরিশঙ্কর নিতান্ত বাধ্য হয়েই চলেছেন বিমলার ভিটেতে। ছোটদাদুর কথা অমান্য করতে পারেন না। দোকান থেকে বেরোনো মাত্রই একটা কলরব। একটা শব্দ। সবাই ছুটছে নদীর দিকে। জল ছেড়েছে। জল ছেড়েছে।
কোনও কথা নয়, হরিশঙ্করও ছুটলেন। আমরাও পিছু নিলাম।
অপূর্ব দৃশ্য! হুহু শব্দে, দিগ্বিদিক ভাসিয়ে ছুটে আসছে জল। ভক্ত নরনারীর মতো প্রণাম করতে করতে আসছে শত শত ঢেউ। একের ঘাড়ে আর এক। প্রেম সুধারসে মাতোয়ারা কীর্তনিয়ার দল। বাজছে লক্ষ মৃদঙ্গ।
২.৩৭ Is man one of God’s blunders
ঝোঁপঝাড় গাছপালা সব মিলিয়ে বাগানের মতো একটা জায়গা। তারই মাঝে কয়েকটা কুঁড়েঘর। দুপুরে পাখির ডাকে একটা ক্লান্তির ভাব। গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে দামোদরের জল চিকচিক করছে। নদীটা পেছন দিক দিয়ে ঘুরে চলে গেছে তার সমুদ্রযাত্রায়। এই হল বিমলার ভিটে।
ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে বাচ্চা একটা ছেলে ছপটি হাতে ঘুরছে। বড় বড় চোখ। আদুড় গা, একমাথা ফুরফুরে চুল। নিজের মনেই বকবক করছে আর হাতের ছপটিটাকে ঘোরাচ্ছে মাঝে মাঝে। অচেনা আমাকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী?
কোথায় আমি নাম জিজ্ঞেস করব! না, সে-ই আমার নাম জিজ্ঞেস করে বসল।
আমার নাম পিন্টু। তোমার নাম?
আমার নামও পিন্টু।
ছেলেটি বললে, তুমি কি আমার মামা?
হ্যাঁ, আমি তোমার মামা।
তুমি মাছ ধরতে পারো?
পারি না বললে ছেলেটির কাছে হেরে যেতে হয়। মামা মাছ ধরতে পারে না, সে আবার কেমন মামা! বেশ একটা বীরত্ব এসে গেল ভেতরে। বুক চিতিয়ে বললুম, নিশ্চয় পারি।
ছেলেটি আমার কাছে এগিয়ে এসে নিচু গলায় বললে, তুমি মাছি ধরতে পারো?
মহা দুষ্টু ছেলে। চোখেমুখে বুদ্ধি খেলা করছে। পরিষ্কার হাফপ্যান্ট। ফরসা রং। গ্রামের ছেলে বলে মনেই হয় না। হঠাৎ কোথা থেকে একটা ভোমরা উড়ে এল। মাথার চারপাশে ভো ভো উড়ছে। আমাকে ভয়ে আড়ষ্ট দেখে ছেলেটি বললে, দুর বোকা, নিজের নামটা বলে দাও না, তা হলেই তো চলে যাবে।
আমি বললুম, পিন্টু। ভোমরাটা সত্যিই উড়ে চলে গেল আর একদিকে।
ছেলেটি বললে, দেখলে? ওরা নাম জিজ্ঞেস করতে আসে।
কেন, নাম জিজ্ঞেস করতে আসে কেন?
তাও জানো না? ছেলেটি হাসল আমার অজ্ঞতায়, ওরা হল কোটাল। রাজপুত্রের কাছ থেকে আসে। তোমাকে তোমার মা বলেনি?
না তো?
তোমার মা জানে না। আমার মা সব জানে।
তোমার মা কে?
আমার মা বিমলা। ছেলেটি হঠাৎ ধেই ধেই করে খানিক নেচে নিল, বিমলি মা কলমি খায়। বাঘের সঙ্গে কথা কয়। তুমি আমার বিমলি মাকে চেনো না? তুমি কোত্থেকে এলে গো? বৃন্দাবন থেকে?
না তো, কলকাতা থেকে।
ও তা হলে তুমি আর এক মামা? বৃন্দাবনে আমার আর এক মামা আছে। আসে না, কেবল চিঠি লেখে। বিমলি মা কেবল বলবে ঝুলনে আসবে ঝুলনে আসবে। আসেই না। মিথ্যে কথা।
তুমি ওই ছড়াটা কোথায় শিখলে?
আমার মোহনমামা শিখিয়েছে। মোহনমামা আমাকে কত শেখায়! তোমার মামা আছে?
হ্যাঁ আছে।
কিছু শেখায়?
হা গান শেখান।
ঠোঁট উলটে বললে, আমার মোহনমামাও আমাকে গান শেখায়। দেখি তুমি একটা গান ধরো তো? কেমন শিখেছ দেখি।
তুমি একটা গাও আগে।
তোমার লজ্জা করছে? আমি না হয় চোখ বুজোচ্ছি। নাও নাও, তাড়াতাড়ি ধরো।
সত্যিই আমার যেন একটু লজ্জালজ্জা করছে। এমন একজন শ্রোতা। যেন গানের পরীক্ষা দিচ্ছি। এক পিন্টু চোখ বুজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর এক পিন্টু গান ধরেছে, মন রে কৃষি কাজ জানো না। এমন মানবজীবন রইল পতিত, আবাদ করলে ফলত সোনা।
গান যতক্ষণ চলল ছেলেটা একভাবে চোখ বুজিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। গান শেষ হতেই চোখ খুলে বললে, ভালই শিখিয়েছে। তা তুমি আর একটু চড়াতে পারলে না? তা হলে শোনো।
পিন্টু ওই গানটাই ধরল। ধরামাত্রই অবাক হয়ে গেলুম। যেমন সুরে গলা, তেমনি উচ্চারণ আর ভাব। এ ছেলে নির্ঘাত বড় গাইয়ে হবে। মন রে বলে যখন সুর টানছে, তিরের মতো বুকে এসে লাগছে। পাতার ফাঁক দিয়ে এক চিলতে রোদ এসে পড়েছে মুখে। মুখটা লাল। হঠাৎ গান থামিয়ে বললে, ঠিক হচ্ছে তো? দে মা আমায় তবিলদারিটা জানো?
না গো।
ইস! তা হলে শিখে নাও, আমি গাইছি।
পিন্টু গাইতে লাগল, আমায় দে মা তবিলদারি। আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী। প্রথম লাইনটা গেয়েই বললে, নাও ধরে ফেলল। চুপ করে থাকলে শিখবে কী করে?
