এমন একজন মহিলাকে এখানে দেখা যাবে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। একেবারে সাধিকার চেহারা। ভাব-থমকানো মুখে ভাসাভাসা দুটো চোখ। উদাস যেন কোন আকাশে লগ্ন। মধ্যবয়সি। পরিষ্কার লাল পাড় শাড়ি। কপালে গোল সিঁদুরের টিপ। দু’হাতে মোটা দুটো শাঁখা। আলগা খোঁপা। আমরা তিনজনেই অবাক। এমন পবিত্র আবির্ভাব আমরা আশা করিনি। দোকানের মালিক একগাল হেসে বললেন, আমার বোন। খুব ভাল ঘরে বিয়ে হয়েছিল। তা সংসার আর করা হল না।
ছোটদাদু সঙ্গে সঙ্গে বললেন, সংসার করবেন কী করে! ইনি তো সংসারের নন। শক্তি, সাক্ষাৎ জগজ্জননী। এঁর স্থান তো আশ্রমে মন্দিরে হবে। সাধিকা।
বিমলা হাত জোড় করে বললেন, ওইসব বলবেন না বাবা। তবে আপনাকে আমি চিনি।
ছোটদাদু অবাক হয়ে বললেন, আমাকে?
হ্যাঁ বাবা, আপনাকে আমি তারাপীঠে দেখেছি। আজ আপনি এসেছেন আমাকে কৃপা করতে। আপনি যে কত বড় সাধক আমি নিজে দেখেছি। আপনি আমাকে একটা বজ্রনাভি রুদ্রাক্ষ দিয়েছিলেন। এই দেখুন আমার গলায়। এইটা ধারণ করার পর আমার অনেক বিপদ কেটে গেছে বাবা। এখন আর আমার কাছে আসার সাহস হয় না কারও।
বিমলা এগিয়ে এসে ছোটদাদুকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করলেন। হরিশঙ্কর নিজের মনেই বললেন, যেখানেই যাই সেইখানেই সাধন, সাধনা, রুদ্রাক্ষ, তন্ত্র, তাগা, তাবিজ। সাধারণ মানুষের পৃথিবীটা হারিয়ে গেল নাকি!
বিমলা হরিশঙ্করকে প্রণাম করার জন্যে এগিয়ে এলেন। হরিশঙ্কর তিন লাফে পেছিয়ে গেলেন, আমাকে নয়, আমাকে নয়। আমি কেউ নই। আমি সাধনভজন করি না।
বিমলা হরিশঙ্করকে ধরে ফেললেন। প্রণাম করতে করতে বললেন, সে তো আমি বুঝি। উঠে দাঁড়িয়ে হরিশঙ্করের দিকে তাকিয়ে এমন সুন্দর হাসলেন হরিশঙ্করও থমকে গেলেন। এতসব কাণ্ড দেখে দোকানের মালিক মোহন আর চুপ করে বসে থাকতে পারলেন না। উঁচু জায়গা ছেড়ে নেমে এলেন। বোনকে জিজ্ঞেস করলেন, এই মহাপুরুষের কথাই তুই আমাকে বলেছিলিস? যিনি দু’হাত ঘষে আগুন জ্বালাতে পারেন?
বিমলা ঘাড় নাড়ল। মোহন ছোটদাদুর দিকে তাকিয়ে আছেন অবাক হয়ে। ভাবের মানুষ। চোখে জল এসে গেছে। ছোটদাদুকে দেখছেন আর কাঁদছেন নিঃশব্দে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। বহুকাল পরে সন্তান যেন তার হারিয়ে যাওয়া পিতাকে খুঁজে পেয়েছে। এতদিনের দুঃখ-বেদনা সব ধুয়ে সাফ হয়ে যাচ্ছে চোখের জলে। মোহন নিচু হয়ে ছোটদাদুকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালেন। এখন এই মুহূর্তে তাকে কোনওভাবেই ভাবা যাচ্ছে না সামান্য একজন অশিক্ষিত মিঠাইঅলা। শান্ত, সংযত, ভাবগম্ভীর। থমথমে গলায় বললেন, আজ আমাদের পরম সৌভাগ্যের দিন। কিছু চাই না। যদি কিছু দেবার থাকে আমাদের দিয়ে যাবেন, অন্ধকারের লণ্ঠন, বৃদ্ধের লাঠি, বর্ষার ছাতা, শীতের কথা।
মোহন শুদ্ধ সাহিত্যের ভাষায় কথা বলছেন। এঁর জীবনের অন্য একটা দিক আছে অবশ্যই। ছোটদাদুর পায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন না তাগা-তাবিজ মন্ত্র-তন্ত্রের জন্যে। শুধুই কৃপাপ্রার্থী। ভাগ্য-ভবিষ্যৎ কিছুই জানতে চান না।
বিমলা বললেন, দাদা, এঁদের আমি বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি। সেইখানেই সেবা হবে।
মোহন বললেন, তাই তো করবি! এঁরা কৃপা করে এসেছেন শুধু আমাদেরই জন্যে।
হরিশঙ্করের হয়তো আপত্তি ছিল। মুখ দেখে তাই মনে হচ্ছিল আমার। কারও সংসারে সহসা ঢুকতে চান না। ব্যবসায়িক লেনদেনই পছন্দ করেন। একটা চুক্তির মধ্যে এসো। প্রেম, প্রীতি, ভালবাসা, যাবতীয় সেন্টিমেন্ট বড়ই জটিল, অযথা সময় নষ্ট। ঘোর সংসারে অঘোর বিষয়ের কোনও দাম নেই। ফেলো কড়ি মাখো তেল। ইংরেজিতেই ভাল শোনায়, ফিনিশ ইট। পৃথিবী মানেই থকথকে দগদগে স্বার্থ। স্বার্থে আসার আগে যাবতীয় গৌরচন্দ্রিকা। আগে দেখেছি, বাড়িতে এসে কেউ খুব ভণিতা করছেন, কেমন আছ? তোমার সেই গোড়ালির ব্যথা? আমি ডেড শিয়োর, কোনও পাথরে পা পড়ে গিয়েছিল। গুপো হয়ে গেছে। ভয়ংকর ভোগায়।
হরিশঙ্কর শুনে যাচ্ছেন। ব্যাডমিন্টন খেলার মতো। বল আসছে, বল ফিরে যাচ্ছে। চলছে খেলা। হঠাৎ এক চাপ্স। বিপক্ষ বসে পড়বে।
হরিশঙ্কর হয়তো একটু মজা করবেন। বিব্রত করার জন্যে বলবেন, গোড়ালিতে তো আমার কস্মিনকালেও কিছু হয়নি।
ভদ্রলোক অমনি বলবেন, আমি গুলিয়ে ফেলেছি। নগেনের সঙ্গে তোমাকে গুলিয়ে ফেলেছি। তোমার যেন কোথায় ব্যথা হয়েছিল? গলায়?
হরিশঙ্কর আরও একটু খেলবেন, হাঁচি কাশি-সর্দি-জ্বর ব্যথা-মাথাধরা, আমার জীবনে হয়নি, হবেও না।
ভদ্রলোক হাল ছাড়বেন না। বলবেন, যদি কখনও তোমার গুলো হয়, তুমি যেরকম গোড়ালি ঠুকে ঠুকে গোরাদের মতো হাঁটো, হলেই হল। তখন কী করবে? একটা টোটকা শিখিয়ে দিই। মেয়েরা উনুনের আগুন ফেলে দেবার পর, উনুনের ঝিকের পাশে জয় মা বলে গোড়ালিটা চেপে ধরবে। বারকয়েক। ব্যথাফ্যথা সব হাওয়া। আর যদি গলায় ব্যথা হয় তা হলে…।
হরিশঙ্কর এইবার মারবেন চা। তা হলে গলাটা স্রেফ উড়িয়ে দোব। অনেকটা সময় আমার নিয়েছেন, এইবার কাজের কথায় আসুন, কী চাই বলুন তো?
ভদ্রলোক আমতা আমতা করে বলবেন, বেশি না, গোটা কুড়ি টাকা হলেই হয়ে যাবে। কামিং মাস্থের বাই দা টেনথ আমি দিয়ে যাব। ভীষণ হার্ড আপ হয়ে পড়েছি হরিশঙ্কর। বৃদ্ধ মানুষ। আগের মতো আর খাটতে পারি না। ফার্মটা উঠে চলে গেল বিলেতে। ইন্ডিয়ান বিজনেস ক্লাজড। সবই শেষ হয়ে গেল। একসময় দোল-দুর্গোৎসব হত বাড়িতে। বাঙালির পতনের কাল।
